বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

নির্বাচন নিয়ে আমার ভাবনা

যে নির্বাচন হয়ে গেল সেখানে জাসদ এখন প্রাসঙ্গিক না কিন্তু আওয়ামী লীগের তৃণমূল যা কিনা জাসদের জন্ম দেয় তার উত্থানের ইংগিত কি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না

আওয়ামী লীগের একটা প্রচন্ড অভিমানী এবং একইসঙ্গে জেদি তৃণমূল আছে, যারা কোনদিন ঘুমায় বলে মনে হয় না। বাঙালি জাতিসত্ত্বার অনেক গভীর থেকে ওঠে আসা এই তৃণমূল প্রায়শঃই বিস্মৃতিতে হারিয়ে যায়, বিশেষ করে দল যখন ক্ষমতায় থাকে। নিঃশেষে প্রাণ দান করার এক দৃঢ় প্রত্যয় এদের রক্তে খেলা করে, এরা ইকুয়েশন বোঝে না, রাজনীতি বুঝতে চায় না, অবুঝ শিশুর মতো এক মন নিয়ে এরা তাকিয়ে থাকে–কখনো শেখ মুজিব, কখনো শেখ হাসিনার দিকে এবং গড়মিল হয়ে গেলে বিদ্রোহ করে। সবচে বড় উদাহরণ জাসদ, স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক বছরের মাথায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বিদ্রোহ থেকে জন্ম নিয়েছিল দলটি। জেনারেলগণ কিংস পার্টি তৈরী থেকে শুরু করে জামায়াতিদের উত্থান, তথা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ব্রিটিশীয় রাজনীতির পুণর্জন্ম না দিলে, যে সম্ভাবনা নিয়ে জাসদের জন্ম, তার পরিণতি জাতি প্রত্যক্ষ করতে পারতো, বিরোধীদল বিরোধীদল বলে যে হাহাকার এখন আকাশে-বাতাসে, তার প্রয়োজন হতো না, এটা হলফ করে বলা যায়।

যে নির্বাচন হয়ে গেল, সেখানে জাসদ এখন প্রাসঙ্গিক না; কিন্তু, আওয়ামী লীগের তৃণমূল, যা কিনা জাসদের জন্ম দেয়, তার উত্থানের ইংগিত কি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না? দুটো কিংস পার্টি– বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি কী হাস্যকরভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে; ভাবা যায়! এদের একটা যদি ভর করে আছে মার্কিনীদের উপর, তো আরেকটা ভারতের। বিএনপি বহুদিন ভারতের কৃপা লাভ করেছে, এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু, লাভ হবে বলে মনে হয় না। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে জামায়াত আর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের খপ্পড়ে পড়ে আসাম-ত্রিপুরা-নাগাল্যান্ডসহ সপ্তকন্যাকে ভারতমাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার দৌড়ে বহুদূর এগিয়ে যাওয়াটা বিএনপি’র জন্য জন্য কাল হয়ে গেছে। হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক উপযোগিতা বিজিপির অনুকূলে, যতক্ষণ তা ছিল, বিএনপিতে অসুবিধে ছিল না ভারতের; কিন্তু ভারতের বিশাল অঞ্চলকে আলাদা করে ফেলা? সুযোগটি নিয়েছেন শেখ হাসিনা, পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতোই কৌশলী তিনি, ভারতের অখন্ডতার নিশ্চয়তা প্রদানের বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি– এটাই তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্য। মাথাপিছু গড় আয়ে বাংলাদেশ ভারতকে অতিক্রম করে যাওয়ার পরে ভারতের অর্থনীতিবিদ তথা পলিসি মেকারদের মুখ কালো হয়ে গেছে– না পারছে কইতে সা পারছে সইতে (বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের তথ্য: বাংলাদেশ ২,৬৮৮.৩ মার্কিন ডলার, ভারত ২,৪১০.৯ মার্কিন ডলার, পাকিস্তান ১,৫৮৮.৯ মার্কিন ডলার)। বাংলাদেশ উন্নতি করে সিঙ্গাপুর হয়ে যাক, তবু, ভারত অখন্ড থাকুক, এ ছাড়া যে উপায় নাই।

- Advertisement -

বিএনপির নির্বাচন বর্জন দেশের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলে যে বিদ্রোহ, তা সম্ভব হয়েছে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি অপশক্তির এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হওয়ায়। ব্যারিস্টার সুমন তো দৃশ্যমান; এমন শতশত তরুণ নেতৃত্বে ভরপুর আওয়ামী লীগের তৃণমূল, যারা কিনা দূর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলের বিরুদ্ধে সারাক্ষণ সোচ্চার। অথচ, দলের ওপরতলায় এরা অচ্ছুৎ। এমনকি মাঠপর্যায়েও তারা কোনঠাসা।

যে ৬০ জন তৃণমূলের আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্র হিসেবে জিতে এসেছে, তাদের বেশিরভাগই ভয়ংকরভাব বিদ্রোহী এবং জেদি, আওয়ামী লীগের ওপরতলার ইকুয়েশন আর রাজনীতি বুঝতে এরা অপারগ। দিনাজপুর-১ আসনের জাকারিয়ার কথাই ধরা যাক, প্রথমবারের মতো ভোটে দাঁড়িয়ে তিনবারের এমপি গোপালকে হারিয়ে দিয়েছে দশ হাজার ভোটে। একদা জাগপা থেকে জাতীয় পার্টি হয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসা গোপালের ওপর মহাক্ষ্যাপা সেখানকার আওয়ামী লীগের তৃণমূল। বিএনপি-জামাত ভোট করলে তৃণমূলকে গোপাল প্রশ্নে আপস করতে হতো, নমিনেশন গোপাল পেতো, তাতে সন্দেহ নাই, কারণ, এই কাজটি কীভাবে করতে হয়ে, সেটি তার ভালোমতো জানা। টাকা তো আছেই, সেই সাথে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র আনুকূল্য লাভ করতে প্রায়শঃই তাদের হুজুরেদের নিয়ে হাজির হতো মন্দিরগুলোতে। হিন্দুত্বে মানুষ আপত্তি করতো না, কিন্তু, দূর্নীতি আর দখল? না, আওয়ামী লীগের তৃণমূলের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল।

আমাদের মিডিয়ার একটুও নজর নাই সেদিকে। বিএনপি ছাড়া তাদের ভাত হজম হয় না, সেজন্য প্রতিরাতের টকশোতে প্রবলভাবে হাজির হয় তারা। আর আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসা সত্ত্বেও তাদেরকে লীগের বি-টিম বানিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আওয়ামী লীগের ওপরতলায় যে ঘুন ধরেছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য বিদ্রোহীদের উচিত হবে নিজেদের সংগঠিত করা, এবং সংসদে জনগণের সমস্যা ও দাবি নিয়ে সোচ্চার থাকা; লীগের মধ্যে বিলুপ্ত হওয়াটা হবে আত্মঘাতি। জনগণ তাঁদেরকে সে অধিকার দেয় নাই।

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent