শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

বেরঙা জীবনে প্রেমের ভাঁজ

বেরঙা জীবনের রং হয়ে এসেছিস আমার অন্ধকার জীবনে আলো হয়ে আছিস তুই কি চাস ঝুম আমি আবার অন্ধকারে হারিয়ে যাই

শীতের কুয়াশাময় সকাল। বেলা দশটা বাজতে চলল তথচ সূর্য উঠার নাম গন্ধ নেই। কুয়াশার আড়ালে সূর্য্যি মামা লুকিয়ে আছে। ঝুমুর ঘুম প্রতিদিনের ন্যায় আজো সকালে ভেঙেছে। কিন্তু আজ সে বাড়ির আঙিনা পেরোয় নি। গতকালকের ঘটনা এখনো সে মন থেকে সরাতে পারছে না। ইবাদ যতদিন গ্রামে আছে সকালে আর বাড়ির আঙিনা ছাড়বে না বলে ঠিক করেছে ঝুমু। উঠোনের একপাশে বেলিফুলের একটি বিশাল বড় গাছ। এই গাছটি ঝুমুর দাদা নিজ হাতে লাগিয়েছিলো তার দাদির জন্য। ঝুমুর দাদি বেলি ফুলের গন্ধ অনেক ভালোবাসতো। দাদা-দাদি নেই তবে বেলিফুলের গাছটির আকার ধারণ করেছে বিশাল। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পর ঝুমু সযত্নে বেলি ফুল গুলো কুড়িয়ে তুলে। সে ফুল দিয়ে হয় মালা গাঁতে, না হয় কাউকে দিয়ে দেয়। আজো তার ব্যতিক্রম করে নি।

আজ ছুটির দিন। স্কুল নেই। তাই ফুলগুলো তুলে সুই সুতা দিয়ে একটি মালা বানালো। সেই মালা মায়ের খোঁপায় পেছিয়ে দিলো। তাহমিনা বেগম রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। ঝুমুর এমন কান্ডে তিনি সামান্য পরিমাণ অবাক হয় নি। তার মেয়ে এটা প্রায় সময়ই করে থাকে। শত বারণ করলেও শুনে না। তাই এখন আর বারণ করে না। তিনি মুচকি হেসে বললেন,
–গরমের মধ্যে এখনে এসেছিস কেন? যা বাইরে!

- Advertisement -

–আম্মা তুমি যে কি বলো? আমার কি রান্না শিখতে হবে!

তাহমিনা বেগম পেঁয়াজ কুঁচির থালাটা হাত থেকে রাখলেন। মেয়ের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বললেন,

–রান্না শিখবি তুই?

–হু!

–যার শিখার আগে দরকার তাকে তো জোর করে ঠেলে ঠুলেও রান্না করে আনা যায় না। এখন তুই আসছিস রান্না শিখতে?

ঝুমু রান্না ঘর থেকে বের হতে হতে বলল,

–যাও আর শিখবোই না! তুমিই রান্না করো!

পেছন থেকে তাহমিনা বেগম ঝুমুকে ডেকে বললেন,

–এই শোন, তোর বাবার ভাত গুলো দিয়ে আয় দোকানে।

ঝুমু পেছন ঘুরে বলল,
–কেন? আব্বা বাড়িতে আসবে না?

–নাহ্! তর আব্বার দোকানে হালকাতা অনুষ্ঠান চলবে তিনদিন। ততদিন সকালের খাবার, দুপুরের খাবার দোকানে দিয়ে আসতে হবে। তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়। তুই খেয়ে নে। তারপর তর আব্বার ভাতগুলোও দিয়ে আয়!
–আব্বার হালকাতা শুরু হয়ে গেছে?

–হ্যাঁ! এইসবের খবর তো রাখেন না। সারাদিন শুধু ফুলের বাগান নিয়ে পড়ে থাকেন।

ঝুমু চলে গেলো হাত মুখ ধুতে। গ্রাম-বাংলায় হালখাতা বলতে বোঝায় নতুন খাতা। পুরাতন বছরের সমস্ত দেনাপাওনা পরিশোধের পর নতুন হিসেবের খাতা খোলা হয়। এটা বাঙালির অনেক পুরনো ঐতিহ্য। পূর্বে শুধুমাত্র ১লা (পহেলা) বৈশাখ এ হালখাতা উৎসব পালন করা হতো। এখন তো বাংলা সনের হিসাবই কেউ রাখে না। হালখাতা অনুষ্ঠানে গ্রাহক বা খরিদদারকে মিষ্টিমুখ করানোর প্রচলনও অনেক পুরনো একটি রেওয়াজ। তবে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা এটি অনেকে মানে না। তারা তাদের সুবিধা মতো যেকোনো সময় হালখাতা অনুষ্ঠান পালন করে। আবার অনেকেই পুরনো প্রত্যাকেই ধরে রেখে সেটি পালন করেন বাংলা বছরের প্রথম দিনে।
________
ঝুমু তার আব্বার দোকান থেকে বাড়ি ফিরছে। রাস্তায় হাটার সময় খুব দ্রুত একটি গাড়ি এসে তার পাশ বরাবর থামল। ঝুমুর মনে হলো গাড়িটি বুঝি তার উপর দিয়েই গেলো। ঝুমুর বুকে ধুকপুক আওয়াজ হচ্ছে। বেশ ভয় পেয়েছে এহেন কান্ডে। গাড়ি থেকে ইবাদ নামলো। বলল,
–বেশি ভয় পেলি?
ঝুমুর ইচ্ছে করলো এই লোকটাকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দিতে। শীতের সময়ে উত্তম প্রতিশোধ হতো। কিন্তু সেই সাহস টা আর কোথায়?
ঝুমুর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ইবাদ তার হাত ধরে বলল,
–চল!

ঝুমু তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,
–কোথায়? আমি কোথাও যাবো না!
–তোকে যেতে অনুরোধ করছি না। যেতে হবে! (বলে টানতে টানতে গাড়ির দরজার কাছে নিয়ে গেলো)

ঝুমু মুচড়া মুচড়ি করছে। সে যাবে না! কোনো ভাবেই সে যাবে না। ইবাদ বিরক্ত হয়ে বলল,
–মানুষের সামনে সার্কাস শুরু করেছিস?

ঝুমু তাকালো আশেপাশে। এই রাস্তাটা অধিকাংশ সময়ই নীরব থাকে। মানুষজন এদিকটায় বেশি আড্ডা অথবা বসে গল্প করে না। রাস্তার দুইধারেই বেশ ঘন জঙ্গল। রাতের বেলা এদিক দিয়ে অনেকেই ভয়ে একা যাওয়া আসা করে না। ঝুমুকে মানুষ আসার অজুহাতে অন্যমনস্ক করে গাড়িতে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো ইবাদ। সে নিজেও উঠে গাড়ি স্টার্ট করলো। এদিকে ঝুমু যাবে না, যাবে না বলে চেচামেচি করছে। গাড়ির ভেতরের শব্দ বাহির হচ্ছে না। ঝুমু গাড়ির দরজা ধাক্কাচ্ছে। গাড়ির দরজা ভেতর দিকে লক করা। ইবাদ একহাতে ঝুমুর হাত দুটি চেপে ধরলো। ছাড়ুন আমাকে। আমি বলছি তো যাব না। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? গাড়ি অতিদূরবর্তী জায়গায় ছুটে চলছে। থামাথামির কোনো নাম নেই! এবার ঝুমু বলল, ‘ আমার সে জানতে পারলে আপনাকে মারবে বলে দিলাম। আমি তাকে বলব, আপনাকে আমার একটুও পছন্দ না। আপনি আমাকে বিরক্ত করেন! ‘

গাড়ি থেমে গেলো তৎক্ষণাৎ। ঝুমু সাহস নিয়ে কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করে আছে। এসব না বললে ইবাদ থামতো না। কিন্তু এখন কি হাল হবে ঝুমুর, তা সে নিজেও যানে না। পাশ থেকে ইবাদের গলা,
–ঝুমঝুমি!

ঝুমু তাকালো ইবাদের দিকে। ইবাদ একটানে ঝুমুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। ধীর গলায় বলল,
–কি বললি তুই? আবার বল!

ঝুমু বেশ সাহস নিয়ে বলল,
–আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না। আমার অন্য একজনকে ভালোলাগে। (মনে মনে আন্দাজ করতে পারছে তার সঙ্গে এখন কি হতে যাচ্ছে)

ইবাদ এমনভাবে ঝুমুর গাল চেপে ধরল যেন এক্ষুনি ফেটে রক্ত বের হয়ে যাবে। ‘ কি বললি তুই? বড্ড সাহসী হয়েছিস? ‘
প্রচন্ড ব্যথায় ঝুমুর চোখে বিন্দু বিন্দু অশ্রু জমতে শুরু করল। তবুও এক বুক সাহস নিয়ে বলল,
–বলেছি আমার অন্য একজনকে ভালো লাগে। আপনি কানে শুনতে পাননি?
–তাই নাকি? নাম কি সেই ছেলের? তোর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে কিভাবে?
ঝুমু বিপাকে। সে ছেলের নাম জানবে কিভাবে? ইবাদকে মিথ্যা কথা বলেছিল। তবুও আটকে আটকে বলল,
— রাসেল!
–রাসেল?

ঝুমুর গাল ছেড়ে এসে হু হা করে হাসতে শুরু করলো। ঝুমু যে মিথ্যা কথা বলেছে তা আর ইবাদের বুঝতে বাকি নেই। সে নিজে গ্রামে না থাকলেও ঝুমুর প্রতিক্ষনের খবর তার কাছে যায়। সে কি করছে? কোথায় যাচ্ছে? কার সঙ্গে যাচ্ছে? কার সঙ্গে কথা বলছে? সেখানে কোনো ছেলে ঝুমুকে প্রপোজ করবে এবং সম্পর্ক হবে সেই কথা তো চিন্তা করাও যায় না। ইবাদের হাসি দেখে ঝুমু ভাবছে অন্য কথা। লোকটা কি তার কথা বিশ্বাস করে নিল। এখন কি হবে? চিন্তা -ভাবনায় মশগুল সে। হঠাৎ হ্যাচকা টানে সে এদিক ফিরল। বেশ ঘাবড়ে গেলো। ইবাদের রাগ তার অজানা নয়। তার প্রতি ইবাদের ফিলিংস্ বুঝতে সক্ষম। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ইবাদকে চিনে। তার কাণ্ডকারখানা, রাগ, মোটামুটি সব কিছু সম্পর্কে বেশ অবগত। অন্যকোনো ছেলেকে আজ পর্যন্ত কাছে ঘেঁষতে দেয়নি, সেখানে ঝুমু নিজের মুখে বলছে অন্য কারো সঙ্গে প্রেম করার কথা। ইবাদের রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। তার চোখ মুখ মুহূর্তে পরিবর্তন হয়ে গেল। চেহারায় কঠিন থেকে অতিকঠিন্য ভাব। ঝুমু ঢোক গিলল। সে ভেবেই নিয়েছে, ইবাদের হাতে তাকে প্রাণ হারাতে হবে। কিন্তু ঝুমুকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে অতি নরম কণ্ঠে বলল,

~বেরঙা জীবনের রং হয়ে এসেছিস। আমার অন্ধকার জীবনে আলো হয়ে আছিস! তুই কি চাস ঝুম? আমি আবার অন্ধকারে হারিয়ে যাই?

- Advertisement -

Read More

Recent