শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

ধূসর কাবিন রঙিন প্রণয়

ধূসর কাবিন রঙিন প্রণয়

জালাল আবেদীন সাহেব যে ডোনার এনেছেন, তার সাথে চন্দ্রিমার ম্যাচ হলেও চৈতালীর মতো ভালো হয় না। ডাক্তার চৈতালীকেি ডোনার করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু জালাল আবেদীন চাইছেন যেহেতু একজন সুস্থ সবল পুরুষের লিভারের সাথে ম্যাচ করেছে। তারটাই নেওয়া হোক। জেরিন সুলতানা অবাক হচ্ছেন। চন্দ্রিমার কাছে এখন মাহিম আছে। জেরিন সুলতানা কফি খাওয়ার বাহানায় জালাল আবেদীনকে নিয়ে বের হয়ে আসেন।

“চৈতালীরটা বেশি ভালো ম্যাচ হলে তারটাই নেওয়া ভালো না?”

- Advertisement -

“এই ছেলেরটাও ম্যাচ হয়েছে। আর সে স্বেচ্ছায় টাকার বিনিময়ে দিতে চাইছে লিভার। কোনো অপরাধ বোধের ভয় নেই। কারও কাছে ছোটো হওয়ার ভয় নেই। তাছাড়া আমরা চৈতালীকেও কোনো গিল্ট ছাড়া মুক্ত করে দিতে পারি।”

“তোমার কী হয়েছে জালাল? এমন কিছু হয়েছে যা আমি দেখেও দেখছি না। হয়তো চন্দ্রকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকায় আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আমি অনুভব করছি তুমি সারারাত ঘুমাও না। আমার যেন ঘুমের সমস্যা না হয়, আমি যেন টের না পাই সেজন্য কেমন মূর্তির মতো একপাশে কাত হয়ে শুয়ে থাক।”

“এমন কিছু না জেরিন।”

“ঘুমন্ত মানুষ আর ঘুমের অভিনয় করা মানুষ বোঝা যায় জালাল। তুমি এমন কিছু জানো যা আমি জানি না। আর সেই কিছুটা তোমার মনের ভেতরটা কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছে। স্বামী স্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই আমরা বন্ধু। আমাদের দাম্পত্য সম্পর্কে লুকোচুরি বিষয়টা কবে জায়গা করে নিয়েছে টের কন পাইনি? আমি কি চন্দ্রকে নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।”

“তুমি চমৎকার একজন বন্ধু, স্ত্রী এবং মা। আমিই ব্যর্থ একজন। ভীতু একজন।”

“জালাল, আমি জানতে চাই সবকিছু। প্লিজ।”

জালাল আবেদীন সাহেবও বোঝেন জেরিন সুলতানাকে বলতে হবে। একা তিনি সামলাতে পারবেন না। ইদানীং টেনশনে বুকটা ভার লাগে। মনে হয় যেন হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যাবে। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে সবটুকু বুঝিয়ে বলতে প্রস্তুত হন জালাল আবেদীন। জানেন বিষয়টা সহজ নয়।

কিন্তু অস্বস্তিকর অনুভূতির ধাপটা পার হওয়ার পরই সম্ভবত স্বস্তির সময়টা আসে। বিশৃঙ্খল সবকিছু একদিনেই ঠিক করা যাবে বিষয়টা তা নয়। তবে অল্প অল্প করে গুছিয়ে আগালে হয়তো এই সময়টা সামলে নেওয়া যাবে। জালাল আবেদীন সাহেব অপারগ। চন্দ্রিমার ভালো থাকা মাহিমের সাথে। আর মাহিমের জীবনে জুড়ে গিয়েছে চৈতালী। চৈতালী মেয়েটা ভীষণ ভালো। ওর সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ চান জালাল আবেদীন। কিন্তু তার বিনিময়ে চন্দ্রিমা প্রিয় মানুষকে ভাগ করার কষ্টে সবসময় যাতনায় থাকুক তাও চান না। ডাক্তার বলেছেন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট যদি সফল হয়েও যায়, চন্দ্রিমার আয়ু সীমিতই থাকবে। হয়তো কয়েকবছর একটু সুস্থ জীবন কাটাবে। এরপর আবার লিভারের কন্ডিশন খারাপ হতে থাকবে। সিরোসিস আর কার্সিনোমার সার্জারির পর পাঁচ বছর বাঁচলেই সফল ধরা হয়। খুব কম ভাগ্যবান মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয় যে ক্যান্সার আবার ফিরে আসে না। আর লিভার সিরোসিসে সম্পূর্ণ সুস্থতা হয় না বললেই চলে। জালাল আবেদীন সাহেব তাই মেয়ের জীবনের শেষ দিনগুলো সুন্দর করতে চান। হাল ছেড়ে দিতে চান না। তাই ইচ্ছে করে অনেকগুলো বিষয় তিনি মাহিমের কাছে লুকিয়েছেন। এখন জেরিন সুলতানাকে এসব খুলে বলেন।

“তোমার কী মনে হয় জালাল? চৈতালী, চন্দ্রিমার সেই ফুপাতো বোন?”

“চৈতালীর প্রতি চন্দ্রিমার রেসপন্স। ডিএনএ ম্যাচিং সব তো তাই নির্দেশ করে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি রহিম তরফদার আর শিউলি বেগম হুট করে ওখানে এসে বাসা বেঁধেছেন। চৈতালীর প্রতি ওনাদের অনুভূতি আর দায়িত্বও আপন মা বাবার মতো না। হ্যাঁ, আমরাও চন্দ্রিমার আপন মা বাবা নই। কিন্তু আমরা তো ওকে নিজের ভাবি। কিন্তু এখানে তারচেয়ে জটিল বিষয় হলো চৈতালীর মা বাবা কি কোনো ভাবে রহিম তরফদার বা শিউলি বেগমের পরিচিত কেউ ছিল। তাহলে কি খান বাড়ির সাথে তাদের কোনো আত্মীয়তা আছে? না তাদের সম্পর্ক শিউলি বেগম পর্যন্ত শেষ?”

“আচ্ছা মাহিম চন্দ্রিমার ব্যাপারে এত খোঁজ নিচ্ছিল কেন? ও চন্দ্রিমাকে নিয়ে সন্দেহ করে?”

“তাহিরা মেয়েটার সাথে দেখা হয়েছে। এতদিন মাহিমের মাথায় এসব না আসলেও এখন চৈতালীর সংস্পর্শে মাহিম অনেকটা চন্দ্রিমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। তাই এ নিয়ে ভাবার অবকাশ পেয়েছে।”

“চন্দ্রিমার বিষয়টা তো ডাক্তার বলেছিলেনই যে প্রিয় আর কাছের মানুষদের নিজের কাছাকাছি রাখতে মাঝেমধ্যে ও নিজের অজান্তে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ফেলে। হয়তো মাহিমের বন্ধু হিমেলকে নিয়ে করা ওর অভিযোগ মিথ্যা হলেও হতে পারে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না ও তাহিরাকে ধাক্কা দিয়েছে। এতে তাহিরার জীবনও যেতে পারতো।।আমার মেয়েটা খুনী না। অনেক বছর আগে আমার যখন মিসক্যারেজ হয়, তখন আম্মা বলার চেষ্টা করেছিলেন যে চন্দ্রিমা কিছু করেনি তো। আম্মা জীবিত থাকতে চন্দ্রিমাকে ভুল বুঝতেন। কিন্তু আমি একাই সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। একটা আট নয় বছরের বাচ্চা পরিকল্পনা করে এসব করতে পারে না। অথচ আম্মাকে বোঝাতেই পারিনি। ওর ক্লাস্টার বি সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনস এর কথা জানলে মানুষ ওকে পাগল সাবস্ত করবে, এই ভয়েই তো আমরা ওর সাইকো থেরাপি নেওয়ার বিষয়টা লুকিয়েছি। মাহিম কি এটা বুঝবে না?”

“মাহিম বুঝলেও ওর পরিবার কি বুঝবে? যখন জানবে চন্দ্রিমা আমাদের মেয়ে না?”

“সেটা তো তুমি বললে চৈতালীও না। আমাদের মেয়ে কোনো রাস্তার ফকিরের মেয়ে না যে জোবাইদা বেগম বা ফজলে আলী খান তাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারবেন।”

“তারপরও আমি এটা মাহিমের সাথে মিটিয়ে নিতে চাই। তার পরিবার চন্দ্রিমার বিষয়ে কিছু না জানুক। মাহিমের জীবন থেকে চৈতালীর চলে যাওয়াও জরুরি। ও চলে গেলে মাহিম চন্দ্রিমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। চৈতালীকে ডোনার না করাই ভালো। ও ডোনার হলে মাহিম ওর প্রতি ওর মাহাত্ম্যের প্রতি আরও অনুরক্ত হয়ে পড়বে জেরিন।”

ফজলে আলী খান ভীষণ রেগে গিয়েছেন। চৈতালী যে রহিম তরফদার আর শিউলির ঔরসজাত সন্তান নয়, এ কথা চাপা থাকে না। ফজলে আলী খান রহিম তরফদার আর শিউলিকে ডেকে পাঠিয়েছেন। চৈতালীর জন্ম পরিচয় কী জানতে চান। মূলত চৈতালী কি বৈধ না অবৈধ সন্তান তাই তার জানার বিষয়। নাতির এটা দ্বিতীয় বিয়েই হোক না কেন। তিনি কোনো অবৈধ রক্তকে তার বংশের সাথে জুড়ে থাকতে দেবেন না। দরকার হলে কাবিনের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে চৈতালীকে বিদায় করবেন। চৈতালী, চন্দ্রিমাকে লিভার ডোনেট করলে তার মূল্যও দেওয়া হবে। খবরটা শফিকের মাধ্যমে চৈতালীর ম্যাসেনজারেও পৌঁছে যায়। চৈতালী, মাহিম দু’জনই আকজ হসপিটালে। আজ চন্দ্রিমার সার্জারি হবে। ডোনার, জালাল আবেদীনের ঠিক করা লোকটিই হচ্ছে। মাহিম আপত্তি না জানিয়ে জালাল আবেদীনকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে বলেন,

“বাবা, আমি বুঝতে পারছি আপনি এমনটা কেন চাইছেন। আপনার মনে অপরাধবোধ আছে।আপনি জানেন আপনি আমাকে যতটুকু জানিয়েছেন তা অর্ধেক সত্য। কিছু লোকজন আমারও আছে বাবা। আমি খোঁজ নিয়েছি। চন্দ্রিমার বিদেশ জীবনটা সুশৃংখল ছিল না। মানসিক সমস্যা ছিল। বয়ফ্রেন্ড ছিল। ড্রাগসে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এসব কিছু থেকে আপনি আর আম্মু ওকে মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে বের করে এনেছেন। আপনারা চমৎকার বাবা মা। কিন্তু এখনকার ঘটনা অন্য কিছু তাই না? চৈতালী আর চন্দ্রিমা কি পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত?”

“তাদের সম্পর্ক তোমাকে দিয়ে। আমি চাই না আমার মেয়েটা সুস্থ হয়ে আবার তোমাকে ভাগ করার কষ্ট পাক। ওর আয়ু এমনিতেই ক্ষণস্থায়ী হবে। হয়তো কয়েকবছর। সেই কয়েকটা বছর ও একা তোমাকে পাক প্লিজ। আমি অনুরোধ করছি। চৈতালীর বয়স কম। সুস্থ একটা মেয়ে। ওর জীবনটা ও গুছিয়ে নিতে পারবে। আমার মেয়েটার জীবনে তো আর কিছু নেই। ওর জীবনের শেষ কয়েকটা বছর ও শান্তিতে কাটাক। একজন বাবা তোমার কাছে মেয়ের খুশি ভিক্ষা চায়। দায়িত্ব, ভালোবাসা সবকিছুর ভেতর তুমি চন্দ্রিমাকে বেছে নাও।”

“এর বাইরে তাদের কী সম্পর্ক?”

“আমি নিশ্চিত না। তবে চৈতালী সম্ভবত চন্দ্রিমার ফুপাতো বোন। চন্দ্রিমা যে ফুপা ফুপির কাছে বড়ো হচ্ছিল তাদের একটি মেয়ে ছিল। যাকে তার মা অন্য একজনের কাছে দত্তক দিয়েছিল।”

চৈতালীর ফোনে যখন শফিকের ম্যাসেজটা আসে। চৈতালী অবাক হয় না। এই সংসারে হয়তো তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। চন্দ্রিমার ডোনার যোগাড় হয়েছে। ফজলে আলী খান ওকে এই পরিবারে মেনে নেবেন না। হয়তো মাহিমও চন্দ্রিমার প্রতি নিজের দায়িত্ব, ভালোবাসা, মানবিকতার অনুভূতি এড়িয়ে চৈতালীর হাতটা শক্ত করে ধরতে পারবে না।

“রহিম, তুমি কোনখানের পাপ আমার নাতির গলায় ঝুলিয়েছ? কার পাপ? তোমার বোনদের কারও অবৈধ সন্তান না তো? না তোমার বৌয়ের তরফের কারও।”

রহিম তরফদার ইতি-উতি তাকিয়ে জোহরা বেগমকে খুঁজে ফেরে। জোহরা বেগম কী আজ নাতনির জন্য সামনে আসবেন?

“আমার বইনেরা সব নিষ্পাপ। আল্লাহ সাক্ষী আমার বইনগো চরিত্র নিয়া কেউ কালি দিতে পারব না।”

“তাহলে তোমার শ্বশুর পক্ষের কারও? মেয়ের বাপ মা কে?”

“মেয়ের বাবার নাম হোসান আলী খান। আর মায়ের নাম ইসরাত জাহান ফাহিমা।”

মাহিমের বাবা হাসান আলী খান, মা জোহরা বেগমকে নিয়ে বসার ঘরে এসে দাঁড়ান।

“কী বললে তুমি?”

“যা শুনলেন আব্বা। চৈতালীর বাবা মা ওর নাম রেখেছিল ফারিসা। কিন্তু যে খান বংশে ওর বাবা মায়ের স্থান হয়নি, সে বাড়িতে ওর জায়গা হবে না ভয়েই ছিল তার দাদী। তাই ফারিসা হয়ে যায় চৈতালী। খান বাড়ির নাতনি হয়ে যায় কেয়ারটেকারের মেয়ে।”
হাসান আলী খানকে সারাজীবন সবাই চুপচাপ নির্ভেজাল মানুষ হিসেবে জেনে এসেছে। যার সংসারে কোনো আওয়াজ আছে বলে কেউ জানতো না। আজ তাকে বাবা ফজলে আলী খানের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়।
জোহরা বেগমের এই গোপন সত্য আরেকজন জানতো। মিন্নী। কয়েকবছর আগেই মিন্নী জানতে পারে তার একজন চাচাতো বোন আছে। যাকে দাদা এই বাড়িতে মেনে নেবেন না বলে দাদী গোপনে দূরে কোথাও দত্তক দিয়ে দিয়েছেন। কয়েকবছর আগের কথা। একটা ফাংশনে লাইট কালারের সিল্কের শাড়ি পরবে ঠিক করেছিল মিন্নী। মায়ের সব কালেকশন ভারী কাজের। হালকা রঙ যা আছে তা সিল্ক নয়। চাইলে নিজেই কিনে নিতে পারতো। কিন্তু কী মনে করে দাদীর রুমে যায়। জোহরা বেগম ঘুমাচ্ছিলন। মিন্নী সাইড টেবিল থেকে আলগোছে চাবি তুলে নিয়ে আলমারি খোলে। কাপড় দেখতে দেখতে হাত গিয়ে পৌঁছে কাপড়ের ভাঁজে থাকা একটা খামে। খামটা বের করে নিয়ে আসে। পুরানো মলিন চিঠি দাদী এভাবে রেখে দিয়েছে বলে অবাক হয়
আবার মজাও পায়। ভাবে দাদীর প্রেমপত্র নাকি।ঘুণাক্ষরেও বোঝেনি খামের ভেতর কী রহস্য লুকিয়ে আছে।

খামের ভেতর লেখা চিঠিটা ফাহিমার। অসুস্থ অবস্থায় কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা চিঠি। মৃত্যুর আগে শেষ অনুরোধ। নিষ্পাপ মেয়েকে যেন তার দাদার বাড়িতে গ্রহণ করা হয়। মা বাবাহীন এই পৃথিবীটা যেন পর জন্য সহজ হয়। সাথে একটা ছবি। বাবা মায়ের সাথে ছোট্ট একটা মেয়ে। স্টুডিওতে তোলা ছবি।

দাদীর পাশেই বসে অপেক্ষা করে মিন্নী। জোহরা বেগম উঠে নাতনির হাতে সেই চিঠি আর ছবি দেখে ভয় পেয়ে যান। ফজলে আলী খান যে পুত্র আর পুত্র বধূকে তাজ্য করেছিলেন, তাদের কন্যাকে কখনোই মেনে নিবেন না। জোহরা বেগম স্বামীর বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস রাখেন না। তাই নাতনিকে দত্তক দিয়ে দিয়েছেন। এই সত্যটা মিন্নী তখনই জেনেছিল। দাদী বলেছিলেন নাতনি কোথায় আছেন তিনি জানেন না। কিন্তু আজ যখন রহিম তরফদার আর শিউলি চৈতালীর আসল বাবা মা নয় জানতে পারে মিন্নী। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে কষ্ট হয় না। বাবার কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করে। বহু বছর ধরে যে মেয়েটার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আজ আরও একবার তাকে ঘর ছাড়া করা হোক চায় না মিন্নী। হাসান আলী খান কখনো পারিবারিক বিষয়ে কথা বলেন না। তবে ভাই বিয়োগের ব্যথা আর নিজ পরিবারেই অকিঞ্চিকর থাকার অনুভূতি তারও মনোজগৎ পরিবর্তন করে দিয়েছে। মনে হয়েছে এবার তার কথা বলাই উচিত। চিরকাল ফজলে আলী খানের অন্যায় সিদ্ধান্ত চলতে পারে না। মুখোমুখি হন নিজের মায়ের। নিশ্চিত হওয়ার পর মাকে নিয়েই সবার সামনে উপস্থিত হয়েছেন

“হাসান, তুমি কী বলছ উল্টোপাল্টা কথা। চৈতালী হোসেনের মেয়ে? এসব তুমি কী বলছ।”

“একদম সত্য বলছি। আর আজ মা নিজ মুখে সেই কাহিনি শোনাবেন।”

ওটি রেডি। যেকোনো মুহুর্তে সার্জারি শুরু হবে। লিভার ট্রান্সপ্লান্টের জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করা যায় না। কয়েকঘন্টা পর লিভার ডিজেনারেট হতে থাকে। তাই ডোনারের কাছ থেকে লিভারের অংশ নেওয়ার পাশাপাশিই চন্দ্রিমার শরীরে প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু হবে। চন্দ্রিমাকেও ওটিতে রেডি করা হচ্ছে। হঠাৎ হইচই। ডোনার পালিয়ে গিয়েছে। জালাল আবেদীন টাকা আগেই অর্ধেক পরিশোধ করেছিলেন। লোকটা একটা কাগজে লিখে গিয়েছে সে লিভার দিতে ভয় পায়। লিভার দিবে না। সে তার পাসপোর্ট নিয়ে চলে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে কাজ করে খেতে চায়।

চাইলেই পুলিশে খবর দিয়ে টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার দায়ে লোকটাকে খুঁজে আনা যায়। কিন্তু সে স্বেচ্ছায় লিভার না দিলে জোর করা যাবে না। কেননা কোনো কিছুর লিখিত সম্মতি এখনো লোকটি দেয়নি। স্বেচ্ছায় ডোনার হওয়ার কনসেন্ট কাগজেও সই দেয়নি। এমুহূর্তে চৈতালী ছাড়া নতুন ডোনার যোগাড় সম্ভব নয়।

অপারেশন সফল হয়েছে। চৈতালী আর চন্দ্রিমা দু’জনকেই নিবিড় পরিচর্যা কক্ষে রাখা হয়েছে। মাহিমের কাছে মিন্নীর ফোন আসে। বাড়িতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা জেনে হতবাক হয়ে যায় মাহিম। চৈতালী আর চন্দ্রিমা পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত ধারণা ছিল তার। জালাল আবেদীনের মিথ্যাও তাই সে ধরতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতালী যে তার নিজেরও কাজিন, ঘুণাক্ষরেও এমন সম্ভাবনা মাথায় আসেনি। জালাল আবেদীনের সাথে কথা বলার আর ইচ্ছে হয় না মাহিমের। যতই সন্তানের প্রতি আবেগ, ভালবাসার যুক্তি তারা দিন। মাহিম এই স্বার্থপর মনোভাব মাফ করতে পারে না। সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় চন্দ্রিমার পাশে সে থাকবে। চন্দ্রিমা রিকোভারি হওয়ার জন্য সবকিছু করবে। কিন্তু চৈতালীকে আর তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।
“বাপি, আপনারা শুরু থেকে সবটাই জানতেন। অথচ শুধু গোপন করে গেলেন। এর নাম যাই দেন। সত্যি বলতে এ শুধুই স্বার্থপরতা।”

চন্দ্রিমার জ্ঞান ফিরেছে। বডি ট্রান্সপ্লান্ট এখন পর্যন্ত রিজেক্ট করেনি। ডাক্তার আশাবাদী। সফল ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে। তিনমাস রিহ্যাবিলিটেশনে থাকতে হবে। তারপর আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে চন্দ্রিমা। চোখ মেলে বাবা মাকে দেখে মনে হয় যেন নতুন জীবন পেল মাহিমকে খোঁজে চন্দ্রিমা। জেরিন সুলতানা মাহিমকে ডেকে আনেন। মাহিমের চোখের নিচে কালি জমেছে। চিন্তায় কয়েক রাত ঘুমায়নি তা স্পষ্ট দেখা যায়। অপারেশন সাইটে ইনফেকশন হয়েছে চৈতালীর। পোস্ট অপারেটিভ ইনফেকশন থেকে সেপটিসেমিয়া হয়ে লাইফ সাপোর্টে চলে গিয়েছে চৈতালী। রক্তে ইনফেকশনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ না হলে হয়তো জ্ঞান ফিরবে না। মাহিম, চন্দ্রিমার দিকে তাকিয়ে হাসে। ঠোঁটে হাসি, চোখে মৃত্যুসম আঁধার। চন্দ্রিমার মনে হয়, কখনো কখনো সব ঠিক হয়েও ঠিক হয় না। হতে পারে না। সুখ যেমন সত্যি, দুঃখ ও তেমন সত্যি।

হেরে যাওয়ার আগে মানুষ আরেকবার উঠে লড়াই করে। নীড় হারা পাখি ঝড়ে আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু যখন জীবনের সমস্ত আয়োজন বৃথা হয় তখন অনুভূতি, যত্ন, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি কোনো কিছুই যথেষ্ট হয় না। সব নিস্তেজ হয়ে থাক। রাত গভীর থেকে আরও নিকষ কালো হয়। জিতে গিয়েও মানুষ হেরে যায়। সিরোসিসের সাথে লড়াই করে জিতলেও, মাহিমকে হেরে গিয়েছে চন্দ্রিমা।

চৈতালীর জ্ঞান ফিরেছে। ইনটুবেট করা হয়েছিল বলে গলায় ব্যথা আছে। গতকাল কথা বলতে পারছিল না। বারবার গরম পানি খেতে দিয়েছে। স্যুপ খেয়েছে, রঙ চা খেয়েছে। এখন গলার ব্যথা কম।
“কেমন লাগছে?”

“ভালো। আপা কেমন আছে?”

“ভালো। তোমার আমার জন্য একটা চিঠি দিয়েছে চন্দ্রিমা। পড়বে?”

“চিঠি কেন? আপা কই?”

“পড়লেই বুঝবে।”

“আচ্ছা, আমার কতদিন জ্ঞান ছিল না?”

“তেরো দিন।”

মাহিম চিঠিটা মেলে দেয়।

“চৈতালী, না ফারিসা বলব। আমার প্রিয় মানুষটাকে তোমার হাতে দিয়ে যাচ্ছি। ভয় নেই মারা যাচ্ছি না। এখনো আয়ু কিছু বাকি আছে। যদিও এর কৃতিত্ব বা বদান্যতাও তোমার। অবশ্য এর বিনিময়ে আমার প্রাণের মানুষটাকেই তোমাকে দিয়ে গেলাম। প্রাণের বদলে প্রাণ। কী বলো? আমার জীবনের বিনিময়ে আমার প্রাণবায়ু থাকা তোতাটাই এখন তোমার। একবারে দিয়ে যাচ্ছি তা নয়। সুস্থ হয়ে আসি। তুমিও সুস্থ হও। আবার আমাদের দেখা হবে। তোমার আমার আমাদের দু’জনেরই কতগুলো প্রশ্ন করা বাকি, উত্তর জানা বাকি।

ইতি,
চন্দ্রিমা।”

“আপা কোথায় গেলেন?”

“বাপি ওকে নিয়ে কিছুদিন আলাদা করে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে থাকবেন। তুমি সুস্থ হলে তোমাকে নিয়ে দেশে যাব। আমার স্ত্রী হিসেবে তো তুমি আগেই খান বাড়িতে প্রবেশ করেছিলে। এবার খান বাড়ির নাতনি হিসেবে করবে।”

- Advertisement -

Read More

Recent