শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

একটা ফাটাফাটি ইন্টারভিউ করবো

কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক ও কবি মার্গারেট অ্যাটউড

কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক ও কবি মার্গারেট অ্যাটউড এবার নোবেল পাবার তালিকায় ছিলেন। জার্মান থেকেও দাউদ হায়দার একই কথা বললেন। তাঁর ‘দ্য ব্লাইণ্ড আসাসিন’ (The Blind Assassin) উপন্যাসটি ২০০০ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করে। মার্গারেট থাকেন টরন্টোতে। সেই বিবেচনায় যোগাযোগ করলাম। ২ অক্টোবর তাঁর সেক্রেটারি লাউরা স্টেনবার্গ উত্তর দিলেন। অপেক্ষা করছিলাম, মার্গারেট অ্যাটউড নোবেল পেলে আমি একটা ফাটাফাটি ইন্টারভিউ করবো।

কিন্তু ১০ অক্টোবর যেমন হতাশ হলাম। পাশাপাশি চমকে উঠালাম। অবসর প্রাপ্ত লেখকের নোবেল প্রাপ্তি! কারণ, নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমেরিকান জয়েস ক্যারল ওটস, ফিলিপ রথ, জাপানের হারুকি মুরাকামি এবং স্বদেশি মার্গারেট অ্যাটউডকে ছাড়িয়ে বিজয়ীর হাসি হাসলেন আরেক কানাডিয়ান লেখক এলিস মনরো। যার কথা অনেকেই জানেন না। এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬% তাঁর কোন লেখা পড়েননি। যদিও কানাডার সাহিত্য জগতে তিনি পরিচিত। বিশেষ করে ছোটগল্পে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর গল্প পাঠ্য। ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর এবং বয়সের কারণে তিনি গত বছর আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা দিয়ে লেখালেখির জগত থেকে অবসর নিয়েছেন।

- Advertisement -

তিনি অন্টারিওবাসী হলেও থাকেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া শহরে, মেয়ের সাথে। তাই সুইডিশ একাডেমী এলিসের সঙ্গে ফোনে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে নোবেলপ্রাপ্তির বার্তাটি রেখে দেয়। এলিস খবরটা পাওয়ার আগেই খবর পেয়ে যান প্রধানমন্ত্রি ষ্টিফেন হারপার। হারপার আনন্দের সংবাদটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে মনরোকে অভিনন্দন জানান।

এদিকে সংবাদ মাধ্যম তথা সিবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক হিদার হিস্কং মনরোর ছোট মেয়ে জেনিকে ফোন করে। ঘুম ভেঙ্গে রাতের স্বপ্নে পাওয়া যেনো এ এক সোনার হরিণ। খুব ভোরে মাত্র বিছানা ছেড়ে মনরো তখন পায়চারি করছিলেন। জেনি মা’কে বলেন- মা, তুমি জিতেছ। লেখিকা অবাক বিস্ময়ে মেয়েকে বলেন, কী জিতেছি। মেয়ে বলেন, নোবেল প্রাইজ! এভাবেই তিনি খরবটা পেয়ে নিজেই চমকে উঠেন।

উল্লেখ্য, প্রথম কানাডিয়ান সাহিত্যিক হিসেবে তিনি এ পুরস্কার অর্জন করলেন। কারণ, ১৯৭৬ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জনকারী আমেরিকান সাউল বেলো কানাডার বংশোদ্ভূত লেখক। তাঁর জন্ম ক্যুইবেকের লেসিনে হলেও তিনি শৈশব থেকে শিকাগোয় বেড়ে উঠেন। ফলে কানাডার ভাগ্যে তা জুটেনি, স্থলে স্থান পায় যুক্তরাষ্ট্র।

প্রসঙ্গক্রমে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা উল্লেখ করছি। গত বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স দু’বৈজ্ঞানিকের সাথে যৌথ ভাবে কানাডার মৃত বিজ্ঞানী রলফ স্টেইনম্যানকে চিকিত্সা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। অথচ ৬৮ বছর বয়স্ক রলফ ২০১২ সালের গত ৩০ সেপ্টেম্বর অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারজনিত কারণে মারা গেছেন। ফলে প্রথমবারের মতো একজন মৃত ব্যক্তির নামে নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হল। নিয়ম অনুযায়ী মৃত কারও নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয় না। পুরস্কারের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা । নোবেল কমিটি তার পুরস্কার বহাল রেখেছে।

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পদক পান, আর একশ’ বছর পর অর্থাৎ ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পদক পেলেন এলিস মনরো। আমি বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান হিসেবে আমাদের রবীন্দ্র-মনরোকে নিয়ে ভিন্ন ভাবে গর্বিত। একজন লেখক হিসেবেও আমি দু’জনকে দু’ভাবে নৈকট্য অনুভব করছি।

আরো একটি মজার ব্যাপার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওতে এলিস মনরো সাংবাদিকতা ও ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন। এখন সেই ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর হচ্ছেন- আমাদের চাটগাঁ অমিত চাকমা। তিনি আনন্দের সাথে জানিয়েছেন, এলিস এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গর্বিত এবং আমরাও সম্মানিত।

তিনি এখন কানাডিয়ানক আইকন। নিজের আলোতে আলোকিত করেছেন কানাডিয়ানদের। কানাডার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়েছেন আনন্দধারা। তাকে মূল্যায়ন করে বলা হচ্ছে- মনরো এখন কানাডার সাহিত্যের হৃদয়। কানাডার প্রধান মন্ত্রি ষ্টিফেন হারপার বলেছেন, মিস মনরো শুধু কানাডার সাহিত্যেই নয়; এখন বিশ্ব সাহিত্যেও উঁচু মানের লেখক হিসেবে স্বীকৃত এবং সন্মানিত। তাঁর এই নোবেল প্রাপ্তি বিভিন্ন দেশের সেরা লেখকদের সারিতে কানাডাকে স্থান করে দিলো।

তিনি সব সময় সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। কিন্তু জীবনকে তিনি দেখতেন খুব সুক্ষ আর অন্তর্নিহিত ভাবে। তাই ক’দিন আগে টরন্টো থেকে প্রকাশিত ডেইলি গ্লোব এন্ড মেইলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জীবনের চাকচিক্য কখনোই আমাকে টানেনি। আমি নিজের মতো সহজ একটি জীবনযাপন করতে চেয়েছি। চেয়েছি ছোটগল্পের মধ্যে আমার দেখা মানুষ ও তার জটিলতাগুলো উপস্থাপন করতে। আর চেয়েছি সব কোলাহল ছেড়ে দূরে এই ছোট্ট অন্টারিওতে নিরিবিলি বেঁচে থাকতে। এখানে খুব বেশি মানুষ আমাকে লেখক হিসেবে চেনে না। তাই আমি আর দশজন মানুষের মতো এখানে নিজের মতো একটি নির্ভার জীবনযাপন করতে পারি।’ এবং সে ভাবেই তিনি নির্জন-নিভৃত গ্রামতুল্য উইংহামে জীবন কাটিয়ে একাগ্রমনে লিখেছেন জাদুকরী গার্হস্থ্য গ্রন্থ। তবে তিনি প্রথম থেকে শেষ অব্দি এক ধরনের লেখকই থেকে গেছেন।

নর-নারীর সম্পর্কের জটিলতা, মফস্বল শহরে বসবাসের বাস্তবতা এবং স্মৃতির নানা বিন্যাস তাঁর রচনার মূল বিষয়। তাই সমালোকেরা তাঁর সম্পর্কিত মূল্যায়ন নেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বালিকা থেকে নারী হয়ে ওঠার পথে মেয়ে জীবনের টানাপড়েনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে তিনি মুনশিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেন এবং একই সঙ্গে উপস্থাপন করেন নৈতিক দ্বন্দ্ব, অনুভূতি ও উপলব্ধি, অস্তিত্ব।

‘কানাডার অন্তন চেকভ’ হিসেবে খ্যাত এলিস মুনরো ছোটগল্প ছাড়া আর কিছু লিখেন নি। তাই এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বছরের পর বছর আমি এ বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে আছি যে, ছোটগল্প লেখা একটি অভ্যাস বিশেষ; অবশ্য সে ক্ষেত্রে এখনও উপন্যাস রচনা করে উঠবার মতো অবসর আমি পাইনি!’ ১০ অক্টোবর ২০১৩, নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর দূরভাষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন Nobelprize.org’s-এর অ্যাডাম স্মিথ। সেই সাক্ষাৎকার এলিস বলেন, ‘আমি চাইবো গল্প যেন তার নিজের জোরেই প্রথম সারির আসন নিতে পারে, যেন তার জন্য কোন উপন্যাস লেখার দরকার না পড়ে’। তাঁর কোনো কোনো বড়গল্প উপন্যাসের সমতুল্য।

মনরো মাঝে মধ্যে শখ করে কবিতাও লিখেন। তবে তাঁর কোনো কবিতার বই বের হয়নি। কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘হ্যাঁ, কখনো সখনো লিখি। কবিতার ধারণাগুলো আমার ভালো লাগে কিন্তু তুমি জানো যখন তুমি গদ্য লিখ, আমি মনে করি তুমি সচেতনভাবেই কাব্যিকতাকে পরিহার করো। গদ্য চায় কিছু সোজাসাপ্টা তীব্রতা, এবং এখন এভাবেই লিখি। এমনভাবে লিখতে চাই যে পদ্ধতিটি আমি জানি না’।

বাবা রবার্ট এরিক লেইডল কৃষক আর মা অ্যানি ক্লার্ক লেইডল স্কুল শিক্ষিকা। তাঁদের কন্যা এলিস অ্যান লেইডল জন্ম ১৯৩১ সালের ১০ জুলাইক অন্টারিওর ইউংহ্যামে। ১৯৫১ সালে সহপাঠী জেমস মনরোর সঙ্গে প্রথম বিয়ের পরই ‘এলিস অ্যান লেইডল’ থেকে হয়ে উঠেন এলিস মনরো। তিনি হোটেলে-রেঁস্তোরায়, খেত-খামারে, গ্রন্থগারের কেরানির কাজ করেছেন। পরে স্বামীর সঙ্গে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিক্টোরিয়ায় আবাস গড়েন। সেখানে তাঁরা ‘মনরো বুকস’ নামে লাইব্রেরির ব্যবসা শুরু করেন, যা এখনও চালু রয়েছে। তবে জেমসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি ১৯৭৬ সালে ভূগোলবিদ জেরাল্ড ফ্রেমলিনকে বিয়ে করে আবার অন্টারিও ক্লিনটনে চলে আসেন। জেমস মনরোর সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও তিনি তাঁর নামের শেষে ‘মনরো’ যুক্ত রেখেছেন। এ বছর এপ্রিলে দ্বিতীয় স্বামী জেরাল্ড মারা যান। তাঁর তিন কন্যাসন্তান আন্দ্রেয়া, শায়লা এবং জেনি। সবাই প্রথম ঘরের। এখন তিনি মেয়ের কাছেই আছেন।

বাবা মা’র সাথে তাঁর সম্পর্ক কিছুটা জটিল ছিলো। ছিলো স্ববিরোধী সম্পর্ক। তা তাঁর ‘প্রিয় জীবন’ গল্পে সেই স্ববিরোধী বিষয়ের অবতারণা করেছেন।

কৈশোরে সাহিত্যচর্চা শুরু করলেও তার প্রথম গল্প ‘দ্য ডাইমেনশনস অব আ শ্যাডো’ সালে, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তবে ৩৭ বছর বয়সে বের হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ড্যান্স অব হ্যাপি শেডস’। তাঁর সর্বশেষ বইটি বেরিয়েছে ‘ডিয়ার লাইফ’ নামে ২০১২ সালে। তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন। তবে ফরাসী, সুইডিশ, স্প্যানিশ ও জার্মানসহ মোট চারটি ভাষায় বই বের হয়েছে। বাংলায় কোনো বই অনুবাদ হয়নি। আমি টরন্টোর ডাউন টাউনের ইনডিগো বুক ষ্টোর থেকে কিনে আনলাম ‘ডিয়ার লাইফ’। ভাবছি অনুবাদ করবো তাঁর নির্বাচিত গল্পগুলো। ভ্যাঙ্কুভারে পয়েট্রি সেন্টার এবং মনরো লাইব্রেরিতে যোগাযোগ করলাম, তাঁর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু পারলাম না।

সর্বমোট পনেরোটি গল্পগ্রন্থের জননী এলিস মনরো লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার গভর্নর জেনারেল পদক, ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কল প্রাইজ, ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কল প্রাইজ, কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর গল্প নিয়ে সারাহ পলি ছবি নির্মাণ করেন ‘চলচ্চিত্র অ্যওয়ে ফ্রম হার’। তাতে অভিনয় করেন জুলি ক্রিস্টি এবং গর্ডন পিন্সেন্ট। ২০০৬ সালে টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে তা শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের জন্য একাডেমি পুরস্কার পায়। এবং সেই ছবি অস্কার পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পায়।

২০০৯ সালে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে তার হৃৎপিণ্ডে বাইপাস সার্জারিও হয়েছে। ‘তারপরও বেঁচে আছি আনন্দ নিয়ে, নিজের কাজ নিয়ে।’ যদিও গত বছর তিনি লেখালেখি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপরও অবসর প্রাপ্ত লেখকের নোবেল খ্যাতি ঘটলো! পুরষ্কার পাবার পর আবার কি তিনি লেখালেখির ভূবনে ফিরে আসবেন? এই প্রাপ্তি কি তাঁকে নতুন প্রেরণা দেবে? এইসব প্রশ্নের উত্তরে এলিস মনরো বলেছেন, এই প্রাপ্তি আমাকে প্রেরণা দিয়েছে। আমি লিখবো।

- Advertisement -

Read More

Recent