শুক্রবার - মে ২৪ - ২০২৪

আব্দুর রাজ্জাক : আরেকজন অভিভাবকের বিদায়

বিয়ানীবাজার বা এতদ-অঞ্চলের মানুষের কাছে রজাক মিয়া হিসেবে এক নামে তিনি খ্যাত ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকার বিখ্যাত সেন্ট্রাল ট্র‍্যাভেলসের মালিক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠার নেতা আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাককে কে না চিনতেন? আমার আব্বার সঙ্গে রজাক চাচা ও তাঁর বড় ভাইয়ের ভাতৃত্বসূলভ আন্তরিক হৃদ্যতা ছিল। আমি তাঁকে চাচা ডাকতাম। আবার তাঁর ভাতিজা খসরুর বন্ধু হিসেবেও ভাতিজার স্নেহ পেয়েছিলাম। খসরুর সঙ্গে ধানমন্ডির বাসায় যখনই গিয়েছি, চাচার স্বাগতিক স্নেহ নিজেকে তাদের পরিবারেরই একজন মনে করেছি। ছোট ভাইবোনগুলো আমাকেও খসরু ভাইয়ার বন্ধু হিসেবে মূল্যায়ন করেছে৷ মনে আছে বহুবছর আগে খসরুর সঙ্গে আমি চাচার শ্বশুর বাড়ি দক্ষিণ বাগেও একবার গিয়েছিলাম। চাচি তখন বাপের বাড়িতে নাইওর গিয়েছিলেন। রাসেল তার খসরু ভাইয়া ও আমাকে দেখে খুবই খুশি হয়েছিল মনে আছে।

- Advertisement -

নব্বুইয়ের দশকের প্রথম কোন এক বছর আব্বা একই কাজে ঢাকা গেলে রজাক চাচার সঙ্গে দেখা করেছিলেন মতিঝিলে ট্র‍্যাভেলসের অফিসে। তাঁরা দুই ভাই অনেক গল্প করেছিলেন। ফিরে আসার সময় রজাক চাচা নিজে থেকেই আব্বাকে বলেছিলেন – আপনার ছেলে তো আমারই ভাতিজা৷ কোন চিন্তা করবেন না৷

রজাক চাচা কত মানুষকে যে কত রকমের নিশ্চয়তা দিয়েছেন, নির্ভরতা দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। টাকা আমানত রাখতে চান? রজাক মিয়া। বিশাল অর্থের জিম্মাদার চান? রজাক মিয়া। ঢাকায় বিপদে পড়েছেন। সাহায্য দরকার? রজাক মিয়া। বিদেশে যাবেন, প্লেনের টিকেটের টাকা নেই? রজাক মিয়া। বিপদে পড়েছেন। উপায় চান, সৎ পরামর্শ বা সঠিক সমাধানের পথ চান? রজাক মিয়া। এহেন রজাক চাচা, তথা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আব্দুর রাজ্জাক, রজাক মিয়া নামে এক আইকনিক ফিগারে পরিণত হয়েছিলেন।

এই পৃথিবীতে যার সঙ্গে কথা বলতে আমি উদগ্রীব হয়ে থাকতাম, সেই আম্মার অসময়ে অর্থাৎ এদেশের গভীর রাতে ফোন আসলেই আমি আঁতকে ওঠতাম। না জানি কোন দুঃসংবাদ দেওয়ার জন্য আম্মা ফোন করেছেন! ফোন ধরেই আমি বলতাম -‘ আম্মা, কি হয়েছে, তাড়াতাড়ি বলো!’ আম্মা ধীরে সুস্থে কোমল কণ্ঠে, মৃদু হেসে হেসে মায়ায় ভরা ভাষায় বলতেন -‘ না বেডা, আৎকা শরিলডার মাঝে বুঝলাম, কে বুঝি একটা ঝাঁকি দিল! মনে হইলো আমার দিলওয়ারের কোন বিপদ অইলো নি! এর লাগি তোমারে ফোন দিলাম। ও বাবা, তুমি বালা আছো নি! আম্মার লাগি চিন্তা করো নি? চিন্তা কইরো না, আমি খুব বালা আছি বেডা!’

ঐ যে অসময়ে! মায়ের কাছে সন্তানের খবর নেওয়া অসময় হবে কেন? আর তাছাড়া, এই গভীর রাতে তো বাংলাদেশে মধ্যদিন! আসলে বিষয়টা সময় নয়৷ বিষয়টা ভয়৷ আশংকার ভয়। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে দেশে থাকা পরিবারের মানুষ মা-বাবা, ভাইবোন বা আত্মীয়স্বজনদের জন্য সারাক্ষণই একটি আশংকার ভয় তাড়া করে ফেরে। বিগত অনেক বছর রজাক চাচার শারিরীক অবস্থা সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে কেউ ফেইসবুকে কোন কিছু লিখলে, লেখাটি পড়ার আগে ছবি দেখেই আমার আশংকা হতো। ভয় লাগতো। পরে লেখাটি পড়ে স্বস্তি পেতাম। কিন্তু, ‘এখনো বেঁচে আছেন’ জেনে একটা সময় স্বস্তি পেলেও, জগতের তো অমোঘ একটা নিয়ম আছে৷ প্রত্যেকেরই চলে যেতেই হবে। রজাক চাচাও, তাঁকে নিয়ে আমার সব আশংকার অবসান ঘটিয়ে মৃত্যুর কাছে হার মেনে অনন্ত যাত্রায় রওয়ানা দিলেন। ইন্নাল ইল্লা হি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন। মহান রাব্বুল আলামিন রজাক চাচাকে তাঁর প্রিয় মেহমান করে সম্মানের স্থানে স্বাগত জানাবেন, এই প্রার্থনা করি।

রজাক চাচার সঙ্গে সর্বশেষ আমার দেখা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। আমাদের প্রিয় বন্ধু সালেহ আহমদ মনিয়ার বিয়ের বরযাত্রায়। মনিয়াকে নওশা সাজিয়ে আমরা কয়েকজন বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হয়েই দেখি রজাক চাচা দাঁড়িয়ে আছেন অন্যান্য আরো অনেকের সঙ্গে। অনেক বছর পরে দেখা হলেও চাচা আমাকে চিনতে পেরেছেন। দূর থেকে হাসি দিয়ে আমাকে স্বাগত জানালেন। আমি কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম করেছি৷ তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে আমার কুশল জিগ্যেস করেছেন৷ আমার আব্বাকে উদ্দেশ্য করে চাচার একটি কথা এখনো আমার কানে বাজে- ‘মনো করিয়া ভাইছাবরে আমার সালাম কইও।’

এরকম পরস্পর সম্মান ও মায়া কি এই পৃথিবীতে আর আছে! একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমার বিদায়ী অভিবাদন ও শ্রদ্ধা।

- Advertisement -

Read More

Recent