শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

আগলে রেখো বুকে

আগলে রেখো বুকে

রাত চারটার দিকে কলিংবেলের আওয়াজ কর্নকুহরে হানা দিলো পলকের। পলক তখন কাঁচা ঘুমে আচ্ছন্ন। খানিক আগ অব্ধিও সে আর মারজিয়া জেগে ছিলো। পলক বলেকয়ে তাকে রুমে পাঠিয়েছে। অতঃপর সে রুমে এসেছে। দ্বিতীয়বার কলিংবেলের আওয়াজ কানে আসতেই উঠে বসলো পলক। গায়ে ওড়না জড়িয়ে বেড়িয়ে এলো সে। মারজিয়া কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? হয়তো! নাহলে এতক্ষণে ছুটে আসতেন তিনি। পলক ভাবলো ডাকবে একবার। অতঃপর মনে পড়লো, মানুষটা সারাদিন আজ অনেক কাজ করেছে। একটু আগেও ঘুমে টুলছিলেন তিনি। নিচে নামে পলক। ওপাড়ের লোকটার অভিধানে ‘ধৈর্য’ বলতে কোন শব্দ নেই বুঝি। অনবরত কলিংবেল চেপেই চলেছে।

পলক দ্রুত ছুটলো দরজা খুলতে। দরজার সামনে যতেই ভয়কাতুরে পলকের হৃদপিণ্ড দাপাতে লাগলো। তার কেন জানি ভয় হচ্ছে! আশ্চর্য! ভয়ের কি আছে? নাকি অস্বস্তি হচ্ছে? পলক ধীর গতিতে দরজা খুলে। খুলতেই দেখতে পায় একজন সাদা চামড়ার বলিষ্ঠ দেহের পুরুষকে। তার কপালখানায় বিরক্তির ছাপ। পরপর তিনটে ভাজ পড়েছে সেখানে। বোঝা যায়, তার বিরক্তির পারদ ম্যাক্স লেভেলে। হাতে অনেকগুলো শপিং ব্যাগ এবং একটি লাগেজ। পলক’কে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে কুঁচকানো ভ্রুযুগল আরও একটু বাঁকলো তার। বাজখাঁই কন্ঠে বলে ওঠে লোকটি,
‘এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ভেতরে যেতে দেবে?’

- Advertisement -

ভাবনার সুতো কাটলো পলকের। শুকনো ঢোগ গিলে দ্রুত এক সাইডে সরে গেলো পলক। কিন্তু লোকটির ভ্রুযুগল সোজা হলো না। ফলার মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পলকের দিকে আবারো তাকালো রিহান। পলক এবার সত্যিই ভয় পেল। এভাবে তাকিয়ে কেন লোকটা? আবার কি ভুল করলো সে? প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো রিহানের মুখপানে। গজগজ করে উঠলো রিহান,
‘ব্যাগগুলো কে নেবে?’

পলক চমকালো। ব্যাগগুলো তার দিকে এগিয়ে দিতেই রিহানের দিকে তাকানোরত অবস্থায় সবগুলো ব্যাগ হাতে নিলো পলক। আকস্মিকতায় পড়ে যেতে নিচ্ছিলো পলক। এতো ভারী! ব্যাগগুলো পলকের হাতে দিয়েই রিহান গটগট করে ভিতরে চলে যায়। পলক কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রয় সেখানে। কি হলো কিছুই যেন তার মস্তিষ্কে ঢুকছে না।

রিহান লাগেজ পাশে রেখে সোফায় বসে। খুব টায়ার্ড তার। শার্টের বোতামদুটো খুলতে খুলতে বলে,

‘ওতে তোমার জন্য কোন গিফট্ নেই। আম্মু জানায়নি যে সে নতুন সার্ভেন্ট রেখেছে। জানলে তুমিও কিছু না কিছু পেতে।’

বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো পলক। সার্ভেন্ট? কে? পলক? পলক বিহ্বল নয়নে নিজের শরীরে নিজেই চোখ বোলায়। তাকে কোন এঙ্গেলে কাজের মেয়ে মনে হচ্ছে লোকটার?

রিহান নিজের শরীর এলিয়ে দেয় সোফায়। চোখদুটি মুদে আবারো বলে ওঠে,

‘ব্যাগগুলো সোফায় রেখে এক গ্লাস ঠান্ঠা পানি নিয়ে আসো তো। কুইক!’

পলক তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটা সত্যিই তাকে কাজের মেয়ে ভাবছে! এসব তো পলক এমনিতেও করতো। এমনকি, খাবার গরম করেও বেড়ে দিতো। মারজিয়া তো তাকে বলেছিলেন তিনি জেগে থাকলে কি কি করবেন! কিন্তু তাই বলে প্রথম দেখাতেই রিহানের তাকে ‘কাজের মেয়ে’ মনে হতে হবে? কিন্তু, কাজের মেয়েই বা কেন? পলক ব্যাগগুলি সোফায় রেখে রান্নাঘরে যায়। ফ্রিজ থেকে পানি বের করে গ্লাসে করে নিয়ে আসে। তখনো সেভাবেই বসে রিহান। তার হাবভাব বিদেশিদের মতো। শুধু হাবভাব নয়; যেন সয়ং বিদেশি কোন যুবক পলকের সামনে হাত-পা ছড়িয়ে বসে। বলিষ্ঠ দেহে সাদা শার্ট’টা আঁটসাঁটভাবে শরীরে লেগে রিহানের। সামনের দুটো বোতাম খোলা। চুলগুলো এতো ছোট! বাংলাদেশি ছেলেদের মাথায় এমন ছোট চুল খুব কমই দেখা যায়। হয়তো বিদেশি কালচার। পলকের হুট করে সিয়ামের কথা মনে পড়ে। যদিও ভালোমতো কখনো তাকানো হয়নি; কিন্তু তার চুলগুলোও বেশ বড়।

‘আপনার পানি।’ বললো পলক।

রিহান সোজা হয়ে বসে। পলকের চোখে চোখ রেখে হাত থেকে পানি নেয়। পানিটুকু শেষ করে গ্লাসটা আবারো পলকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,’তুমি ভীষণ স্লো। পর্যাপ্ত ট্রেইন প্রয়োজন। ডোন্ট ওয়ারি, আই উইল টিচ্ ইউ প্রপারলি।’

পলক কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। কথাগুলো আঁটকে রইলো কন্ঠনালিতে। হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে নতজানু কন্ঠে বললো পলক,
‘খেতে আসুন, আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি।’

‘উম, তুমি কথাও বলতে পারো?’ ভারী অবাক হওয়ার ভান ধরে কথাটুকু বললো রিহান। ফের বললো ,
‘আ..কিন্তু আমার খিদে নেই। আম্মু কি ঘুমিয়ে পড়েছে?’

পলক মাথা দোলালো শুধু। রিহান বললো,’সকালে জানিয়ে দিও আমি এসেছি।’

হাই তুলতে তুলতে উঠে দাঁড়ায় রিহান। দো’তলার দিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েও কি যেন ভেবে থামলো রিহান। ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘বাই দা ওয়ে, নাম কি তোমার?’

আপাদমস্তক পলক রিহানের প্রশ্নে নিজের নাম ভূলে বসলো। মস্তিষ্কে ভীষণ চাপ প্রয়োগ করে ছোট করে বললো,
‘পলক।’

ফের ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠে রাহিনের। গন্তব্যের দিকে হাঁটা ধরে বিরবির করে বললো,’পলক? উইঙ্ক! হাউ স্ট্রেঞ্জ!’

পলক সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। লোকটার কি ভ্রু বাঁকানোর রোগ আছে নাকি? কি হলো, কেন হলো মাথায় ধরছে না পলকের। ব্যাগগুলোর দিকে চোখ পড়লো তার। এগুলো সে কি করবে? এগুলো বরং এখানেই থাক। সকালে নাহয় মারজিয়া এগুলোর ব্যাবস্থা করবেন। ভাবতে ভাবতে পলক উপরে উঠে এলো। কাল সাইফুল উদ্দিনের সাথে কথা বলতে পারেনি সে। ঠিক করলো, আজ নিজে থেকেই ফোন দেবে পলক।

ক্লাস শুরুর এখনো আঠারোমিনিট বাকি। তার আগেই অর্ষা আর পলক পা রাখলো ক্যাম্পাসে। এবং যা হওয়ার ছিলো, তাও হলো। দেখা হলো পলকের সিয়ামের সাথে। ঠিক আগের জায়গাতে নিজের গ্যাং নিয়ে বসে সে। পলক আজও ঠিক করলো সোজা নিজের ক্লাসে চলে যাবে। কিন্তু মাঝখানে বাঁধ সাধলো অর্ষা। বললো,

‘কলেজে আসো কি শুধু ক্লাস করতে? আমাদের কতো বড় ক্যাম্পাস। কত স্টুডেন্ট আড্ডা দিচ্ছে চারিদিকে। আর তুমি? গেটে পা রেখেই বলো ক্লাসে যাবে! কি হবে একটু বসলে? সিয়াম ভাইয়াকে এতো ভয় করো!’

একটানা কথাগুলো বলে থামলো অর্ষা। দেখলো, পলক অনুনয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল অর্ষা। পলক’কে পাত্তা না দিয়েই তার হাত ধরে শিমুল গাছের নিচে নিয়ে গেলো। সেখানে ঘাসের উপরে বসে পলক’কে ইসারা করলো বসতে। পলক উপায় না পেয়ে বসলো। পলক জানে, তারা যেখানে বসেছে এখান থেকে স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পাচ্ছে সিয়াম। অস্বস্তি’র মাত্রা বাড়তে লাগলো পলকের। এরিমধ্য তাদের ক্লাসমেট দুজন ছেলে এসে যোগ দিলো তাদের মাঝে। পলক চেনেনা তাদের। অর্ষা চেনে। কে কখন র‍্যাগ খেলো, কার থেকে খেলো; এসব আলোচনা চললো বেশ কিছুক্ষণ। পুরোটা সময় পলকের কাটলো অস্বস্তিতে। পলক জানে, যে আঁখিজোড়া ভার্সিটিতে পা রাখতেই তাকে প্রথম দেখেছে, সে আঁখিদ্বয় এখনো তার দিকেই স্থির। সাহস যুগিয়ে পলক সিয়ামের দিকে তাকালো একবার। কোন ভুল নয়! সিয়াম এখনো তাকিয়ে তার দিকে। তবে তার চোখদুটি অন্যরকম।

ক্লাস শেষ করে বের হতেই যে সিয়ামের সামনে পড়তে হবে, কল্পনায়ও ভাবেনি পলক। না, সিয়ামের সামনে সে যায়নি। বরং আজ সিয়ামই তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্ষাও সিয়ামকে দেখে একপা-দু’পা করে সটকে পড়লো। বাঘের সামনে একা দাঁড়িয়ে রইলো পলক। শুকনো ঢোগ গিলে পলক। একফোঁটা পানি প্রয়োজন তার। ধিরে ধিরে চলে যাচ্ছে সবাই। ফাঁকা হচ্ছে চারপাশ। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে পলকের। হৃদপিন্ড এতো দ্রুত পাম্প করছে! যেন কয়েকহাত দূরে থাকা সিয়ামও সে আওয়াজ শুনতে পারছে। পলক এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে। সামনে তাকানোর সাহস কি পলকের আছে? নেই!

কলাহল যুক্ত চারপাশ কিছুটা নিরব হতেই পকলের কানে হানা দিলো ঠান্ডা একটি কন্ঠস্বর,
‘কোন ছেলের সাথে তোমার কথা বলাটা আমার পছন্দ নয়।’

‘কোন’ শব্দটি শুনতেই সর্বশরীর ভয়ে ঝাঁকি দিয়ে ওঠে পলকের। পলক’কে কেঁপে উঠতে দেখে ছোট একটি শ্বাস ছাড়ে সিয়াম। অন্যদিকে তাকিয়ে চুলে হাত গুজে অস্ফুটস্বরে বলে,’যাও এখন।’

বাড়ির সামনে রিক্সা থেকে নামলো পলক। ভারা মিটিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো রিহানের সাথে। হিরো সেজে কোথাও বেরোচ্ছিলো সে। পলক’কে দেখেই রিহান থামলো। অগত্যা পলক’কেও থামতে হলো। রিহান ভারী বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘বিলিভ মি! আমার লাইফে তোমার মতো স্টুপিড আমি কখনো দেখিনি। কোন মেয়েকে সার্ভেন্ট বললে সে নিজের পরিচয় না বলে চুপ করে থাকে?’

সিয়ামের ভয়, রিহানের অপমানে পলক কেঁদে ফেললো তৎক্ষনাৎ। রিহানকে পাশ কাটিয়ে পলক ছুঁটে ভেতরে চলে যায়। ফেলে যায় রিহানের বিষ্ময়ভরা দৃষ্টি!

- Advertisement -

Read More

Recent