বৃহস্পতিবার - জুলাই ১৮ - ২০২৪

মিতা হক : ‘পণ্ডিত স্যার’-এর কন্যাদ্বয়ের একজন

মিতা হকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই

রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতে মুগ্ধ হই আমার বাল্যকালের দুই শিল্পীর কণ্ঠে গান শুনে। নিভা প্রতিভা পিঠাপিঠি দুই বোন। শতবর্ষ পুরনো পঞ্চখণ্ড হর গোবিন্দ হাইস্কুলের সংস্কৃতের শিক্ষক ‘পণ্ডিত স্যার’-এর কন্যাদ্বয়। এই দুই বোন বিয়ানীবাজার সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রী। আমার সহপাঠী। আমাদের স্কুলের ক্লাস শেষে প্রায়শই গানের আয়োজন হতো। শেষ ঘন্টা বাজার আগে সাধারণত শহীদ স্যার গানের জন্য অনুরোধ করতেন। শহীদ স্যার ছিলেন ইংরেজির শিক্ষক। পরবর্তীতে তিনি আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন।

একেবারে শেষ ক্লাস পড়ানো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ স্যার গাইতে উচ্ছুক এবং কণ্ঠও মধুর এমন কাউকে গান গাইতে অনুরোধ করতেন। ‘ বুকটা ফাইট্ট্যা যায় ‘ ‘রঙছটা জিন্সের পেন্ট পড়া’ এমন ধরনের গান তখন ছিল না। তখন কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, আব্দুল লতিফ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল অথবা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ গীতিকারদের লেখা বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠের গানই মানুষকে গাইতে শুনতাম বেশী। সেইসব গানের বাণীতে ও সুরে এক ধরনের মুগ্ধকরণ জাদু ছিল। যে কেউ গাইলেই এক নিমগ্নতা নেমে আসতো।

- Advertisement -

প্রাণের গভীরে গিয়ে কেউ যেন ছোঁয়া দিয়ে আসতো। শহীদ স্যারের অনুরোধে ক্লাসের সহপাঠীদের কণ্ঠে গান শোনে আমাদের কক্ষ ভর্তি ক্লাসেও নিরবতা নেমে আসতো। এরকম নিরবতা ভরা ক্লাসের শেষ শিল্পীদ্বয় ছিল নিভা প্রতিভা। যেন কোন গানের আসরের শেষ সেরা শিল্পীদ্বয়ের পরিবেশনা। পাশাপাশি বসা পরস্পরের দিকে চেয়ে কানে কানে পরামর্শ করে নিভা প্রতিভা যুগল কণ্ঠে গাইত- ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে / ও বন্ধু আমার! তারপর আরো গান। আরো। আরো! মনে হতো সত্যি কেউ আমাকে ডাকছে তাকে নিয়ে আসার জন্য। যে আমাকে বন্ধু ভাবছে। কিন্তু কল্পনায় কোন বন্ধুর মুখের ছবি আঁকতে পারতাম না। তবু মনের ভেতরে এক অপূর্ণ বন্ধুর রূপটি আসা যাওয়া করতো। জানতাম না, কে সে! এই না জানার এক যন্ত্রণা অনুভব করতাম। অনুভব করতাম এই যন্ত্রণায়ও এক মধু আছে। যা জিহ্বায় নয়, মর্ম দিয়ে উপলব্ধি হয়।

বাল্যকালে শোনা গান নিভা প্রতিভার কণ্ঠের অনুরণন এখনো আমার কানে বাজে। বেঞ্চের উপরে পাশাপাশি বসা এই দুই বোনের মুখের ছবিটিও আমি দেখতে পাই। লতার মতো হালকা পাতলা শরীর। বিনীত মুখে লজ্জা মাখানো। যে কোন মানুষ দেখামাত্রই নিভা প্রতিভাকে আপন বোনের অধিকার দেবেন তৎক্ষণাৎ। রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি আমার প্রথম গোপন অব্যাখ্যাত ভালোবাসা ভগ্নিসম নিভা প্রতিভার কণ্ঠে গান শোনেই৷ তারপর কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অন্যান্য শিল্পীদের কণ্ঠে গান শোনে এই ভালোলাগা বাড়তেই থাকে।

আমার বাল্যকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামছুলের এক বন্ধুর নাম বাবু। শামছুলের এক বন্ধুর বন্ধু বাবু ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পর বাবু এসেছে তার নানা বাড়ির বন্ধুর এখানে বেড়াতে। সে বাবুকে নিয়ে এসেছে শামছুলের বাড়িতে পরিচয় করিয়ে দিতে ও বেড়াতে। শামছুল বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পিএইছজি হাইস্কুলের টিলায় আমরা এক বিকেলে পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বাবুর গায়ে লাল টকটকে পাঞ্জাবি। সেই পাঞ্জাবিতে হাতে কাজ করা ফুল। গলার কাছে সুন্দর করে কলার দেওয়া৷ পাঞ্জাবির হাতা কনুইয়ের কাছে গুটানো। সেই সময় আমরা কলার দেওয়া পাঞ্জাবি বড় বেশী দেখিনি৷ তার উপর লাল শক্ত সুতির কাপড়। তাকে এই পোশাকে দেখেই আমার অন্যরকম মনে হলো। তার ঘাড়ের উপর উপচে পড়া চুল। চিরুনি নয়, অবিন্যস্ততায় প্রতিনিয়ত তার হাতের আঙুল দিয়েই চুলের শৈল্পিক শাসন। তার চোখের নিচে কালো দাগ। নির্ঘুম রাতের চাবুকের চিহ্ন।

হাতের আঙুলে জ্বলা বেনসন সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বাবু পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে থাকে। আমাদের সঙ্গে থেকেও সে দূরের আকাশে কোথাও খুঁজে বেড়ায় অদৃশ্য কারো ছবি। বাবুর এই অন্যমনস্কতা আমার নজর এড়ায়না। সন্ধ্যার পর আমরা শামছুলের বাড়িতে যাই। চা নাস্তার পর বাবু ক্যাসেট প্লেয়ারে ঢাকা থেকে তার সঙ্গে করে নিয়ে আসা একটি গানের ক্যাসেট বাজাতে অনুরোধ করে। ক্যাসেটটি ভরে প্লেয়ার নবে চাপ দিতেই শুনলাম – ‘ অরূপ তোমার বাণী / অঙ্গে আমার, চিত্তে আমার মুক্তি দিক সে আনি / অরূপ তোমার বাণী…।’ একি গান, নাকি গানের আড়ালে জীবনের গভীর ভাবনার সুরারোপিত অনুভবের ছবি! এই জন্যই কি বাবুর প্রতিনিয়ত কাউকে খুঁজে বেড়ানো। অদৃশ্য সুন্দরের কাছে সত্যের সন্ধান। অরূপের কাছে নিজের অদেখা রূপের পিয়াসী মনের একান্ত নিবেদন! আমি এসবের কিছুই জানি না। কিছুই বুঝিনা। শুধু জানি বাবুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে আবিষ্কার। আর রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে এক অন্যরকম বন্ধু বাবুকে!

বাল্যকালে নিভা প্রতিভার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান শোনে যে ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল, বাবুর সঙ্গে পরিচয়ের পর সেই রবীন্দ্রনাথের গানই আমাকে ফেলে দিয়েছে একাকীত্বের মধুর যন্ত্রণায়। শুধু মধুর যন্ত্রণা বললেও কম বলা হবে৷ বাবু যেন রবীন্দ্রনাথের গান শুনিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে এক অজানার মহাসাগরে। সাঁতার না জানা আমিও চেষ্টা করি উপলব্ধির সাগর পার হয়ে অনুভবের তীরে উঠতে। যতই চেষ্টা করি এই সাগর পাড়ি দিতে, ক্রমে তার সম্প্রসারণ হয়। আমিও ঝাঁপিয়ে পড়ি আরো গভীরে গিয়ে অনুভব করতে এর তলদেশে লুকিয়ে থাকা নুড়ি ও মণিমালা। অথচ কী আশ্চর্যের বিষয় যে, রবীন্দ্রনাথের গানের ভিতর লুকিয়ে থাকা এই মণিমাণিক্যাদি স্পষ্ট অনুভব করা যায়, কোন কোন শিল্পীর কণ্ঠে, রবীন্দ্রনাথের গান শোনেই! হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, সাগর সেন সহ আরো আরো কত কত নাম৷ মিতা হকের কণ্ঠে এই মণিমাণিক্যের ঐশ্বর্য পাওয়া যেত। কত অনায়াস তাঁর গায়কী, অথচ, কত কঠোর রেওয়াজ ও আরাধনার শাসনের সময় সেই গানের জন্য ব্যয়িত! কেবল সাধনা ও রেওয়াজ করলেই কি একজন মিতা হক হওয়া যায়? নাকি সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে আলাদা উপাদানে তৈরি করেন বলেই কেউ একজন মিতা হক হতে পারেন! আমি আসলে কিছুই জানি না! এটুকু বুঝি, কিছু অজ্ঞানতার জন্য লজ্জা হয় না!
মিতা হকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent