শুক্রবার - জুন ২১ - ২০২৪

লিজা

২০১৩ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি। ‘মৌচাকে ঢিল ‘ ম্যাগাজিনের ফাল্গুনী ভালোবাসা সংখ্যা বাজারে এসে গেছে। আমার ‘ভালোবাসার গান’ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। ম্যাগাজিনের একেকটা সংখ্যা বাজারে আসে আর আমার ফোন ধরতে ধরতে অবস্থা কাহিল হয়! সে সময় আমার আশেপাশে যারা ছিলেন তারা দেখেছেন দিনে কতোবার আমাকে ফোন ধরতে হতো!

- Advertisement -

লেখার শেষে লেখকের ফোন নাম্বার ও ইমেইল অ্যাড্রেস উল্লেখ করা হতো।

লেখার শেষে লেখকের ফোন নাম্বার কেনো দেয়া হবে এই নিয়ে একদিন সম্পাদক শফিক রেহমানের ১৫ ইস্কাটন গার্ডেন-এর বাসায় আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন,

“যে কোনো লেখায় পাঠক প্রতিক্রিয়া জানায় কিন্তু মৌচাকে ঢিলে আমি কোনো চিঠিপত্র বিভাগ রাখিনি। যায়যায়দিনেও মেলব্যাগ নামে সামান্য জায়গা রেখেছিলাম। পাঠকরা এতো বেশি চিঠি পাঠায় যে সব চিঠি ছাপতে গেলে আমার অনেক পাতা বরাদ্ধ রাখতে হবে যা সম্ভব নয়। লেখকের ফোন নাম্বার দিলে পাঠক সরাসরি তার প্রতিক্রিয়া লেখককে জানাতে পারে। এতে পাঠক-লেখকের মধ্যে একটা সেতু বন্ধনও তৈরি হয়। মেয়ে লেখকরা চাইলে ফোন নাম্বার গোপন রাখা হয়।”

একদিন একটা এসএমএস পেলাম সিটিসেল নাম্বার থেকে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা। তখনো বাংলায় এসএমএস লেখার এতো প্রচলন ছিলো না। ছিলো না স্মার্ট ফোনের এতো দৌরাত্ন। ফেইসবুক একাউন্টও ছিলো না অনেকের। এসএমএসটা ছিলো এমন….

“Hi,
Ami Mahzabin, Mirpur dhaka theke bolchi.
‘Moucakey Dhil’ magazine er Falguni Valobasa songkhay apnar “Valobasar Gaan” lekhati porlam. khub valo legeche. Apnake onek dhonnobad. Poroborti songkhay aro valo lekhar ashay roilam.
Thank u.”
“হাই,
আমি মাহজাবিন, মিরপুর ঢাকা থেকে বলছি। মৌচাকে ঢিল ম্যাগাজিনের ফাল্গুনী ভালোবাসা সংখ্যায় আপনার ‘ভালোবাসার গান’ লেখাটি পড়লাম। খুব ভালো লেগেছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। পরবর্তী সংখ্যায় আরো ভালো লেখার আশায় রইলাম। থ্যাংক ইউ।”
এসব এসএমএস, ফোনের সঙ্গে আমি অনেক আগে থেকেই পরিচিত।

কয়েক ঘন্টা পর আমি একটা ছোট রিপ্লাই দিই।

Thank you for reading.

সঙ্গে সঙ্গেই আমি উত্তর পাই You are most welcome. O ha, valo kotha, ami jodi apnake majhe majhe sms kori, apni ki birokto hoben?

ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, আমি যদি আপনাকে মাঝে মাঝে এসএমএস করি আপনি কি বিরক্ত হবেন?

আমি বেশ ভাবনায় পরে গেলাম। কি উত্তর দেবো? হ্যাঁ নাকি না?

তিন ঘন্টা পর এক শব্দে উত্তর দিলাম ‘না’।

এরপর তিনি আরো বেশ কয়েকটা এসএমএস করলেন।

একদিন লিজা ফোন করলো। অনেক কথা হলো। তার পুরো নাম মাহজাবিন লিজা। সে নিজেই তার সব বললো। বাসা মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের কাছে। শ্বশুরের নিজের এপার্টমেন্ট। হাজব্যান্ডের নাম সুমন। হোটেল রেডিসনে একাউন্টসে জব করেন। লিজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেছে। দেশের বাড়ি নোয়াখালী। হাজব্যান্ডের দেশের বাড়ি ব্রাম্মনবাড়িয়া। বাবার একমাত্র সন্তান সুমন। লিজার ছোট ছোট দুটো মেয়ে আছে। লিজার বাবার উত্তরাতে নিজের বাড়ি আছে। লিজারা পাঁচ বোন। ভাই নেই। বাবা শিক্ষক ছিলেন। ভার্সিটিতে থাকতে লিজার সঙ্গে শরিফুল ইসলাম নামে একজন সহপাঠীর প্রেম ছিলো। ছেলেটি লোভী ছিলো। বিদেশ যাওয়ার জন্য লিজার কাছে টাকা চেয়েছিলো। না দেয়াতে লিজাকে ছেড়ে গেছে। এখন সুইডেন আছে। লিজা যায়যায়দিনেরও পাঠক ছিলো। যায়যায়দিনে নাকি দু’একটা লেখাও লিখেছিলো। আমার নামের সঙ্গে তখন থেকেই পরিচিত ছিলো।

ওই সময়, ২০১৩ সালে লিজার বয়স ছিলো ৩৩ বছর।

কিন্তু লিজাকে খুব কম বয়সী মনে হতো। আমার ২০১০ থেকেই ফেবু একাউন্ট আছে। একদিন ফেবুতেও আমরা বন্ধু হলাম। লিজা প্রতিদিন আমাকে কয়েকবার ফোন করতো। এসএমএস করতো। আমিও উত্তর দিতাম। লিজা ফানি ছিলো খুব। একদিন আমি ফান করে লিজাকে লিখলাম, এতো বেশি যোগাযোগ হলে কিন্তু ভালোবেসে ফেলবো। লিজা আমাকে লিখলো, ‘ভালোবাস, বাসতে বাসতে মইরা যা।’ তবে আমার সঙ্গে এই যোগাযোগ তার হাসব্যান্ড জানতো না। প্রতিদিনই সন্ধ্যা ৬টায় আমাকে গুড নাইট বলে এসএমএস করতো। হাসব্যান্ড বাসায় আসার আগে। আমি কখনোই আগে থেকে লিজাকে এসএমএস করতাম না। ফোন করার তো প্রশ্নই আসে না।

এভাবে মাসখানেক কথা বলতে বলতে আমরা কিছুটা ঘনিষ্ঠ হই। লিজা আমাকে ‘তুমি’ বলে কথা বলতে লাগলো। যায়যায়দিন আর মৌচাকে ঢিলে লেখার কারনে অনেক ছেলে মেয়েরাই আমাকে বেশ ভালোবাসতো। সেটা আমার লেখার কারনে। এটা আমিও স্বাভাবিকভাবেই নিতাম। লেখক, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের অনেক ফ্যান থাকে।

আমি নিজেও কতো জনের ফ্যান ! নিউ ইয়র্কের মুক্তধারা লাইব্রেরিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসেছিলেন শুনে আমি কাজটাজ ফেলে গিয়েছিলাম প্রিয় লেখকের একটু সান্নিধ্য পেতে। একটু কথা বলতে। মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে নিউইয়র্কের এক কনসার্টে এক মিনিট নেচেও ছিলাম। যা ফেবুতে লিখেছিলাম আগের একাউন্টে। কয়েকদিন আগে আমি মাধুরী দীক্ষিত ফ্যানস ক্লাবের মেম্বারও হয়েছি!

লিজা আমাকে সামনা সামনি দেখতে চায়। খুব অনুনয় বিনয় করে। প্রতিদিন ফোন করে কয়েকবার।

এপৃল মাসের ২১ তারিখ (২০১৩) আমি ঢাকা যাবো শুনে আবদার করলো, আমার সঙ্গে সে দেখা করতে চায়।

মিরপুর ১ নাম্বার থেকে ১০ টাকা রিকশা ভাড়া দিলেই শাহ আলী মাজার পার হয়ে একটু পরই বুদ্ধিজীবী কবরস্থান।

লিজার একজন বান্ধবী ছিলো। নাম জয়িতা। আমাকে লিজা বললো, জয়িতার বাসায় দেখা করবে। সময় দিলো সকাল ৮:৩০ থেকে ১০:৩০ এর মধ্যে আমি যেনো বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে থাকি। এই সময় লিজা মেয়েকে স্কুলে নিয়ে আসে। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ওই সময়টায় আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমি যথারীতি আগের দিন ঢাকায় গিয়ে মিরপুর এক নাম্বারে প্রিন্স হোটেলে উঠলাম। পরদিন ২১ এপৃল সকাল ৯ টায় বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে যাওয়ার আগেই লিজা ফোন করলো। বললাম, আসছি। একটু পর। আমি পৌঁছেই দেখি বেশ দূরে দু’জন মেয়ে দাঁড়িয়ে।

লিজা আবার ফোন করলে বললাম, বটল গ্রিন হাফ স্লিভ ইন করা শার্ট, কালো প্যান্ট আর কালো জুতার মানুষটিই আমি। লিজা বললো, রাস্তার উল্টো দিকে যে দু’জন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাদের ফলো করতে। তারা হাঁটছে আমিও হাঁটছি। একটা বাসায় ঢুকলো। আমিও।

দোতলায় উঠেই আমাকে জয়িতা বললো, ভেতরে আসুন। আমি অভ্যাসবশত জুতা খুলে ভেতরে গেলাম।লিজা শিক্ষিত। বেশ সুন্দরী। আকর্ষণীয়। স্মার্ট। আন্তরিক। লিজা আমার সঙ্গে অনেক দিনের চেনা মানুষের মতো আচরণ করতে লাগলো। আমিও। একটু পরই জয়িতা আমার জুতাগুলো রুমের ভেতরে রেখে বললো, আপনারা বসুন। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি। আমি বাধা দিয়ে বললাম, আপনিও বসুন। আমি এতো সকালে নাস্তা খাই না। তবু তিনি বাইরে গেলেন। জুতা ভেতরে রাখায় আমি অনুমান করলাম, বাইরে থেকে যেনো কেউ বুঝতে না পারে বাসায় কোনো মানুষ আছে। লিজাকে বললাম, এতো লুকোচুরির কি আছে?

লিজা ঘনিষ্ঠ মানুষের মতো বললো, আরে জানো না। এই দেশে আমরা আধুনিকতা দেখাই ঠিকই কিন্তু কম বেশি সবার মনেই ময়লা। তোমার লেখা আমার ভালো লাগে। তাই তোমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা। এটাকেও অনেকেই ভালো চোখে দেখবে না। আমি তর্ক করে বললাম, তাহলে দেখা করার এই ইচ্ছাটাকেও নিয়ন্ত্রণ করা কি দরকার না? লিজা তর্ক করে বললো, কেনো? শাহরুখ খান এসে আমাকে একটা চুমু দিলে তো কেউ কিছু মনে করবে না। আমার বরও খুশিই হবেন। হয়তো অনেকের বরই খুশি হবে। বলতে বলতে লিজা একটা বড় শপিং ব্যাগ বের করলো। প্রথমেই একটা সুন্দর ডায়েরি দিলো আমার হাতে। ব্র্যাক ব্যাংকের। বেশ দামি। লেদার কাভারের। তারপর দুটো কলম দিলো। দেশি কিন্তু দামি। এরপর ব্যাগ থেকে বের করলো আনিসুল হকের ‘খেয়া’ উপন্যাস। একটা Eternal Love পারফিউম। কফি খাওয়ার একটা বড় কাপ লাভ সাইন দেয়া। আমি অবাক হয়ে বললাম, এতোগুলো জিনিষ আমি কিভাবে নেবো? আমি এতো বোঝা বইতে পারবো না। লিজা আপনজনের মতো ধমক দিয়ে বললো, একদম চুপ। আমি এই ব্যাগেই প্যাক করে দেবো।
কিছুক্ষণ পর জয়িতা এলো। খালি হাতে। বুঝলাম, আমাদের সে একা থাকতে সুযোগ দিয়েছিলো নাস্তা রেডি করার নামে। এরপর জয়িতা আমাদের নাস্তা দিলো। এক টেবিলে বসেই নাস্তা খেলাম। মাঝে মাঝে লিজাও আমার প্লেটে এটা সেটা দেয়। আমি মজা করে বললাম, থাক, আর ভালোবাসা দেখাতে হবে না গো বইন। আমি যে এতো জনপ্রিয় লেখক তাতো জানতাম না!! লিজা আমার হাতে চিমটি কেটে বললো, তুমি আসলেই একটা অল রাউন্ডার।

১০টা পর্যন্ত ওই বাসায় ছিলাম। জয়িতার হাসব্যান্ড একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিচার। তিনি ৮ টায় স্কুলে চলে গেছেন বলে জয়িতা জানালো। ওই বাসা থেকে জানালা দিয়ে লিজা তার বাসাও দেখালো। আরো কিছুক্ষণ গল্প করে আমি বিদায় নিই।

এরপর প্রায় এক মাস লিজা নিয়মিত ফোন করে আমার খোঁজ খবর নিতো। আমি লিজাকে তখন বলেছিলাম, তোমার আমার এই যোগাযোগ নিয়ে একদিন আমি পত্রিকায় গল্প লিখবো। আমিতো আত্নজৈবনিক লেখাই লিখি। লিজা অনুমতি দিয়েছিলো। বলেছিলো, আমি যদি কোনোদিন তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাই তখন লিখো। এর কয়েকদিন পরই লিজা আমাকে এসএমএস করে জানালো যে, সে যে আমার সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়টা তার বর জেনেছে। এবং আর যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছে।

আমি লিজাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলাম। আর লিজার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। সিটিসেল অপারেটরও বন্ধ হয়ে গেছে! দুই মাসের সেই বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক নিয়েই আজ আমার এই লেখা। সেই ২০১৩ সালে দুই কন্যা সন্তানের জননী লিজা এখন ৪৪ বছরের এক ভদ্র মহিলা।

- Advertisement -

Read More

Recent