শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

প্রিয়তমা

প্রিয়তমা

শীতের মধ্যদুপুরের রোদটা একেবারে মাথার উপর এসে বসে থাকে। ত্বক চড়চড় করে ওঠে। সকালে কোনো রকমে খেয়েই স্কুলে দৌড়াতে হয়, খিদেয় চোখে অন্ধকার দেখি এইসময়।

কিন্তু মায়ের রান্না হয়নি এখনো।

- Advertisement -

গোসল করে মাথায় গামছা পেঁচাতে পেঁচাতে আমি মিশুদের বাড়িতে গেলাম।

— ও মিশু, কী করিস এইভাবে?

আমি জানি ও এখানে স্নেহর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। বড়ো রাস্তা ঘুরে নামাজ পড়ে এইদিক দিয়েই আসবে স্নেহ। তবুও পেছন থেকে ডেকে প্রশ্ন করলাম৷

আমার জানা উত্তরটাকে ভুল করে বলল ও,

— শীত শীত লাগে রে! একটু রোদ পোহাচ্ছি।

— তাহলে রোদে গিয়ে বস? এইখানে তো ছায়া পড়ে গেছে৷

মিশু মাথা নাড়ে,

— না। নানি বলে রোদে গেলে কালো হয়ে যাব। সোনার অঙ্গ কালি হবে!

— একটু সানট্যান হলে সমস্যা কী?

— তোর সমস্যা নেই। কিন্তু আমার সমস্যা আছে। আমি তোর মতো পড়ায় ভালো না। গায়ের রঙ ছাড়া আমাদের বিয়ের আর কোনো যোগ্যতা নেই রে। আমাদের বাপ-চাচারা টাকা যতই বানাক, জাতে আমরা হাজাম। তোরা মুসলমানেরা, মুসলমান হতে আমাদেরকেই লাগে কিন্তু তোদের সমাজে আমরা নিচু জাত!

আমি চুপ করে থাকলাম। মিশু প্রায়ই এই কথাটা বলে। একই জায়গায় থেকেও গ্রামের অন্যদের সবার সাথে ওদের ওঠাবসা, খাওয়া, চলাচল নেই। বিয়েশাদিও ওদের নিজেদের ভেতরেই হয়। মিশুর দাদা, নানারা ছিলেন হাজাম। বাঁশের চিকন চটা দিয়ে মুসলমান বালকদের খৎনা করিয়ে খাঁটি মুসলমান করতেন তারা। মিশুর বাবা চাচারা কেউ এই পেশায় আসেননি। শাড়ির ব্যবসা করেন তারা। শাড়ির ব্যবসা করে কোটিপতি হয়ে গেছেন। ভাড়ায় গাড়ি ব্যবসাও আছে এদের। গুলতা গ্রামে সবচেয়ে বড়ো বাড়ি এখন হাজামদের। নিজেরা মসজিদ দিয়েছেন। তাও ওদের গায়ে হাজাম শব্দটা লেগে আছে। ওদের মসজিদেও মুসলমানেরা আসে না।

মিশু আমার খুব ভালো বন্ধু। আমি প্রায়ই আসি মিশুদের বাড়ি। মিশুও যায়।

কিন্তু আমার দাদিও বলেন,

— ও পলিন, ওরা আতরাফ! ওদের সাথে আমাদের মেলে না! এত মিলামিশা কোরো না!

স্নেহকে নিয়ে মিশু যে স্বপ্ন দেখে তা যে বড্ড বেহায়া ও জানে সেটা তবুও নিজেকে আটকাতে পারে না। বড়ো বড়ো দুটো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে স্নেহর চলার পথে!

বাস্তুভিটায় নাকি তেঁতুল গাছ লাগাতে নেই। মিশুদের বাড়িতে একেবারে সদরে বিরাট তেঁতুলগাছ। পুকুরটার পাড় ঘেঁষে। আগে গ্রামের মূল বাসিন্দাদের সাথে একেবারেই যাওয়া আসা ছিল না হাজামদের। তাই নিজেদের জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য কারো কাছে যাওয়া যেত না। পুকুর কীংবা ফলের গাছ নিজেদেরই ব্যবস্থা রাখতে হতো। তাই সব বনজ,ফলজ আর ঔষধি গাছ আছে অবস্থাপন্ন হাজামদের বসতভিটার চারিপাশ জুড়ে।

আসতে যেতে পথচারিদের জিভে জল এনে পাতায় পাতায় ঝুলছে কাঁচা তেঁতুল ফল৷ মিশু বাঁশের লম্বা একটা কোটা বড়ো একটা ডালে লাগিয়ে ঝাঁকা দিতেই টপাটপ পড়ল কয়েকটা। সেগুলো কুড়িয়ে ব্যাগে ঢুকালো ও। আমার কোচর ভরে দিতে দিতে বলল,
— ধনেপাতা দিয়ে ভর্তা করিস। মজা লাগবে। স্নেহকেও দিস।

*****
পড়ার টেবিলে মাথা ঢুকিয়ে বসেছিলাম সারা দুপুর। নইলে মা খ্যাঁকম্যাক করে। আজকে সামাজিক বিজ্ঞানের বহুনির্বাচনি প্রশ্নের উত্তর রিভিশন দিয়ে ফেলব। রওনক আর স্নেহর সাথে কম্পিটিশন আছে আমার। ওদের চাইতে ভালো করতে হবে রেজাল্ট। স্নেহও সিরিয়াসটাইপ ছাত্র। এতে ভালোই হয় আমার। দুজনে যতক্ষণ একসাথে থাকি পড়াশোনা নিয়েই কথা হয় বেশি। একজন আরেকজনকে সাহায্য করলে নিজেদের পড়াটাও ঝালাই হয়ে যায়। আমাদের মাঝে কম্পিটিশন আছে, হিংসা নেই।
আসরের আযানের পরপরই আমার মোটা নোটখাতাটা দড়াম দিয়ে ফেললাম স্নেহর নাক বরাবর,
— সিনেময়, আমাকে চৌদ্দর দুই অধ্যায়টা দেখায়ে দে। স্যার আসবে একটু পরে। আমার শেষ হয় নাই। পরিমিতি ভালো লাগে না!

— এহ! তুই প্রিটেস্টে হায়ার ম্যাথের রিটেনে সাতষট্টি পাইছিলি না? সব নাটকবাজ!

— আমার না অনেক বেশি প্রাকটিস লাগে। তোর মতো এত ভালো ব্রেইন নেই কী না।

— তাও তো তুই দিনরাত পড়িস। আমার আজকাল পড়তে ভালো লাগে না রে, পলিন!

— মাইর খাবি? ওই ননকের বাচ্চা যদি তোর চাইতে বেশি নম্বর পায় তো তোকে এই তেঁতুলের মতো কাঁচা খেয়ে ফেলব আমি।

— তেঁতুল কই পাইলি?

— মিশু দিছে।

— খাব না তাহলে।

— কেন? কী করছে ও?

— অনেক বাড়াবাড়ি করে রে। জানালাটা খোল৷ দেখবি ও দাঁড়িয়ে আছে। ছোটোকাকি হাসাহাসি করে।

— ছোটোকাকির হাসিতে কী সমস্যা? সে তো সারাক্ষণই হাসে!

— সমস্যা আছে।

স্নেহ বইটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসে। খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে ও এখন।

আমি থামালাম ওকে,

— আচ্ছা দাঁড়া, তমাকে ডাকি, ও আসুক।

বাইরের দিকে মুখ নিয়ে জোরে ডাকলাম,

— এই তমা? আমি সিনেময়ের ঘরে। মিশু তেঁতুলভর্তা দিয়ে গেছে। খাইলে আয় তাড়াতাড়ি।

এটা সংকেত ছিল। বাড়ির বড়োরা কেউ যেন আমাদের আলোচনার গুরুত্ব টের না পায় সেইজন্য সতর্কতা।

স্নেহর দিকে তাকিয়ে বললাম,

— শোন, তেঁতুল খাইতে পারিস। কাঁচামরিচের ঝাল আর ধনেপাতাও দেওয়া। ধনেপাতা কে বাটছে এটা জানা জরুরি না, কার রিজিকে লেখা আছে সেটা ইম্পরট্যান্ট। বুঝছিস? খা।

স্নেহর মুখে খানিকটা ভর্তা ঠেলে দিলাম। ও হাত চেটে খেয়ে আবার হাত পাতল। বলল,

— মজা হইছে, দে আরেকটু।

স্নেহর হাতের উপর সবুজ রঙের লোভনীয় চাটনি ছুঁইয়ে দিয়ে বললাম,

— নে, ওই যে আসছে তমা। এইবার জরুরি আলোচনা শুরু কর?

— ওই, তোরা একারা একারা খাস? মিশু কিন্তু আমার জন্য দিয়েছে বেশি করে।

তমা লাফ দিয়ে পড়ল সামনে।

আমি মুখ খিঁচিয়ে বললাম,

— দেখ সিনেময়, ডেকে ডেকে আনলাম, এখন লোল পড়ে যাচ্ছে মহারানির। বেশি দিয়েছে! ঘোড়ার ডিম দিয়েছে! যা, ভাগ শয়তানি!

স্নেহ থামাল আমাদেরকে,

— আহ, দুইজনে এমন লাগলে হবে না। চুপ করে বস। আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।

— বল, কী কাজ?

আঙুল চাটে তমা।

— কালকে মা খালাবাড়ি যাবে। আমাকে বলেছে তাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে।

— হুম! যাবি। আমরা কী করব? তোর সাথে যাব?

তমা আঙুলে কামড় দিয়ে বলল।

— হ্যাঁ যাবি!

একটু চেপে চেপে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলে স্নেহ। রেগে গিয়ে বলল,

— কথা তো শেষ করতে দিবি? সব কথার মাঝে তোকে বাঁহাত ঠেলতেই হবে?

— আচ্ছা বললাম না। তো গেলাম তোর সাথে। কিন্তু তুই কি যেতে পারবি? তোর তো আঠারো মাসে বছর। দেখা গেল সকালের বদলে বাবু দুপুরে ঘুম থেকে উঠল!

তমার কথায় ফিক করে হেসে ফেললাম। ওকে বাহবা দিতে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে একটা কামড় দিলাম। তমা ব্যথা পেয়ে চিৎকার করল,

— এই তোর সমস্যা কী? সারাদিন দাঁত কুটকুট করে? কামড়াস কেন বদ ছেমড়ি?

— এই থাম তোরা। আমার কথা শোন।

আমাদের অকারণ ঝগড়া শুরু হওয়ার আগেই স্নেহ আমাদেরকে থামিয়ে দিলো।

— আচ্ছা বল?

মনোযোগী শ্রোতা হয়ে কান পাতলাম আমি আর তমা দুজনেই।

— দেখ, আমি একজনকে পছন্দ করি। মানে…

আমতা আমতা করে স্নেহ।

তমা ফিক করে হেসে ফেলল,

— শেষ কর ভাই, তোর ম্যা ম্যা, ইয়ে, আচ্ছা শেষ কর তাড়াতাড়ি। আমার কাজ আছে। কাপড় তুলতে হবে। সন্ধ্যার আগে ঘর ঝাড়ু দিতে হবে। মুরগির ঘরে দরজা দেবো। শিশিরে কাঠ ভিজে যাবে, তার আগেই মাচায় তুলতে হবে৷ ওদিকে শাদাব ভাই আসবে রাতে। তার জন্য রান্না হবে। বড়োভাবি বলেছে একটু কুটনো-বাটনা করে দিতে। ওদেরকে চা-টাও আমাকেই দিতে হবে। তোর বছরটা একটু তাড়াতাড়ি আন, ভাই?

আমার মায়া লাগে তমার জন্য। ওর বাবা মরার পরে মায়ের হাত ধরে মামাবাড়িতে এসে উঠেছে। সবার ফাইফরমাশ খেটে ওর দিন যায়৷ আমার আর স্নেহের মতো ঠিকঠাক পড়াশোনা করে উঠতে পারে না। অনেকদিন তো বই সামনে নিয়ে বসার সময়ও পায় না ও। একটা কোনো প্রাইভেট পড়তে হবে না বলে আর্টস নিয়ে পড়ছে। কিন্তু অঙ্ক, ইংরেজি তো প্রাইভেট পড়াই লাগে সবার। কী আর্টস, কী সায়েন্স! মেজফুফু ওকে সেটাও দিতে পারে না। বড়ো চাচা মাস্টার ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বড়োমার মুখ-ঝামটা খেতে হচ্ছিল বলে তমা নিজেই পড়া বন্ধ করে দিয়েছে৷ ও বলে, “আমার পড়ার দরকার নেই। আমি সুন্দরী, আমার বিয়ে হয়ে যাবে! তোরা কালাকুলা, তোরা পড়। তোদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়া লাগবে!”

ওর বিদ্রুপেও একটা দু:খ দু:খ সুর টের পাই আমি!

কাশিটাশি গোটাকয়েক দেয় স্নেহ, হাসে। লজ্জায় লাল হয় ওর ফরসা মুখ।
— ওই বলবি তুই?

তমা হাত মুঠো করে কিল দেখায়।

স্নেহ ফট করে বলে ফেলে,

— আমি রুমকিকে পছন্দ করি।

— কোন রুমকি? ও গড, তোর খালার মেয়ে রুমকি?

আমি মাথা ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলাম।

— খাইছে রে। মেয়ে পাসনাই তুই দুনিয়ায়?

তমাও চোখ পাকায়।

দুইবোনের কথাতেই হতাশা দেখে স্নেহ মিইয়ে গেল, মিনমিন করে বলল,

— পাই নাই তো! কী করব? এখন তোরা একটা ব্যবস্থা কর?

আমার কেন যেন এই আলোচনা একটুও ভালো লাগল না!”

#প্রিয়তমা – ৬

শাদাব, তুশমিকে সাথে নিয়ে মিষ্টি কিনতে গিয়েছিল। ফিরে এলো খুব তাড়াতাড়িই। পলিনের ডায়েরিটা চট লুকিয়ে ফেলল নওমিকা।

তুশমি একটা আইসক্রিমের কোণ নওমিকার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

— তোমার ফেভারিট চকলেট আইসক্রিম। পাপা ভ্যানিলা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তুমি ভ্যানিলা খাও না। স্ট্রবেরিও খাও না। তাই না মামমা? পাপা কিছু জানে না। আমি ভ্যানিলা খাই, চকলেটও খাই। তুমি খুব চুজি। তুশমি সব খায়। তুশমি ইজ আ গুড গার্ল। তাই না পাপা?

শাদাব মেয়েকে পাশে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিলো। ওই সিটটা তুশমির। নওমিকার জায়গা পেছনে।

নওমিকা বলল,

— এটাও তুমি খাও তুশমি। মামমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

— অল্প একটু খাও? মাম্মা একটু খাবে, পাপা একটু খাবে, তুশমি অল্প খাবে। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং! খাও মাম্মা, প্লিজ! পাপা আগে তুমি।

তুশমি শাদাবের দিকে আইসক্রিম কোণটা বাড়িয়ে দিলো। ও অল্প করে কামড় বসালো। ও আইসক্রিম পছন্দ করে না। তুশমি দিলো বলে খেলো। তুশমির কোনো কিছুতে ‘না’ কথাটা শাদাবের মুখ থেকে বের হয় না। আত্মজার জন্য সব করতে পারে ও।
তখন চেইন স্মোকার ছিল ও। দিনে দুই প্যাকেট বেনসন লাগত। ফিল্টারের তাপে ঠোঁট পুড়ে কালচে হয়ে উঠেছিল। ওর পৃথিবী ছিল ধোঁয়াময়। তামাকপোড়া গন্ধের রাজ্যে ওর একান্ত আবাস ছিল।

নওমিকার বিয়ের পরের বছরেই চিকেন পক্স হলো শাদাবের। সাত দিন একদম বিছানা ধরা হয়ে পড়ে রইল। দিন নেই রাত নেই সেবা করল নওমিকা। পনেরো দিন পরে সুস্থ হল শাদাব। ডাবের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে, নিম-হলুদ জ্বাল করা পানি দিয়ে গোসল করেছিল। ঝরঝরে হয়েই বিপ্লবকে ফোন করেছিল,

— গাল মিষ্টি হয়ে আছে৷ দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আয়!

নওমিকা একটু রোষের সাথে বলেছিল,

— ওসব আজেবাজে জিনিস বাদ দেওয়া যায় না? পনেরো দিন যখন পেরেছ, সিগারেট দরকার হয়নি, এখন চাইলে ঠিক নেশাটা ছেড়ে যাবে।

শাদাব ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে ছিল স্ত্রীর দিকে। চোখে রাগ আর ভর্ৎসনা! মুখে কোনো শব্দ না করলেও সেই ভয়ংকর দৃষ্টির সামনে নওমিকার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। ও আর কোনোদিন সিগারেট খাওয়া না খাওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেনি।
ক্রনিক কাশিতে ভুগলেও শাদাবকে কখনো ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার কথা কেউ সাহস করে মুখে আনতে পারেনি।

শাদাবের বাবা-মায়ের সাথে সব ঝামেলা চুকেবুকে গেছে তখন৷ তুশমি এসেছে কোলভরে।

সপ্তাহের এ মাথায় আর ও মাথায় দাদা-দাদি তাদের নাতনিকে দেখতে আসেন। নিজেদের বাড়িতেই পুত্র-পুত্রবধূ, নাতনিকে নিয়ে যেতে অনেক অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শাদাবের জেদের কারণে হয়নি। ও আর বাড়িতে ফিরবে না।
তখন তুশমির বয়স তিন মাস৷ শাদাব অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে আদর করেছে। বুকের ভেতর মিশিয়ে রেখেছে ছোট্ট তুশমিকে। গালে গাল লাগিয়ে গভীরে স্পর্শ নিয়েছে। তারপর ছোট্টো দুটো ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে আদর করে দিতেই, তুশমি খুক খুক করে দুটো কাশি দিলো। শাদাবের মা চিৎকার করে উঠলেন,

— তোর হইছে যক্ষা। মেয়েরেও দিবি এই অসুখ? তাই তো। যক্ষ্মারোগীর মেয়ে তো যক্ষ্মা হয়েই মরবে।

শাদাব আবারও সেই ভস্ম দৃষ্টিতে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ! মেয়েকে কোলে নেয়নি সারা রাতে। তারপর থেকে কখনো সিগারেটের শলা ওর হাতে দেখা যায়নি!

শাদাব হঠাৎ জানতে চাইল,

— শরীর খারাপ করছে তোমার? বমি আসছে? গাড়ি থামাব?

নওমিক চমকে উঠল। মাথা নেড়ে বলল,

— শরীর খারাপ করবে কেন?

— লুকোচুপির কিছু নেই। কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদতে পারো। মন খারাপ থাকলে মন খারাপ করো। জোর করে হাসিখুশি হবার দরকার নেই। এতদিন পরে বাড়ি যাচ্ছ। এক্সাইটমেন্ট আমি বুঝি। নয় বছরের জমানো আবেগ ফেনিয়ে উঠছে সেটাও বুঝতে পারছি। তাই বলছি, অভিমান বুকে চেপে রেখো না!

নওমিকার চোখ ছলছল করে উঠল এবারে সত্যিই। শাদাব কেন এতটা উদ্বেগ দেখাবে? কেন ভাববে নওমিকার কথা? এই একটুখানি মায়াতে যদি আবার বাঁধা পড়ে যায় ও? হুহু করে বেশ খানিকটা কেঁদে ফেলল ও।

নদীর নামটা সুন্দর। ঝপঝপিয়া নদী। নদীর পানি কাচের মতো স্বচ্ছ। ছোটো ছোটো ঢেউ তাতে। সেই ঢেউয়ের মাথায় নতুন রোদের আলো নাচছে। মিঠেকড়া রোদ। এই রোদে গুলতা গ্রামের ঘ্রাণ মিশে আছে। এই হাওয়া নওমিকার খুব চেনা।

নদীটাকে ডানে রেখে হাইওয়ে ধরে দুরন্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে গাড়িটা। যত এগোচ্ছে নওমিকার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে৷ আজন্ম চেনা সড়কপথ আজকে অচেনা ঠেকছে৷ আকাশভাঙা রোদ্দুরও যেন উৎসুক হয়ে নেমে এসেছে।

অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে আসতে আসতে তারা ম্লান হয়ে আছে খানিকটা।

— ওই যে মজুমদারের ভাটা! লাল লাল ইট পোড়ে এখানে! ওই যে, ওই যে তুশমি দেখো, আমার স্কুল!

নওমিকা হর্ষধ্বনি করল।

দমপাড়া স্কুল পার হলো গাড়িটা।

নওমিকা যেন তুশমির চাইতেও ছোটো শিশু। কৌতুহলে গাড়ির কাচ নামিয়ে জানালা দিয়ে মুখটা গলিয়ে দিয়েছে ও।

— দমপাড়া বাজার। প্রতি বুধবারে হাট বসে। বিরাট হাট। এখানে জামা, জুতো কিনতে আসতাম আমরা। ওই যে নবাব কাকার মালাইয়ের দোকান। কাকা বুড়ো হয়ে গেছে। পেছনেই ঝগড়ু দাদার বেগুনি, পেঁয়াজুর ভ্যান বসত। এখানে একটা দোকানে আখের শরবত করে, জানো শাদাব?

বলতে বলতে চুপ করে গেল নওমিকা। শাদাবের সাথেই একবার এখানে আখের রস খেতে এসেছিল ও। ও শুধু না, ওরা। স্নেহ, পলিন, চিত্রা, অমিয় আর তমালিকাও।

একটা দীর্ঘশ্বাসকে বুকের ভেতরেই চেপে নিলো নওমিকা। বিষন্ন হয়ে গেল।

খুব লজ্জা পেতে লাগল। বড়ো ভাবিও সাথে ছিল সেদিন। দমপাড়া মাঠে সেদিন মেলা বসেছিল। বৈশাখের মেলা। সব ভাই বোন মিলে শাদাবকে ধরেছিল মেলায় নিতে হবে। শাদাব বড়ো ভাইয়ার বন্ধু৷ সুন্দর দেখতে। হেসে হেসে কথা বলত। চকচকে বাইক নিয়ে আসত। খুব টাকা খরচ করত। ওরা বায়না করতেই শাদাব রাজি হয়ে গেল। অমিয় ভ্যানগাড়ি ডেকে আনলো। তিন চাকার গাড়ি। চারজনে বসা যায়। বড়োভাবি, পলিন, চিত্রা আর অমিয় উঠল। সবার পছন্দের জায়গা আছে ভ্যানে। কেউ সামনের সিটে বসবে, কেউ পেছনে পা দোলাতে দোলাতে যাবে। নওমিকা সুযোগ পায়নি জায়গা নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে, দাঁড়িয়ে ছিল। তমালিকাও। ভ্যান বাহনটা বিশেষ পছন্দ নয় ওর।

স্নেহ বলেছিল,

— অমিয় ভাইয়ার কোনো হিসেব কিতেব নেই। একটা ভ্যান কেন এনেছ? আরও একটা লাগবে।

— তুই গিয়ে আনলি না কেন? সব ভ্যান রিজার্ভে যাচ্ছে। স্টান্ডে ভ্যান কি তোর বাবা নিয়ে বসে আছে?

সপাৎ করে চড় পড়েছিল অমিয়র গালে৷ বড়ো ভাবি মেরেছল চড়টা,

— বাপ তুলে কথা বলে! ওর বাবা তোর কী হয়?

অমিয়র চাচা হয় স্নেহর বাবা। চাচতো ভাইবোন সবাই। শুধু তমালিকা ওদের ফুপাতো বোন।

এই কাজিনদের মধ্যে হাতাহাতি, গালাগাল, ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। এখন গালাগাল খেয়ে পরের বেলাতেই গলাগলি। সকালের অপমান, অভিমান বেলা গড়ালেই পড়ে যেত!

শাদাব বলেছিল,

— এখন আর মারামারি করে কী লাভ? স্নেহ, ভেতরে টুপ করে গলে যাও? তমা আর নওমিকা আমার সাথে যেতে পারবে না?

চেপেচুপে স্নেহও ভ্যানের মাঝখানে পা তুলে বসে পড়েছিল। নওমিকার মনে হয়েছিল ওকে বাইকে বসাবে বলেই শাদাব ওই প্রস্তাব দিয়েছিল। শাদাবের গা ঘেঁষে বসে বসেই উড়ছিল ও। ভাসছিল!

সেদিনই কি শাদাবের জন্য মন কেমন হওয়াটা শুরু হয়েছিল?

যাকে মন-প্রাণ দেওয়া যায়, তার চোখে তাকিয়ে মনের ভাষা কেন পড়া যায় না?

নওমিকা পারেনি শাদাবের চোখের ভাষায় অন্যের নামটা পড়তে। স্নেহ কি পেরেছিল? পলিনের ডায়েরির শেষটুকুতে হঠাৎ খেয়াল হলো নওমিকার। পলিন কি মনে মনে স্নেহকে চাইত?

তখন ষোল হলে এখন ওদের পঁচিশ।

- Advertisement -

Read More

Recent