শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

গল্প সন্তান

গল্প সন্তান

মোটামুটি দায় সারা গোছের একটা বিয়ে হলো রানুর। আর

দ্বিতীয় বিয়ে বলে কথা, কেইবা আর ঢাক ঢোল বাজিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে।তবে রানুর তো প্রথম বিয়ে আর শুনছে ওরা বেশ অবস্থাপন্ন!তাই ভেবেছে বেশ আয়োজন করে আসবে।কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি।

- Advertisement -

রানুকে বিয়ের জন্য ভাল জিনিস পত্র দিয়েছে।।রানুর বড়ই শখ সাজগোজের কিন্তু তার কপাল মন্দ! জন্মের পর মা, তারপর বাপ দুইজনই ওপাড়ে পাড়ি দিলো। সাত বছর বয়স থেকে মামা, মামীর কাছে মানুষ । কোনদিন ভাল কাপড়, ভাল খাবার তার ভাগ্যে ছিলনা। এ ভাবেই এ পর্যন্ত চলে এসেছে।

এর মধ্যে মামীর এক আত্মীয়, পাত্রের খবর নিয়ে আসলো । কিন্তু পাত্রের প্রথম স্ত্রী বর্তমান। রানুর মনে প্রশ্ন আসছে তাইলে এই লোকটা আবার বিয়ে করতেছে ক্যান? বৌ কেমন, স্বামীরে আবার বিয়ে করতে অনুমতি দিতেছে ? মামীকে প্রশ্ন করায় মামী তেড়ে আসছে… বলল, এমন পাত্র তোরে বিয়া করবো সেইটাই ভাগ্য.. ভাল খাবি, ভাল পরবি ! এর চাইতে বেশি কি চাছ? তুই যে অপয়া সেইটা মনে থাকে না!

এরপর রানুর কথা বলার সাহস হয় নাই! তবে রানুর ভাল খাওয়া, পরার খুব শখ! কিন্তু পোড়া কপালে তা আর জুটে কই? মামী তারে পারলে আধ পেটা খাবার দেয়।মাঝে মধ্য মামা কিছু খাবার দেয় মামীকে লুকায়ে। মামা মামীরে খুব ভয় পায়।আস্তা পাজী একটা মহিলা।
রানু ভাল, খাওয়া পরার স্বপ্নে বিভোর হয়!

শশুর বাড়ি দেখে রানুর চক্ষু চরক গাছ! কত্তো বড় বাড়ি! বড় বড় টিনের ঘর! আবার দোতলা ঘরও আছে। সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় তার সতীন তাকে বরন করলো! কে এক জন বলল, বৌ তুমিই ওকে ঘরে তোলো …

রানু সতীনের হাত ধরে ঘরে গেলো।যে ঘরে গেলো বেশ সাজানো গুছানো। এরপর বলল, শোনো আমি তোমারে সতীন হিসাবে আনি নাই… মনে করবা আমি তোমার বড় বইন। বলে কেমন করে যেন হাসলো! রানুর ভাল লাগলো না হাসিটা। এরপর বলল, যাও হাত মুখ ধোও নিশ্চয়ই ক্ষুধা পাইছে? বিয়ার দিন কোন মাইয়্যা মানুষ খাইতে পারে না! তবে তুমি খাবা আমি তোমারে যত্ন কইরা খাওয়াবো।

রানু যখন বাথরুম থেকে আসলো দেখলো.. ছোট টেবিল ভর্তি খাবার! রানু তো মহা খুশি!রানু আসতে উনি বললো তুমি আমাকে বুবু বলে ডাকবা, বুঝতেছ আমি তোমার বড় বইন হবো! তোমার খেয়াল রাখবো, ভয় পাইওনা! আমি সেই রকম সতীন হবে না যেমন সিনেমায় দেখায় বলেই আবার হাসলো! এবারও রানুর হাসিটা ভাল লাগলো না!মনে মনে ভাবলে এ মহিলার হাসিটা যেন কেমন! রানুর সরল মন বুঝলো না এ হাসির মধ্য এক কঠিন বাস্তবতা লুকানো আছে।

রানু পেট পুরে খেলো। সন্ধ্যা পার হতেই রাত নেমে আসলো। এতক্ষনেও রানু তার স্বামী নামক মানুষটাকে ঘরে আসতে দেখলো না। এদিকে তার চোখ জুড়ে রাজ্যির ঘুম নেমে আসতেছে। রানু বুঝতেছে না ঘুমাবে না অপেক্ষা করবে। এমন সময় দরজা ঠেলে কাদির( স্বামী) ঘরে ঢুকলো।

এবার রানু নড়ে চড়ে বসলো… কাদির সোজা এসে ওর পাশে বসে বলল, তোমারে আমার বিয়া করার কোন ইচ্ছা ছিলনা কিন্তু শানুর ( প্রথম বৌ) কথায় বাধ্য হয়ে করে ফেলছি! আমার কাছে বেশি কিছু আশা করে লাভ নাই। রানু এ সব শুনে হা করে চেয়ে রইলো! এই প্রথম রানু বলল তাইলে বিয়ে করলেন ক্যান? এবার কাদির সরাসরি তাকায়ে বলল, খবরদার এ বিষয়ে কখনো কারোরে প্রশ্ন করবা না…শানুরে তো কখনোই না! রানু কাদিরের চোখে প্রচন্ড রাগ দেখলো। ও ভয়ে চুপ হয়ে গেলো ।

এরপর যা হলো সেটাকে রানু কি বলবে বুঝলো না! আবেগহীন, ভালবাসাহীন শুধুই যন্ত্রের মত শারীরিক সম্পর্ক! এরপর লোকটা উঠে দরজা খুলে চলে গেলো।আর রানু কুকড়ে মুকড়ে ঝরে যাওয়া ফুলের মত বিছানায় পড়ে রইলো।

পরের দিন সকাল বেলা শানুর ডাকে ওর চোখ খুললো! কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গ্যাছে জানে না। রানু ধরমড়িয়ে উঠে বসলো। শানু ঠান্ডা গলায় বলল, কি আদর, সোহাগে বুঝি রাত পার হয়া গেছে আর এখন ঘুমাইতেছ? রানু লজ্জা পেয়ে বলল, জ্বী না! সারাদিনের ধকলে কাহিল হয়া পড়ছিলাম!

শানু হঠাৎ খুব মায়া মাখানো গলায় বলল, আহারে! যাও নতুন কাপড় রাখছি বাথরুমে গোসল শেষে নাস্তা খাইতে চলে আইসো! রানু এ মহিলার ব্যবহারের মাথামুন্ড কিছুই বুঝতেছে না! এই ভাল, এই কেমন যেন!খালি মনে হইতেছে কই আইস্যা পরলাম?

এভাবে রানুর দিন গুলো কাটতেছিলো! তবে রানু এক দিক দিয়ে খুশি… এ বাড়িতে কেউ তারে কামের কথা কয় না! সে শুধু সাজ গোজ করে, সুন্দর, সুন্দর শাড়ি কাপড় পরে… আর ভাল ভাল খায়। রানু বড় পেটুক কিসিমের! খাবার দেখলে, লোভ সামলাইতে পারে না। তবে এ বাড়িতে বুবু ছাড়া তার সাথে কেউ কথা বলে না।রানুরে ঘরের বাইরে দেখলে বুবু রাগ হয় বলে তুমি ক্যান বাহির হও? যা লাগবে বলবা সুখীর মা সব দিয়া আসবো।মাঝে মাঝে তার ক্যামন বন্দী বন্দী লাগে।এইটা তার ভাল লাগে না আর ভাল লাগেনা, রাতের ভালবাসাহীন শরীরের সম্পর্ক!

রানু একবার মামীর সাথে ফোনে কথা বলতে চাইছিলো… মামী এক ধমকে থামায় দিছে ! বলছে তোরে বিয়া দিয়া জানে বাচছি তুই আর ফোন দিবিনা কোন যোগাযোগও রাখবি না। রানু বুঝেছে মামীর উপর মামা কিছুই বলবে না। তাই ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে বসে আছে।
দুই মাস যেতেই বুবু একদিন তারে বলল, কিরে তোর মুখ শুকনা ক্যান? তারপর কাছে এসে বলল, তোর মাসিক হয় নাই? রানু না করলো ! এ কথা বলতেই বুবুর চোখ উজ্জল হলো… খুশির গলায় বলল, তাইলে তো সুখবর আছে।তুই পোয়াতি! এরপর বলল, তোরে আজকে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাবো । এরপর বলল, কাদিরে খবরটা দেই বলে অনেকটা দৌড়ে এমন ভাবে গেলো মনে হলো তারই বাচ্চা হবে। রানু অবাক হলো… সতীনের বাচ্চা হবে তাতে বুবু ক্যান এত খুশি?

এ ভাবে নয় মাস পার হয়ে রানুর ছেলে হলো। মাতৃমুখী ছেলে! কিন্তু বুবু সেটা মানতে নারাজ খালি বলে একবারে বাপের উপর দিয়া গেছে। কাদিরও খুব খুশি! এ সব কিছুর ভিড়ে রানু যেন চাপা পড়ে গেলো! কেউ রানুকে কিছুই বলল না। এমন কি রানুর মামার বাড়িও খবর দিলো না। রানু বলতেই বলল, বিয়ার পর একবারও যারা খবর নেয় নাই তাদের কোন মুখে জানাইতে চাও?

রানু সব ভুলে গেলো বাচ্চার মুখের দিকে তাকায়ে… আহা! কি মায়া… কি মায়া!রানুর বুকে জুড়ে মায়ার বান ডেকে যায়। রানু দুনিয়াদারী ভুলে বাচ্চা নিয়ে মগ্ন হয়ে যায়।

কিন্তু বাধ সাধলো বুবু… সারাক্ষণ বাচ্চা তার কোলে থাকবে! শুধু দুধ খাওয়ানো যেন রানুর কাজ।মনে হয় বুবু যেন বাচ্চার মা আর রানু বাচ্চার আয়া।কিছু বললেই বুবু রাগী চোখে তাকায়! আর এখন কাদির তো তার সাথে কোন কথাই বলে না শুধু বাচ্চা দেখতে আসে।বাচ্চাকে ভীষন আদর করে।কাদিরকে তখন অন্য মানুষ মনে হয়।

এভাবেই মাস দুই পার হলো। এর মধ্য বুবু বাচ্চাকে তোলা দুধ খাওয়াতে শুরু করলো। রানু বলল, ডাক্তার আপা বলছে অন্তত ছয় মাস বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য… এরপর অন্য কিছু। বুবু এবার যেন রাগে ফেটে পড়লো বলল, বেশি কথা বলবা না আমি যা করবো সেইটাই ঠিক! আর কাদিররে কিছু বইল্যা লাভ নাই… সে আমারে ছাড়া কিছু বুঝে না। বলে আবার সেই কুটিল হাসি দিলো।রানু এবার বুবু হাসির অর্থ বুঝলো।

রানুর মন ভিষন খারাপ হলো… মনটা তার কেমন কুডাক ডাকতেছে…রানুর সব শখ কোথায় উধাও হয়ে গেলো।এর মধ্য এক রাতে রানু বারান্দায় বসা বুবু আর কাদিরের ফিস ফিসিয়ে কথা বলা শুনতে পেলো। রানু বারান্দার যাওয়ার
দরজার আড়ালে দাঁড়ায়ে শুনলো… বুবু বলতেছে,

আমি তো বাজা… কোনদিন বাচ্চা হইবো না।রানু শুনে হতভম্ব এ কথা তো এ বাড়ির কেউ তাকে বলে নাই।তারপর ভেসে এলো কাদিরের গলা, বলল, আমি তো তোমারে ছাড়া কিছু বুঝি না। তোমার পরিকল্পনা মতই বিয়া করলাম। এখন নিজের সন্তান দেখে বুঝি সন্তানের মায়া কারে বলে।বাচ্চার দিকে তাকাইলে দুনিয়া ভুইল্যা যাই। ওদের কথা শুনে রানু কেমন মাথা ঘুরতেছে।

এবার বুবু বলল,এখন দেখো আমার কোল জুইড়া আমাদের সন্তান খেলা করো!ওরে এবার তুমি তালাক দিবা।বাবুটা এখন আমার কোলে খুব ভাল থাকে। সারাদিন তো আমিই রাখি। তোলা দুধও খাইতেছে! এখন আর কোন সমস্যা নাই! কাদির বলল,কিন্তু তালাকের কারনটা কি বলুম? বুবু হাসির শব্দ আসলো আরে বুদ্ধু লজিং মাষ্টার কি আর সাধে ছয় মাস ধইরা রাখছি! বলবা লজিং মাষ্টারের সাথে পালানোর সময় ধরা পরছে বাচ্চারে রাইখে… এমন মেয়ে মানুষরে কে রাখবো? আর বাচ্চা দেওয়ার তো প্রশ্নই নাই। এরপর বাচ্চা রাইখ্যা ওরে বিদায়!

রানু পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গেলো। ও টলতে টলতে ঘরে আসলো।সব পরিষ্কার … বুবুর কুটিল চালে ও আটকে গেছে।এভাবে কয়দিন পার হলো। রানুর এখন গলা দিয়া ভাত নামে না। যে রানু খাবার পাগল সে খেতে পারে না। ঘুমাইতে পারে না! সাজগোজ তো দুর। খালি বাবুকে দেখে আর কাঁদে ! কেউ আসলে চোখ মুছে ফেলে।মায়ের মত পৃথিবীতে সন্তানকে কেউ ভালবাসতে পারে না। কেউ না!রানু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

আজ রাতে রানু বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে বড় একটা ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। বাড়ি শুদ্ধ সবাই ঘুম।ও যাচ্ছে ঢাকা শহরে… ওর একমাত্র সই-য়ের বাড়ি। তার সই বড় ঘরের মেয়ে … বিয়ে হইছে বড় ঘরে। রানু বলছে তুই যে কাজ করতে বলবি.. আমি তাই করুম! তুই শুধু আমাকে আশ্রয় দে! সই ফোনের ওপাশ থেকে বলল, চলে আয়… বাকিটা আমি দেখবো!

রানু উর্ধশ্বাসে রেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছে…ও যাচ্ছে এক অনিশ্চিত জীবনের দিকে… কতদিন সইয়ের কাছে থাকতে পারবে জানে না! কিভাবে জীবন চলবে জানে না! শুধু জানে এ সন্তান তার বুক জুড়ে থাকবে…তার নাড়ি ছেড়া ধন! সন্তানের মায়া এ পৃথিবীতে সব চাইতে বড় মায়া! যার কোন আর পার নাই! কাদিরের কাছ থেকে বাচ্চা নিয়া গেলো কাদিরও শাস্তি হয়ে যাবে আর সাথে কুটিল মহিলার স্বপ্ন ভঙ্গ হবে ।এদের উচিত শাস্তি হবে।

ভোরের ট্রেনে রানু বাচ্চা নিয়ে উঠে পড়লো! ট্রেন ছুটে চলছে

গন্তব্যের উদ্দেশ্যে! ধীরে ধীরে সকাল হচ্ছে… সকালের কোমল সোনালি রোদের দিকে তাকিয়ে রানুর মনে হলো রাত শেষে সকাল হয়… ভয় পেলে চলবে না! সে তো একজন মা! একজন মা সন্তানের জন্য সব পারে! সব….

- Advertisement -

Read More

Recent