শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

বুকের ব্যাথায় ৯১১ হতে পারে এক বিরাট নেয়ামত

বুকের ব্যাথায় ৯১১ হতে পারে এক বিরাট নেয়ামত

রবিবার সকাল। কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম, দুপুর বারোটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত ওভারটাইম কাজ। শার্ট পড়ার সময় মনে হলো বুকের একদম মাঝখানটা একটু যেন চাপ চাপ লাগছে।

পিছন ফিরে দেখা:
আগের দিন সন্ধ্যায় একটা তেলে ভাজা খাবার খেয়েছিলাম। ঘুমানোর আগে বুক গলা একটু যেন জ্বলছিল, তৈলাক্ত খাবার খেলেই একটু চাপ চাপ ব্যাথা হয়, বুক গলা জ্বলে। এমনটা মাঝে মধ্যে হয়, এন্টাসিড জাতীয় দুটো ট্যাবলেট খেলে এমনিতেই সেরে যায়।
সকালের বুক ব্যাথাটা সেরকমই মনে হচ্ছিল। গ্যাসের ব্যথা নাকি বুকের মাঝখানে হয়, আর হৃদরোগের ব্যথা বুকের বাম পাশে হয়; এটাই জেনে এসেছি এতকাল।

- Advertisement -

ব্যথার তীব্রতা :
তিনতলা থেকে সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে ব্যথা যেন একটু বেড়ে গেল। সকাল ১০:৪০ মিনিট। নিচে নেমেই একটু ঠাণ্ডা পানি খেলাম। কাজ হচ্ছে না, শুয়ে পড়লাম সোফায়। দুইটা টামস এনে দিল প্রিয়তমা স্ত্রী – কাজের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য খাবার তৈরীতে ব্যস্ত সে। মেঝ রাজকন্যাকে বললাম সিলিং ফ্যান অন করে দেবার জন্য।

অবস্থার অবনতি:
বুঝতে পারলাম ঘামছি। বউ পাশে এসে বাতাস করতে লাগলো। দোয়া, এস্তেগফার পড়ছি। বুকের ব্যথার সঙ্গে হাত পায়ে অন্য রকম অবস অবস অনুভুতি হচ্ছিল – আর দেরি নয় – ৯১১ এ ফোন করতে বললাম। পকেট থেকে হেলথ কার্ড বের করে নিতে বললাম। দোয়া পড়ছি, অনুভূতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ৯১১ থেকে এসপিরিন খাইয়ে দিতে বললো।

৯১১ :
এগারোটায় ইমারজেন্সি মেডিক্যাল সার্ভিস (EMS) চলে এলো বাসায়। ওই মুহূর্তে ব্যথা একদম কমে গেল। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতেই ফিরে এলো তীব্র ব্যথা। হটাৎ গলার কাছে কিসের যেন চাপে তীব্র ব্যথায় জ্ঞান ফিরে এলো! তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ফিরে এলো ব্যথা আবার। EMS জানিয়ে দিল, হাসপাতালে নিতে হবে। দুই কদম হাঁটার পর, তুলে নিল হুইল চেয়ারে, সেখান থেকে স্ট্রেচার।

শুনতে পেলাম, সিভিয়ার হার্ট এ্যাটাক, ওপেন হার্ট সার্জারী করতে হতে পারে!
এম্বুলেন্সে শুয়ে শুয়ে তাদের তড়িৎ গতিতে চিকিৎসা আর আয়োজন শুনতে পাচ্ছিলাম। ডাক্টার আর অপারেশন থিয়েটার তৈরী রাখতে বলছে তারা। কথা বলছে অনর্গল আমার সঙ্গে, যেন ঘুমিয়ে না যাই।

জিহ্বার নিচে বেশ কয়েকবার কি যেন (Nitro Pumpspray) স্প্রে করছিল। দুটি করে এসপিরিন খাইয়ে দিল বেশ কয়েকবার। এর মাঝেই চারবার ব্যথা উঠেছিল, হাসপাতাল পৌঁছুতে একদম সেরে গেল ব্যথা – এসপিরিন আর স্প্রে হতে পারে কারণ।

ব্রাম্পটন সিভিক হাসপাতাল:
পৌঁছে গেলাম ১১:২৫ মিনিটে। সরাসরি অপারেশন থিয়েটার। ডাক্টার – নার্স কে EMS জানিয়ে দিল সবকিছু।

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল নিজেরই। এটা হার্ট এ্যাটাক!!!!

অপারেশন থিয়েটার:
স্ট্রেচারে থাকা অবস্থায় ডাক্টার, নার্স সবাই নিজেদের পরিচয় তুলে ধরলো। ওদিকে আমি মনে মনে পড়ছি সূরা বাকারার দশ আয়াত (প্রথম চার, আয়াতুল কুরসী আর তার পরের দুই আয়াত, এবং শেষের তিন আয়াত), এস্তেগফার আর কলেমা শাহাদাত। মনে আছে শেষের দিকে কলেমা শাহাদাত এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। দেয়াল ঘড়িতে শেষ সময় দেখেছিলাম ১১:৩৫ মিনিট।

অপারেশন সাকসেসফুল:
ঘুম ভাঙলো ১:৩০ মিনিটে। সি সি ইউ তে আমি। পাশে বউ আর ছেলে, নার্স। তখনও জানি না কি হতে যাচ্ছে! নার্স জানালো একটা stent লাগানো হয়েছে। একদিন কিংবা দুইদিন পর আর একটা লাগানো হবে।
বউ ছেলে বললো, তারা অপেক্ষা করছিল, কখন ডাক্তার আসবে, অপারেশন শুরু হবে। একসময় তারা অবাক বিস্ময়ে জানলো, আমি সি সি ইউ তে আছি, অপারেশন শেষ।

আলহামদুলিল্লাহ্! আলহামদুলিল্লাহ্! আলহামদুলিল্লাহ্!

ডাক্তারের অভিমত:
এই দেশের ডাক্টার সবাইকে এইরকম অনুপ্রেরণামূলক কথা বলে কিনা জানি না তবে আমাকে বললো :
এতো বড় অ্যাটাক এ এতো দ্রুত সামলে নেওয়ার ভাগ্য সবার হয় না। তুমি এক বিকেলের মধ্যেই যেন পুরো সুস্থ্য হয়ে উঠেছ। আমাদের কাছে মিরাকল মনে হচ্ছে!

আমি নিজেও অবাক, মনেই হচ্ছে না, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।

সবার দোয়া আর বিপদের মুহূর্তে আমার নিজের তসবিহ আমার দ্রুত আরোগ্য বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আমার সম্পর্কে বলি:
বয়স অর্ধশতক। জীবনে কখনও ধূমপান, অ্যালকোহল কিংবা কোনরকম ড্রাগের স্বাদ পাইনি। চা কফি তে তেমন অভ্যস্থ নই। বাসায় টিভি নাই যে অলস সময় কাটাবো। ইউ টিউব আর ফেসবুকের সময় হলো একমাত্র বিনোদন।
কাজের জায়গায় বসে থাকার সময় পাই খুবই কম, দৌড়াই সারাক্ষণ।

বাগান করা, মাছ ধরা, ঘুরে বেড়ানো, গ্রসারি আর এর মাঝে বাকি সময় ঘরে বাইরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার পিছনে সময় কেটে যায়। আর একটা সময় কাটে মসজিদ ভিত্তিক কাজকর্মে।
সামাজিক কর্মকাণ্ডে সুযোগ পেলেই অংশগ্রহন করি।

আমার রাজত্বের রানীর আছে বুটিক – মেয়েদের পোশাক আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবী , তাকে সহযোগিতা করা আর এক গুরুত্বপুর্ণ কাজ।

শারীরিক ভাবে হালকা পাতলা বলা যেতে পারে; ৫-৮” আর ৭৫ কে জি সেই কথাই বলে। অতিরিক্ত খাবার দাবারে অভ্যস্থ নই মোটেও।

হৃদরোগ সংক্রান্ত কোনরকম জটিলতা জানা ছিল না।

একমাত্র দুর্বলতা মিষ্টি জাতীয় খাবার!

ফ্যামিলি ইতিহাস :
বাবা জীবিত ছিলেন প্রায় ৯৩ বছর সুস্থ্যতার সাথে। বাবার সাইডে হার্ট এ্যাটাক এর কোন ইতিহাস জানা নাই। নিজেদের এবং ফার্স্ট কাজিনদের কেউ সিগারেট কিংবা অ্যালকোহল এ আসক্ত সেটাও জানা নাই।

তাহলে কোথা থেকে কিভাবে এলো হার্ট এ্যাটাক!!!!

আমার তকদিরে ছিল। অনেকেই বলবে, মাত্রাতিরিক্ত মিষ্টি খাবার মূল কারণ! কি জানি, সেটা হয়তো একটা সান্ত্বনার বাণী!

শানে নুযুল/ শেষ কথা : প্রচলিত বাম পাশের বুকের ব্যাথা একমাত্র হার্ট অ্যাটাকের চিহ্ন নাও হতে পারে। আর বুকের ব্যাথায় ৯১১ হতে পারে এক বিরাট নেয়ামত।

কানাডার চিকিৎসা ব্যবস্থা, চিকিৎসা সেবায় আবারও মোহিত হয়ে গেলাম! আলহামদুলিল্লাহ!

- Advertisement -

Read More

Recent