বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

তবুও রক্তেভেজা ফাগুনের শুভেচ্ছা

আমাদের সময়ও ফাগুন ছিল

এখনকার ছেলেমেয়েরা গান শুনে,

“আজ ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে চল পলায়ে যাই।”

- Advertisement -

এখন জীবনের সবকিছুতেই পলায়নপর মানসিকতা। এই জন্য এ প্রজন্মকে দায়ী করা ঠিক হবে না। এই মানসিকতা তৈরী করে দিয়েছে নস্ট পুঁজিবাদ। তারুন্যের জেগে উঠাকে পুঁজিবাদ ভয় পায় বলেই সুকৌশলে শিল্প সংস্কৃতিতে এখন চাষাবাদ হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার। সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা মানুষকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ফলে বড্ডবেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে মানুষ। সবাই এখন জপে, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম ‘। কিন্তু আমাদের পুর্বসুরীরা জীবনের মায়ার চেয়ে দেশের মায়াকে বড় করে দেখেছেন। ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষার আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজী রেখে লড়াই করেছে। অথচ এ প্রজন্ম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে এরকমটা নিশ্চয় কেউ চায়নি! এর সবকিছুর পিছনে সমাজ, রাস্ট্রব্যবস্থা যারা কুক্ষিগত করে রেখেছে তারাই দায়ী।

হুমায়ুন আজাদ ঠিকই বলেছিলেন , ” আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক সব সংঘ-পরিষদ; চলে যাবে, অত্যন্ত উল্লাসে, চ’লে যাবে এই সমাজ-সভ্যতা-সমস্ত দলিল নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের অধিকারে।”

আমাদের কৈশোরে তারুন্যে আমরা স্বৈরাচার হটানোর মুক্তিরমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিলাম। দেশে মাথার ওপর জগদ্দল পাথরের মতন চেপে বসা স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছিলাম। পুলিশী নিপীড়ন, কাঁদানে গ্যাস, জেল, হাজতবাস আমাদের দমাতে পারেনি। তখন আমরা হেলাল হাফিজকে উদ্ধৃত করতাম।

‘ এখন যৌবন যার
মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় ‘।

আমাদের সময়ও ফাগুন ছিল। তিরাশীর মধ্য ফেব্রুয়ারীর সেই ফাগুনে বুকের তাজারক্তে পিচঢালা পথ রঞ্জিত হয়েছে। স্ফুলিংগের মতন দ্রোহের দাবানলে সারাদেশের তারুন্য জেগে উঠেছিল। আহা কি দিন ছিল!

সারাদেশের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত তরুনদের একেকজন যেন ছিল গেরিলা, বিপ্লবীযোদ্ধা!

আমাদের পুর্বসুরীরা তখন রাউফুন বসুনিয়া, জয়নাল, জাফর,কাঞ্চন,দীপালি সাহার রক্তছুঁয়ে শপথ নিয়েছিল। ‘ স্বৈরাচার হটাবোই।’

আমরাও পিছিয়ে থাকিনি।স্কুল পালিয়ে মিছিলের সাথী হতাম। আর জহির রায়হান থেকে উদ্ধৃত করে আওড়াতাম , “আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো”।

৮৩,৮৪’র পর অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এলো। ঢাকা অবরোধ। সারাদেশের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা, অজানা আশংকা ‘কখন কি হয়’।

জীবন্ত পোস্টার হয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলো সময়ের সাহসী সন্তান নুর হোসেন। তার উদোম বুকে পিঠে লেখা-

‘ স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক ‘।

এ যেন দেশবাসীর আকাংখার প্রতিফলন ছিল।

সেদিন স্বৈরাচারের বুলেট নুর হোসেনের বুক বির্দীন করলেও আমরা রাজপথ ছেঁড়ে যাইনি। এক নুর হোসেনের বদলে হাজার হাজার নুর হোসেন তখন রাজপথ প্রকম্পিত করেছে দৃপ্ত শ্লোগানে।

আমরা পিট সিগারকে কন্ঠে ধারন করে গেয়ে উঠেছি, We shall overcome, some day.

We shall overcome, some day.

Oh, deep in my heart,

Oh, deep in my heart….

হ্যাঁ আমরা অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা, অনেক রক্তপাত, অসহনীয় নিপীড়ন দমন সহ্য করে অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিস্বেম্বর স্বৈরাচার হটিয়েছিলাম। ৫,৭,৮ দল ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদের যুগপত আন্দোলনকে একসুঁতোয় গেঁথেছিল স্পর্ধিত তারুন্যের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। সেই ইতিহাস অনেকেই এখন কুক্ষিগত করার হীন চেস্টায় লিপ্ত। ধিক্কার জানাই তাদের, যারা ইতিহাস বিকৃত করে।

ফাগুন এলে অনেক কথাই মনে পড়ে।

মনে পড়ে, কিভাবে আমাদের ছাতা আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে মুছে দিতে নব্বই পরবর্তী শাসকগোষ্ঠীর দোসর শফিক রেহমান ভ্যালেন্টাইন ডে আমদানী করে। আমরা এখন মধ্য ফেব্রুয়ারী পালন করি না। করি ভালোবাসা দিবসের নামে পশ্চিমাদের ভ্যালেন্টাইন ডে!

কি অদ্ভুত ইতিহাস বিস্মৃত প্রজন্ম গড়ে তুলছে নস্ট পুঁজিবাদ।

প্রকৃতিতে এখন আগুন লেগেছে। শিমুল পলাশ রক্তে রাঙানো। গাছে গাছে পাখিরা গান গায়। হ্রদয় শিহরণে মন থেকে গেয়ে উঠি রবি ঠাকুরের, ‘আহা আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে।’

তবুও সবাইকে রক্তেভেজা ফাগুনের শুভেচ্ছা।

- Advertisement -

Read More

Recent