শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

ফ্লাইট মোড

ফ্লাইট মোড

মোবাইলে গেম খেলছি এমন সময় বাবার কল। এমন স্টেজে আছি এখন কল ধরলে গেমে হেরে যাব। কল ধরলাম না, পরপর দুইবার। পরে কল দেব চিন্তা করলাম। কিন্তু যথারীতি ভুলে গেলাম। এমন বহুদিন ধরে চলে আসছে। বাবাকে হু হা রিপ্লাই দেই, কখনো গেম কখনো কাজের ব্যস্ততায় কল ধরি না। পরে দেব ভাবলেও দেয়া হয় না। এভাবে দিন, মাস, বছর কেটে যায়। বাবাও আস্তে আস্তে বিরক্তিকর হয়ে ওঠেন। কল করলেই এত কথা বলেন যার অধিকাংশই বুঝতে পারি না। বাবার দাঁত পড়ে গেছে কয়েকটা। বাসায় যেতে বললেও যাই না। ইদানীং বাবার কাছে বসতেও ইচ্ছে করে না। প্রস্রাব ধরে রাখতে পারেন না তাই গায়ে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ হয়। কেমন বমি লাগে। পাইরিয়া হবার কারণে মুখেও দুর্গন্ধ। যে বেতন পাই তাতে আমার মনমতো হয় না। তবু তাকে মাসে ৫ হাজার টাকা পাঠাই। কোন কোন মাসে তাও পারি না। বাবার আর কি লাগে। দুই ঘর ভাড়াটিয়া আছে সেখান থেকে ১০ হাজার পান। একলা মানুষ আর কি লাগে। মাঝে মধ্যে বলেন একটু ডাক্তার দেখাতে আমার বাসায় আসবেন। আমি গিয়ে নিয়ে আসব বলি। কিন্তু সময় হয়ে ওঠে না। নতুন বিয়ে করেছি।

বউয়ের খুব সখ নেপাল ঘুরতে যাবে। কয়েকমাসে কিছু টাকা জমিয়েছি। ভেবেছি নেপাল ট্রিপ দিয়ে এসে একটু বাড়ি যাব। বাবাকে গত কয়েকমাস টাকা পাঠাইনি। একটু দেখেও আসব। চলে এলাম নেপাল ট্রিপে। মনে হল জীবনের বেস্ট মোমেন্ট কাটাচ্ছি নেপালে।

- Advertisement -

মোবাইলে বাবা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা শুনতে পাইনি। বাবার মোবাইলে স্পিকার নষ্ট হয়ে গেছে। ধুর! এতবার কল দিলাম তবু তার কথাই বুঝতে পারছি না। এবার একটা ফোনও কিনে দিতে হবে দেখছি। আর ভালো লাগে না। বিরক্ত হয়ে ফোন ফ্লাইট মোডে দিয়ে রাখলাম। বাইরে থাকলে ছবি তোলা, মজা করা আর হোটেলের মধ্যে এলে ওয়াইফাই ব্যবহার করে ছবি, রিলস আপলোড, বন্ধু আর পরিচিতদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলা। ভুলেই গিয়েছি ফোন ফ্লাইট মুডে। নেপাল থেকে ফিরে যখন এয়ারপোর্টে নেমে বাসার হেল্পিং হ্যান্ডকে কল দিতে যাব তখন দেখি মোবাইল ফ্লাইট মোডে। ফ্লাইট মোড কেটে কল দিলাম। হেল্পিং হ্যান্ডের সাথে কথা বলার সময় টের পাচ্ছি টুংটুং করে শব্দ হচ্ছে। নির্ঘাত ফোন কোম্পানির মেসেজ একগাদা। কথা শেষ করে উবার ডাকলাম। গাড়িতে উঠে বাসার দিকে যাচ্ছি, পথে বিরাট জ্যাম৷ ফোন ঘাটছি। খেয়াল করলাম ৩৪টি মেসেজ। সবই মোবাইল কোম্পানির মেসেজ। ডিলিট করা শুরু করলাম। ডিলিট করার প্রায় শেষ পর্যায়ে একটা অপরিচিত নম্বরের মেসেজ দেখে ওপেন করলাম। ‘আপনার বাবার অবস্থা ভালো না, দ্রুত বাড়িতে আসুন’ মেসেজ দেখেই একটু চমকে উঠলাম।

তিনদিন আগের মেসেজ। মনটা কেমন করে উঠল। বাড়িতে যেতে হবে। আজকের জ্যাম আর শেষ হয় না। বাবার নম্বর এ কল দিলাম। বাবা রিসিভ করলেন কিন্তু কিছু শুনতে পাচ্ছি না। ফোনটা রিসিভ করেছে দেখে একটু স্বস্তি পেলাম। আজ আর বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। বউকে বললাম চল বাড়িতে যাই সে বলল আগামীকাল যাবে। এত জার্নি করে তার খারাপ লাগছে। আসলে ক্লান্তি যে আমারও এসেছে। আগামীকাল ই যাব। খুব সকালে দু’জন রওনা দিলাম বাড়ির পথে। হিসেব করে দেখলাম পাক্কা দেড় বছর বাড়ি যাই নি। আমার মা মারা গেছেন আমি ছোট থাকতেই। বাবাই মানুষ করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে শহরে সেটেল্ড হতে চাইলে বাবা না করেন নি। খেয়াল করে দেখলাম বাবা কোনদিন আমার কোন ইচ্ছেতে না করেন নি। শুধু বলতেন নিজের খেয়াল রেখ। মোবাইলে কথা হত, পুারোটাই আমি কেন্দ্রিক।

বাবাও আমার কথা বলেন, আমিও আমার কথা বলি। নেপাল থেকে বাবার জন্য কিছু আনিনি। আসলে তেমন কিছু কিনিনি। টেনে টুনে ট্রিপ আর কি। ঢাকা থেকে বাবার জন্য একটা চশমা কিনব ভেবে প্রেসক্রিপশন খুঁজে দেখি বাবাকে শেষ চোখের ডাক্তার দেখিয়েছি ৪ বছর আগে। এরপর চশমা কেনার কথা থাকলেও তখন কেনা হয়নি। বাবা বলেছিলেন এখন তো চোখে দেখি, একটু পরে কিনে দিও। যখন তোমার হাতে টাকা হবে। দেয়া হয় নি।

গত চার বছরে অনেক কিছু পাল্টেছে। বাবার আরও কিছু অসুখ বেঁধেছে। বাবা বেশি কথা বলা শুরু করেছেন। কারণে অকারণে কল দেন। শুধু বাড়িতে যেতে বলেন। আমি চাকরি পেয়েছি, নতুন বাসা নিয়েছি। একা একা বিয়ে করেছি কলিগকে। বাবা জানার পর কিছু বলেন নি। দোয়া করে দিয়েছেন আর বউমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। সেও যাওয়া হয় নি। আজ বাড়িতে যাবার পথে সব মনে পড়ছে। খেয়াল করলাম আজ বাবা দিবস। কত স্ট্যাটাস দিচ্ছে মানুষ। আমার এসব দিবস টিবস কিংবা স্ট্যাটাস দেওয়া ভালো লাগে না। ইদানীং বউয়ের পাল্লায় পড়ে দেই আর কি।

মোবাইলে স্ক্রল করতে করতে বাবাকে নিয়ে কতশত লেখা চোখে পড়ল। সাতপাঁচ কি যে ভাবছিলাম। বউয়ের কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। বাসস্ট্যান্ডে এসে গেছি। বাসস্ট্যান্ড থেকে মিনিট বিশেক রাস্তা। একটা রিকশা নিলাম। বাবা কমলা আর কলা খুব পছন্দ করেন৷ তাই রিকশায় ওঠার আগে কমলা আর কলা কিনলাম। শেষ কবে বাবার জন্য নিজের হাতে কিনেছি মনে পড়ল না। মনটা কেমন খচখচ করে উঠল। খুব বেশি না কামালেও দু’জন যা আয় করি তাতে বেশ ভালোই চলে যাবার কথা। আমরা ফ্ল্যাট কিনব বলে টাকা জমাতে শুরু করেছি। এজন্য একটু হিসেব করে খরচ করতে হয়। গত কয়েকমাস বাবাকে টাকা পাঠানো হয় নি। তবে বাবার তো হাজার দশেক আসে টাকা। ওতেই বাবার চলে যায়। এজন্য অত ভাবি নি। তবে আজ মনে হল এবার বাবাকে এনে একটু ডাক্তার দেখাব। একটা চশমাও কিনে দেব। নীল ফ্রেমের চশমা। বাবার নীল রঙ পছন্দ।

বাসার সামনে রিকশা আসতেই খেয়াল করলাম জানালায় নতুন পর্দা ঝুলছে। নীল রঙের। বাবার পছন্দের রঙ। বাবা, বাবা বলে ডাকতে ডাকতে দরজায় টোকা দিলাম। দরজা খুলতে এত দেরি হচ্ছে কেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দরজা খুলল। একজন অচেনা মহিলা দরজা খুললেন। আমি একটু অবাক হলাম। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, আপনি রোহান? আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি আমাকে তার সাথে যেতে বললেন। আমার এতক্ষণে বুকটা পাথরের মত জমে গেছে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠছি আমি। বউ বুঝতে পেরে শক্ত করে হাতটা ধরল। নিঃশব্দে মহিলার পেছনে হাঁটতে লাগলাম। মহিলা আমাদের বহু পুরনো ডালিম গাছের কাছে এসে থামলেন। চোখের সামনে নতুন একটা মাটির ঢিবি, যাকে কঠিন বাংলায় আমরা কবর বলি।

বাবা বহুবার দুষ্টুমি করে আমাকে বলতেন আমি মরে গেলে এই গাছের নিচে কবর দিবি আর কবর ২ কবিতা লিখে তোর ছেলেমেয়েদের শোনাবি। তখন ক্ষেপে যেতাম বাবার মৃত্যুর কথা শুনে। অথচ আজ স্তব্ধ হয়ে গেছি। কান্নাও বের হচ্ছে না। বাবা নাকি গত একবছর ধরে বিছানায় পড়ে আছেন৷ ভাড়ার ঘর ভেঙে যাওয়াতে সেখানে ভাড়াও হয় না। কোনমতে দু’বেলা ভাতসেদ্ধ খেতেন। শেষের দিকে কয়েকদিন না খেয়ে যখন মৃতপ্রায় তখন এই মহিলা এসে খাবার দেন। আমাদের বাসায় কোন লোকজন আসে না তেমন। বাবা বাসায়ই পড়ে থাকতেন আর আমাদের এলবাম দেখতেন।

আমি জানি ওই এলবামে আমার মা বাবার একটা ছবি ছাড়া সমস্তই আমার ছবি। কতটা অসহায় অবস্থায় আমার বাবা দিন কাটিয়েছেন। চোখে দেখতে পেতেন না তেমন। তাই পানির কলসে মরা বিছাপোকাও দেখতে পান নি। যখন পঁচে দুর্গন্ধ হয়েছে তখন তার অবস্থা শোচনীয়। বেশ কয়েকদিন বাবা বাড়ি থেকে বের হন নি দেখে এই মহিলা এসে দেখেন বাবা না খেয়ে একেবারে দুর্বল হয়ে গেছেন। তারপর তারা আমাকে কল দিলেও কল যায় নি। মেসেজ দিয়েছেন।

বাবা নাকি মৃত্যু পর্যন্ত শুধু আমার কথা বলে কেঁদেছেন হাউমাউ করে আর ছবি দেখেছেন। মৃত্যুর সময়ও বাবা একাই ছিলেন। শুধু বলে গেছেন তার মোবাইল যেন অন রাখি আর আমি কল দিলে জানাই।

আমি আর শুনতে পারছি না। আমার বাবা! আমার সাথে একটু কথা বলার জন্য কতবার কল দিতেন আর আমি গেম খেলার মত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য কল ধরিনি। দিনের পর দিন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি তবু ওই মানুষটার খোঁজ নেই নি। যা সামান্য টাকা দিতাম তাও ঠিকমত দেই নি। আর নেপাল ঘুরতে যাবার ফান্ড গোছাতে গিয়ে বাবার দেয়া টাকাতেই টান পড়ল? কত বন্ধু বান্ধবকে নেপালে গিয়ে ভিডিও কল দিয়েছি অথচ বাবার সাথে একটি বার কথা বলিনি। কত কি মনে পড়ছে আজ।

আমার কষ্ট হবে বলে আরেকটি বিয়েও করেনি আমার বাবা৷ হাত পুড়িয়ে রান্না করেছে৷ শুচিবাইগ্রস্ত বাবাটা আমার চশমার অভাবে পোকা পড়া পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল। আজ ক্ষমা চাইব কার কাছে? বাবা বলে ডাকবই বা কাকে? আর কারও কল আমার বিরক্তির কারণ হবে না! শুধু ফ্লাইট মোড দেবার কারণে শেষ বারের মত বাবার মুখটাও দেখতে পারলাম না। সারাজীবন আফসোস করার জন্য বাবা দিবসের সেরা উপহারটাই কি সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিলেন? বাবার কবর??

- Advertisement -

Read More

Recent