শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

মহারাজা তোমাকে সেলাম

মহারাজা তোমাকে সেলাম

সারা পৃথিবীতেই এরকম উচ্চতার মানুষ খুব বেশি নেই। ছিলও না। থাকে না, সব কালে। শুধুই কি শারীরিক উচ্চতায় এঁদের পরিমাপের বর্ণনা? না।

মানুষের পূর্ণতার প্রত্যাশা আর অনুভবের অত্যুচ্চ চূড়া এঁরা স্পর্শ করেছিলেন। সময়কে একজন নির্মাণ করেছেন। আবার সময়ই আরেকজনকে নির্মাণের প্রধান নিয়ামক করেছে। যতটুকু উচ্চতায় একজন মানুষ যেতে পারে তার অধিক তাঁরা কেউ কেউ স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু সকল উচ্চতার শীর্ষ মহামূল্য তাজটি বঙ্গবন্ধুর মাথায় স্থাপন করানোটাকেই ধন্য মনে করেছেন এইসব উচ্চ মানুষেরা। জগতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুর কাছে সেই তাজ নামক শ্রদ্ধা জানাতে, দুবাহু বাড়িয়ে আলিঙ্গন করতে। সত্যজিৎ রায়ও এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে।

- Advertisement -

আমাদের সেই উচ্চতার ভার সইবার ক্ষমতা নেই বলে তাঁকে ক্রমশ ছোট করেছি। তাতেও কাজ হয়না বলে তাঁকে ব্যবচ্ছেদ করেছি। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশের জন্মের জন্য তিনিই অনিবার্য ছিলেন। সময় তাঁকে আবার স্বমহিমায় মহিমান্বিত করেছে৷ তিনি ক্রমশই আরো উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত হবেন। কেননা, হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার যাদুমন্ত্রে বলিয়ান হয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের মানুষ ছড়িয়ে পড়েছেন। আলোকিত বিভায় তারা বিশ্বের অগ্রসর মানুষকে আগ্রহী করে তুলছেন৷ মানুষ জানতে পারছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কত ত্যাগের বিনিময়ে জন্ম ও এর ইতিহাস। শুধু আমরাই ভুলে যাই, আমার দেশের নাম বাংলাদেশ। আমি বাঙালি। এর সবকটির অস্তিত্ব মানেই বঙ্গবন্ধু।

মে মাসের দুই তারিখ সকালে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কাজটি ছিল তাঁর শ্রদ্ধ্যেয় মানিকদাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো। সত্যজিৎ রায়ও ভরাট গলায় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলতেন: ‘আজকে কিন্তু আরেকজনেরও জন্মদিন! শুভ জন্মদিন পুলক বাবু। আরেকখানি ভজহরির গান কবে পাবো?’। এই বলে ভরাট গলায় হাসতেন। বোম্বের বান্দ্রায় নিজবাড়িতে রন্ধনশিল্পী মান্না দে’কে রান্নায় মশগুল দেখে পুলক বাবুর লেখা : ‘আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না……’গানটি সত্যজিৎ রায় খুব বেশী পছন্দ করতেন।
বাঙ্গালির চিত্ত বৈশ্বিক আলোর কোমল-মোহন পেলবতায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়; আর সেখানে মধুর কথার গানে গানে তরঙ্গ তুলেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।

যে কোন ভাষা-জাতির জন্য সত্যজিৎ রায় এবং পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব এক অহংকারের বিষয়। তাঁদের কাজ যে কোন জাতির ঐতিহ্য সিহেবে পরিগণিত হতে বাধ্য। মানবিক শিল্পসুষমার কোন কাজকে মান্যগণ্য করে, যে কোন ভাষার এরকম মানুষ সত্যজিৎ রায়-পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গর্ব করবেই। আমিও তাঁদেরকে নিয়ে গর্ব করি। একটু বেশী করি যেহেতু আমিও তাঁদের মতো বাঙ্গালি। আরেকটু বেশী করি যেহেতু বাঙ্গালিয়ানা নিয়ে আমার গর্বের সীমা নাই। আজকের দিনে বাংলা গানের কবিতার অবিস্মরণীয় কবি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পুলক বাবুর জন্মদিনে অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

১৯৮৭ সাল। ফরাসি ভাষার দেশ ফ্রান্স সত্যজিৎ রায়কে তাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান দেওয়ার কথা ঘোষণা করলো। সাধারণত সম্মানিতকে প্যারিসে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গিয়ে এই সম্মান তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের শরীর খারাপ। তার উপর ফরাসি দেশের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ। শিল্প সাহিত্যের ভীষণ অনুরাগী। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টির অনুরাগী ভক্ত। তিনি নিজেই ছুটে এলেন কলকাতায় সত্যজিৎ রায়ের শহরে তাঁর হাতে সম্মান তুলে দিতে। সারা পৃথিবীতে এরকম বিরল ঘটনা পূর্বে তো ঘটেই নি, পরেও ঘটেনি।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে রায়কে শুধুমাত্র একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেই জানে।

কিন্তু আমার কাছে সত্যজিৎ রায় শুধুমাত্র একজন চলচ্চিত্রকারের অধিক। তবে, এ কথা মানতেই হবে রায়ের সব সৃষ্টিস্রোতের উৎসমুখ যেমন চলচ্চিত্র, তেমনি এদের মোহনা বা গন্তব্যও অবশ্যই চলচ্চিত্র।

বাঙালি হিসেবেই শুধু নয়, বরং সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টিশীল পৃথিবীর সমকালীন একজন মানুষ আমি; এটাই আমার নিজের কাছে অনেক আনন্দের ও গৌরবের ভাবনা। ‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘গণশত্রু’ ‘আগন্তুক’ বা ‘শাখাপ্রশাখা’ পর্যন্ত তার যে বিস্তার, আমি সেখানে গভীর আগ্রহে বারংবার অবগাহন করতে পারি। শিল্পের সম্পূর্ণতায় গ্রহিতার যে বেদনামধুর প্রশান্তি, মানিক বাবুর কাজের প্রতি আমার সেই প্রত্যাশার নির্ভরতা তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের সঙ্গীতে শ্রোতা হিসেবে আমাদের প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেরকম হয়; ঠিক তেমনটি।

যে কোন গ্রন্থে বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা প্রচ্ছদে কিংবা অনন্যসাধারণ মানুষদের আঁকা স্কেচেও সম্পূর্ণতার একটি রূপ ফুটে ওঠে অবলীলায়। তাতে কোথাও একটি প্রয়োজনীয় যতি চিহ্নের মতো যেমন কমতি নেই, আবার কোথাও একটি আঁচড়ে অতিক্ষুদ্র বিন্দুবৎ বাহুল্যও নেই। এ এক বিরল ধ্যানমগ্ন শিল্পীর অবিশ্বাস্যরকম পরিমিতিবোধ ও শিল্পপ্রকাশের ভারসাম্যের নিপুণ কুশলতা। সত্যজি রায়ের এইসব সৃষ্টিতে সবকিছু নিয়ে এমন এক সম্পূর্ণতার মুখোমুখি হতে হয়, যা অন্যমাত্রায় আমাকে মুগ্ধ করে, উদ্বেলিত করে ও গভীর প্রশান্তিতে এক ধরনের দীর্ঘশ্বাসের অবতারণা করে।

জানি, প্রযুক্তির কল্যাণে চলচ্চিত্র নির্মাণে নানামাত্রায় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের ভাষা ও কিংবা আবহ সঙ্গীতে তাঁর নিজস্ব সঙ্গত বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক চিরায়ত ধারা হিসেবেই পরিগণিত হবে৷
জন্মশতবার্ষিকীতে সত্যজিৎ রায়ের অবিস্মরণীয় স্মৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা।

- Advertisement -

Read More

Recent