শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে

কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে

আমাদের বাল্যকালের বিয়ানীবাজার ছিল ছোট্ট শহর। কিন্তু, ছোট হলেও বিয়ানীবাজারই ছিল আমাদের জন্য অনেক আনন্দের, অনেক স্বপ্ন বুননের জায়গা। এক ক্যানভাসার আসতেন শক্তিবর্ধক ও নানান রোগের উপশমের জন্য ঔষধ বিক্রি করতে। তার সঙ্গে থাকতো এক গায়ক। ক্যানভাসার খুব উচ্ছ্বাসের সাথে গায়ককে পরিচয় করিয়ে দিতেন। গায়ক ছেলেটি ছিল পাকিস্তানের। এতিম পাঠান। গান গাওয়ার মাঝখানে মুখভঙ্গি করে নানান গিমিক করতো। হাতের বায়ায় এমন এক আওয়াজ তুলতো যে, এক ধরনের কৌতুক ধ্বনিতে আমরা খুব মজা পেতাম। বৃত্তাকারে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে দর্শক-শ্রোতারা ক্যানভাসারের কথা শুনতেন। গায়কের কণ্ঠে গান শুনতেন। শিশুকিশোররা হাটু গেঁড়ে সামনে বসতো। আমার এখনো সেই ক্যানভাসার ও গায়কের কথা মনে পড়ে। অস্পষ্টভাবে গায়কের মুখচ্ছবিটি চোখে ভাসে। স্পষ্ট স্মৃতির অনুরণনে তার কণ্ঠের গান এখনো ধ্বনিত হয় আমার কানে। নিঃশব্দে।

বিয়ানীবাজারের মাঝখানে নিউমার্কেট নামে আলাদা পরিসরে পরিপাটি করে বেশ কিছু দোকানপাট ছিল। ছিল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও একটি পায়ে চাপের ছাপাখানা। নিউমার্কেটের সামনে রাস্তার পাশে ছিল বিশাল বিশাল কয়েকটি শতবর্ষী শিরিষ গাছ। এইসব শিরিষ গাছের গোড়ার ছায়ায় পানের দোকান, মাটিতে ছালা বিছিয়ে পেয়ারা, জাম্বুরা, লেবু, কলা ও নানান ধরনের ফল বা সবজি বিক্রি করতেন অস্থায়ী কয়েকজন বিক্রেতা৷ পাশের বা আরেকটু দূরের কোন গ্রামের হলেও এদেরকে আমরা চিনতাম। সবচেয়ে বড় শিরিষ গাছের তলায় স্থায়ীভাবে বসতেন একজন মুচি। এই মুচির একটি পা খুঁড়া। নাটকে যেরকম খুঁড়া চরিত্রের কাউকে হেঁটে যেতে দেখা যায়, ঐ মুচি ভাইও সেইভাবে হাঁটতেন। একই গ্রাম হওয়ায় প্রতিদিন সকালে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে তাকে খুঁড়িয়ে হেঁটে যেতে দেখতাম। জুতো বা চামড়ার স্যান্ডেল সারাই করালে তার কাছেই যেতাম। তার একটি কাঠের বাক্স ছিল। তার ভিতরে জুতোর রঙ, সুতো, নানান মাপের সুঁই, চামড়া, জুতোর জিহ্বা, ফিতাসহ নানান জিনিস থাকতো সেই বাক্সে। জুতো সারাইয়ের সময় তার ডানহাতের কনুইয়ের কাছে রাখা সেই বাক্সে আমাকে বসতে দিতেন। আমি অবাক হয়ে তার নিপুণ হাতের জুতো সেলাই দেখতাম। সবচেয়ে ভালো লাগতো কোন জুতোর রঙ করা দেখতে। রঙের কৌটা খুলে জুতোর ব্রাশের একেবারে উপরের দিকে সামান্য একটু চাপ দিয়ে রঙ লাগিয়ে সেটা জুতোর চারদিকে ছড়িয়ে দিতেন৷ অন্যরকম একটা গন্ধ নাকে এসে লাগতো। কী যে ভালো লাগতো। এমন হলো যে, আমার নিজের জুতো সারাইয়ের প্রয়োজন না হলেও আমি সেই মুচির কাছে গিয়ে তার কাজ দেখতাম। এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়েও আমি তার ছোট কাঠের বাক্সে গিয়ে বসে থাকতাম।

- Advertisement -

বিয়ানীবাজার থেকে বছরে একবার হলেও আমরা হবিগঞ্জ যেতাম। কখনো কখনো হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায়। রাতের ট্রেনে গেলে যে কোন জংশন দেখলে অবাক হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। টিউব লাইটের ধবধবে আলোকে ঘিরে পোকা-পতঙ্গের আনন্দের উৎসব। মানুষের ছোটাছুটি। এক ট্রেন থেকে নেমে আরেক ট্রেনে ওঠার প্রাণান্তকর প্রস্তুতি। অপরূপ সাজের স্টেশনারি দোকান। সেই দোকানের এক পাশে মানিব্যাগ সাজানো। কোন কোন খোলা মানিব্যাগে ববিতা শাবানা কবরীর ছবি। অন্যপাশে মাসুদ রানা, দস্যু বনহুর, কুয়াশাসহ নানান ধরনের বই। জানালা দিয়ে এগুলো দেখছি। কিন্তু দূর থেকে কানে আওয়াজ আসছে ঐ… চা.. গরমমম। ঐ ডি…..ম। সেদ্ধ ডিইইইইম। ঐ পা……ন, সিগারেট। বড় মায়াভরা এইসব ডাক। গভীর রাতে অনেক দূরের কোন ট্রেন জংশনে অর্থের বিনিময়ে হলেও এইসব ভাইদের পণ্য বিক্রির ডাক বড় মায়া লাগতো৷ বিক্রি করার নির্দিষ্ট সদাইয়ের ডাকটিই তো দিতেন তারা; কিন্তু, এদের প্রতিটি ডাকের সঙ্গে অপ্রকাশিত অনেক গল্প এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতো।

হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিলে একেকজন বিক্রেতা জানালার পাশে আস্তে আস্তে চলা ট্রেনের গতির সঙ্গে গতি মিলিয়ে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বিক্রির চেষ্টা করতেন৷ একসময় ট্রেনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা ক্ষান্ত দিতেন। ট্রেন গতি বাড়িয়ে সহসা অন্ধকারে মিলিয়ে যেত। মাঠ, পাহাড়, নদী, হাওর ডিঙিয়ে আরো সামনে। আরো দ্রুত গতিতে। আমার প্রাণ পড়ে থাকতো সেইসব ডাকের ভাইদের কাছে। একেবারে শেষ পর্যন্ত আমি তাকিয়ে দেখতাম৷ কোন মায়ের জাদুর দুলাল হাড়কাঁপানো শীতের রাতে না ঘুমিয়ে প্রতিদিনের জীবনের যুদ্ধে জয়ী হচ্ছেন। ট্রেন স্টেশন থেকে কতদূরে তার বাড়ি! সে কি ক্ষেতের আলপথ ধরে হেঁটে মাঠ পেরিয়ে তিনগ্রামের পরের গ্রামে যাবে! জানালা থেকে নিজের আসনে বসে হাতমুড়া দিয়ে আমি মুখ ঢেকে রাখতাম। আমার নিজের মুখটি ঢেকে রেখেছিলাম বলে হয়তো সেই মুখগুলো আমার ভিতরে এখনো বসবাস করছে৷

আমার কি ইচ্ছে করে না এদেরকে সেরকমভাবে দেখি? হ্যাঁ, খুব ইচ্ছে করে। এদেরকে শুধু দেখতে নয়, ঝাপটে ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। কেন এরকম হয়। আসলে ভিন্ন চরিত্রের হলেও এরা আমারই ছেলেবেলা। টুকরো টুকরো আমারই অংশ৷ অজানায় লুকিয়ে থাকা আমারই সত্তা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, আমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা আপন সত্তার নানান চরিত্রের সবগুলো মুখ একসঙ্গে পেয়ে যাই একজন অভিনেতার অভিনয় দেখলে। তিনি ফজলুর রহমান বাবু৷ এক অসাধারণ অভিনয় শিল্পী তিনি।

একজন মানুষের কতটুকু পর্যবেক্ষণ শক্তি থাকলে তার চারপাশের নানান চরিত্রকে নিজের মাঝে ধারণ করে তা ফুটিয়ে তুলতে পারেন, বাবু ভাইয়ের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় দেখে পরিমাপ করা দুঃসাধ্য। বাবু ভাইয়ের প্রতি আমার ব্যক্তিগত মুগ্ধতা পর্দায় তাঁর নানান চরিত্রের কাজ দেখে৷ কিন্তু মঞ্চের ছোট পরিসরে নানান চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার পর্যবেক্ষণের বীক্ষণ উপলব্ধিটিকে যখন নাট্যকর্মী মাহমুদুল ইসলাম সেলিম আমাদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন আমরা মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিলাম।

টরন্টো থিয়েটার ফোকস আয়োজিত এক সপ্তাহের নাট্য কর্মশালার প্রশিক্ষক ছিলেন সেলিম মাহমুদুল ইসলাম সেলিম। সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন নাট্যকলায় উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত শারমিন শরিফ শর্মী। তিন দশকের অধিককাল নাটকের সঙ্গে বসবাস করছেন সেলিম। নাটকই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। টরন্টো থিয়েটার ফোকস এমনই এক ভাবনায় বা বিশ্বাসে কাজ করছেন যে, প্রকৃতপক্ষেই সর্বজনীনতার চর্চায় যেন আমরা দলের সীমাবদ্ধতাকে বা দেয়ালকে ডিঙিয়ে বাংলা, বাঙালিয়ানায় বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি চর্চায় সবাই এক কাতারে দাঁড়াতে পারি। এই শহরে সংস্কৃতি কর্মীরা বাংলাদেশের জাতীয় ইস্যুতে বা মানবতার ডাকের প্রয়োজনে সবসময়ই এক কাতারে দাঁড়িয়ে গেছেন নিমিষেই। তারই ধারাবাহিকতার আরেকটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই এক সপ্তাহের নাট্য কর্মশালা।

টরন্টো থিয়েটার ফোকসের আন্তরিকতা ও কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অভিজ্ঞতা চিরকাল আমার মনে থাকবে৷ থিয়েটার ফোকস এর পক্ষ থেকে ইমামুল হক প্রশিক্ষক মাহমুদুল ইসলাম সেলিম ও সমন্বয়ক শারমিন শরিফ শর্মীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কর্মশালার শুরুতেই। নয়ন হাফিজ প্রতিদিন উপস্থিত থেকে কর্মশালার নানান মুহূর্তের মালা গেঁথে অপরূপ ভিডিও বানিয়েছেন। সবিতা সোমানি তো কর্মশালায় অংশগ্রহণই করলেন।

শারমিন শরিফ শর্মীর সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানেন, তিনি যে কাজটিই হাতে নিয়েছেন একশত ভাগ তা সফল করার সর্বান্তকরণ চেষ্টা তারা দেখেছেন৷ সময়ানুবর্তিতা থেকে প্রতিটি বিষয়ের পূর্ণতার প্রশ্নে অতি ক্ষুদ্র বা ছোট অনুষঙ্গকেও তিনি নিজের নজরে এনে তার সংযোজন বিয়োজন করেন। থিয়েটার ফোকস যেমন শারমিন শরিফ শর্মীকে সমন্বয়কারী হিসেবে পেয়ে নিশ্চিত হয়েছেন; তেমনি, কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি সদস্যও শর্মীর বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পেয়ে আপ্লুত, কৃতজ্ঞ।

কর্মশালার মূল কাণ্ডারী প্রশিক্ষক মাহমুদুল ইসলাম সেলিম কি শিখিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিত পরিসর দাবী করে। এতোই বিস্তারিত যে, তিনি যেন একেকটি বিষয়ের সূত্রপাত করেছেন নানান ইঙ্গিতে। সূত্র দিয়ে দিয়ে৷ এর ব্যাখ্যা ও বিস্তার যেমন শাখাপ্রশাখায় ছড়ানো। তেমনি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গভীরে জড়ানোও। এমনকি বিজ্ঞানও সেখানে অনুপস্থিত নয়৷ একটা উদাহরণ দিই : কর্মশালার আমাদের একজন বন্ধুর নাম মানবী মৃধা। কোন এক প্রসঙ্গক্রমে সেলিম ভাই মানবীকে জিগ্যেস করলেন – আজ যে শিশু জন্মগ্রহণ করলো, আসলে তার জন্মের বয়স কতো। স্বভাবতই মানবী বললেন- তার বয়স একদিন। সেলিম ভাই মানবীকে বললেন- আসলে শিশুটির বয়স চৌদ্দশত কোটি বছর। যেদিন থেকে এই মহাবিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, সেই মুহূর্ত থেকেই আমাদের সবার সৃষ্টি। প্রতিটি মানুষের, এমনকি প্রাণের বা পদার্থের শরীরে সৃষ্টির শুরুর মুহূর্তের অণু-পরমাণু বহমান। কেন এই কথাটি বললেন মাহমুদুল ইসলাম সেলিম? মানুষের শক্তি বুঝাতে। মানুষ যে অপরিমেয় শক্তির আধার তা বুঝাতে। মানুষ যে সত্যিই বিপুল বিশালতায় আত্মার পাখনা মেলে আকাশ ছুঁয়ে সমস্থ পৃথিবীতে ছায়ায় ঢেকে দিতে পারে, আবার মানুষ যে আত্মগ্লানির পেষণে সঙ্কুচিত হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে, এই বোধের সলতেয় আগুন জ্বেলে দিয়েছেন সেলিম। এ এমন এক আগুন যার স্পর্শ পেয়ে নাট্য কর্মশালার প্রতিটি সদস্য বন্ধু উষ্ণতায় উদ্বুদ্ধ।

মাহমুদুল ইসলাম সেলিম প্রশিক্ষকের ভূমিকায় থেকে বন্ধুত্বের প্রশ্রয় দিয়েছেন। বন্ধুদের সহজাত সাবলীলতা দিয়ে আদেশনির্দেশাদির হুকুকেও সম্মান-সমীহ অর্জন করেছেন। প্রতিটি সদস্যকে সম্মান দেখিয়ে, রসপূর্ণ ব্যবহারে সাতদিনের কর্মশালাকে মধুময় করে তুলেছেন। এমনও হয়েছে সাতদিনের পর কর্মশালা শেষ হয়ে যাচ্ছে, এ কথা ভেবে একটি পরিবার থেকে সাময়িক বিচ্ছেদের কষ্ট অনুভব করেছি আমি নিজেই। বুঝতে পারছিলাম নিজেকে দেখার আমার আয়নাটি হারিয়ে গিয়েছে। ট্রেনের জংশনে ফেলে আসা শেষ রাতের সেই চা বিক্রেতারূপী আমাকে দেখার সেই আয়নাটি। নিপুণ হাতে জুতো সেলাই করা শিরিষ গাছের তলায় মুচির দোকানের কাঠের বাক্সে বসা সেই আমাকে। প্রকৃত আমাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম ‘আমি’ নামক খোলসের আড়ালে। কোন জাদুর পরশে কে যেন আমার সামনে সেই আয়নাটি এনে তুলে ধরলো। আমি দেখতে পেলাম মাটির সঙ্গে মিশে থাকা সেই প্রকৃত আমাকে। আমার ভিতরে একটি গানের পাখি বারবার সেই গানটিই এখন গেয়ে উঠছে- কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে / ভরে যায় প্রহর আমার গানে গানে……।

জুন ১৬, ২০২৪
টরন্টো

- Advertisement -

Read More

Recent