বৃহস্পতিবার - জুলাই ১৮ - ২০২৪

গণতন্ত্রের দুর্বলতা

সাম্প্রতি টরন্টো সিটির মেয়র উপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে

ভোট প্রদানের নিন্ম হার গনতন্ত্রের একটি বড় দুর্বল  দিক। কিন্তু গনতন্ত্রের  এই দুর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসার সঠিক পন্থা আজও তেমনভাবে রাজনীতিবিদ এবং কোন দেশের নীতিনির্ধারকেরা বের করতে সক্ষম হননি।

ভোট প্রদান একজন ভোটারের নাগরিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার ভোটার স্বেচ্ছায়, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চর্চা করে। কেউ ভোটারকে ভোট দানে বাধ্য করতে পারে না।

- Advertisement -

আমার জানে মতে এমন কোন রাষ্ট্র নেই যেখানে ভোট না দেওয়ার কারনে কোন ভোটারকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

একটি দেশের মোট ভোটারের মধ্যে ৫১% কিংবা তারও নিচে ভোট প্রদান করলে তা অবশ্যই  জনমতের সঠিক প্রতিফলন না। সেটি অত্যন্ত  দুর্বল জনপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনকে বুঝায়। এমন নির্বাচনে সংখ্যালগিষ্ঠের  মতামত প্রতিফলিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত থাকে উপেক্ষিত।

ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার কোন প্রার্থিকে নির্বাচিত করতে চেয়েছিল বা কোন দলকে ভোট দিতে চেয়েছিল তা বুঝার কোন পথ থাকে না।

ভোটার ভোট দানে বিরত থাকাও একধরনের মতামত। কিন্তু সেই মতামতে তারা কি বুঝাতে চেয়েছিল তা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কেন ভোট দেয়নি তার উপর কোন জরিপ হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

এই কানাডাতে সাম্প্রতি টরন্টো সিটির মেয়র উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে টরন্টো সিটির মোট ভোটারের মধ্যে ভোট কাস্ট হয়েছিল  ৩৮%। ৬২% ভোটার ভোট দানে বিরত ছিল। ২০২২ সালের টরন্টো সিটির মেয়র নির্বাচনে মাত্র ২৯% ভোট কাস্ট হয়েছিল। ৭১% ভোটার ভোট দানে বিরত ছিল।

২০২২ সালের প্রভিন্সিয়াল নির্বাচনে ভোটার টার্ন আউট ছিল ৪৩.৫৩%। ৫৬.৪৭% ভোটার ভোট দানে বিরত ছিল।

আমি স্কারবরো সাউথ-ওয়েষ্ট রাইডিংয়ের একজন ভোটার। এখানে ২০২২ সালের প্রভিন্সিয়াল নির্বাচনে ভোটার টার্ন আউট ছিল ৪৪.৩৩%। ৫৫.৬৭% ভোটার ভোট প্রদান করেনি।

উপরের উদাহরণগুলি  দিলাম এই কারনে যে, সংখ্যালগিষ্ঠ ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে গঠিত সরকার অবৈধ নয়। এই দেশের সংবিধান এই ধরনের নির্বাচনকে অবৈধ বলে না। কোন দেশের সংবিধানই নিন্ম হারে প্রদত্ত ভোটের ভিত্তিতে গঠিত সরকারকে বৈধ নয় বলে উল্লেখ করেনি।

ফান্সে একটি বিধান আছে, প্রেসিডেন্টকে মোট প্রদত্ত ভোটের ৫১% পেতে হবে। তানাহলে দ্বিতীয় রাউন্ডে আবার নির্বাচন করতে হবে। মোটামুটি দেখা গেছে দ্বিতীয় বারেই এই ৫১% পাবার বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যায়। কিন্তু ফান্সেও লো ভোটার টার্ন আউটের ক্ষেত্রে সংবিধানে কিছু বলা নাই। ১০০ জন ভোট দিলে তার মধ্যে ৫১ জনের ভোট পেলেই একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। জার্মানিতেও খুব সম্ভব এমন বিধান রয়েছে।

বিভিন্ন দেশে গনতন্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন মডেল চালু রয়েছে। কোন দেশে সংসদীয় ব্যবস্থার সরকার, আবার কোন দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা। কোন দেশে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট  সরকার ব্যবস্থা , আবার কোন দেশে একক কক্ষ বিশিষ্ট সরকার ।

কিন্তু যে রকমের ব্যবস্থাই চালু থাকুক না কেন,সব মডেলে জনগনই সকল ক্ষমতার মালিক। আর সেই ক্ষমতাটি হচ্ছে ভোটাধিকার। জনগনই যদি সকল ক্ষমতার মালিক হন তবে জনগনের অধিকাংশের মত ভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত না হলে সেই সরকারে জনগনের দুর্বল মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাই লো ভোটার টার্ন আউট আসলে গনতন্ত্রের একটি বড় দুর্বল দিক। কারন, গনতন্ত্র বলতে বুঝায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫১% নেচে হলে হবে না।৪৯% এবং তার চেয়েও নিন্ম ভোট কাস্ট হলে সেটি সংখ্যালগিষ্ঠ মতের প্রতিফলন বলে গন্য হবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে ভোটাররা ভোট দানে বিরত কেন থাকে?  কিংবা কেন ভোটার  তার ভোটটি প্রদানে অনাগ্রহী কিংবা নিরুৎসাহিত হয়?

এর নানা কারন হতে পারে:

১) ভোটারদের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের মধ্যে  কাউকেই যোগ্য বলে মনে না হলে তারা ভোট প্রদানে আগ্রহ বোধ করে না।

২) ভোটাররা যদি মনে করে যে দল বা প্রার্থীই নির্বাচিত হোক না কেন তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না তবে তারা ভোট দেওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত রাখে।

৩) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি না হলে ভোটাররা ভোট দিতে উৎসাহ পায় না।

৪) ভোটাররা রাজনীতি বিমুখ হলে ভোট প্রদানেও বিমুখ থাকে।

উপরের কারনগুলি ছাড়াও অন্য আরো অনেক কারন থাকতে পারে।

কথা হচ্ছে, এই নিন্ম হারের ভোট বা ভোট কেন্দ্রে নিন্ম হারে ভোটারের উপস্থিতি থেকে উত্তরনের পথ কি? এই নিয়ে কি কোন গবেষণা হয়েছে?

ভোটারকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আসলে সরকার এবং প্রার্থীর। সরকার কোন ভোটার ভোট না দিলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন না কিন্তু উৎসাহিত করতে পারেন।

সরকার এবং প্রার্থী নাগরিকদের ভোট প্রদানে নানামুখী ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারে।

এছাড়া ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার অন্য কোন পথ আসলে তেমনভাবে পরিলক্ষীত হয় না।

কোন ভোটার ভোট দিলে তাকে একধরনের ইনসেন্টিভ দিয়ে উৎসাহিত বা পুরষ্কৃত করার চিন্তা ভাবনা বিরাট বাজেটের ব্যাপার। তাই এটি মনে হয় না বাস্তবসম্মত।

বেশির ভাগ মানুষ গনতন্ত্রকে শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে মনে করেন। কারন, সরকার জনগনের কাছে দায়বদ্ধ বলে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার জনগনের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতি লক্ষ্য না রাখলে জনগন ভোটের মাধ্যমে সেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করবে।এইভাবে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

কিন্তু বিভিন্ন দেশে জনগন ভোট প্রদানে অনাগ্রহী এবং নিরুৎসাহিত হবার কারনে এই ব্যবস্থাটি দুর্বল একটি সরকার ব্যবস্থায় পরিনত হচ্ছে। দেশে দেশে সংখ্যালগিষ্ঠের মতামতের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

ফলে এর থেকে উত্তরনের পথ বের করতে না পারলে এটি একটি ব্যর্থ সরকার ব্যবস্থা বলে গন্য হবে।

- Advertisement -

Read More

Recent