শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

জীবন

জীবন

আজ ভার্সিটিতে প্রীতির প্রথম দিন। ঢাকা শহরের এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে চান্স পেয়েছে সে। নাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। আজ প্রথমদিন, অথচ বড্ড বিষণ্ণ আর নিজেকে একা লাগছে প্রীতির। মন খারাপ করে বসে আছে। কারণ সে আসতেই চায়নি, তার বান্ধবী অর্নিমা তাকে জোর করে নিয়ে এসেছে।

কিছুক্ষণ পর ম্যাম আসলেন। প্রথমে নিজের পরিচয় দিলেন।

- Advertisement -

“আমি নাফসি চৌধুরী। সহকারী অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।”

এরপর সামনে বসা সবার পরিচয় নিতে শুরু করলেন তিনি। একটা মেয়ে পরিচয় দিতে গিয়ে বারবার কথা আঁটকে যাচ্ছিলো। শুনে বোঝাই যায় তার গলা শুকিয়ে আছে। পানি লাগবে। ম্যাম বললেন, তুমি বসো। একটু পানি খাও। ক্লাস শেষে তোমার পরিচয় নেবো।

পরিচয় পর্ব শেষ করে তিনি বোর্ডের কাছে গেলেন। লিখলেন, জীবন।

সামনে বসা সবার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের কাছে জীবনের অর্থ কি? জীবন মানে কি বোঝো?

কেউ কেউ হাত তুললো। বললো। ম্যাম শুনলেন। একটু পিছিয়ে ম্যাম বলা শুরু করলেন,

“আমার গ্রামের নাম রামনগর। পাবনা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। এই গ্রামেই এক মেয়ের জন্ম হয়। নাম তমালিকা। সবাই তমা বলে ডাকে। মেয়েটা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। মায়াবী চেহারা, শ্যামলা বর্ণের এই মেয়েটা সবার আদরের ছিলো।
তার বয়স যখন ছয় বছর, তখন সে ব্যাড টাচের স্বীকার হয়। স্বীকার হয়েছিলো অপরিচিত কারো কাছে নয়, নিজের আপন খালুর কাছে।

মেয়েটা বড় হতে থাকে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে যুবক, বৃদ্ধ, সবাই আড়চোখে তাকিয়ে থাকে। যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে। মেয়েদের খুব অদ্ভুত একটা শক্তি আছে। সৃষ্টিকর্তা তাদের দিয়েছেন। সেটা হচ্ছে, কারো চোখ আর তাকানো দেখে বলে দিতে পারে কোনটা লোলুপ দৃষ্টি আর কোনটা সম্মানের!!

তমা যখন ক্লাস এইটে ওঠে, তখন তার বাবা মা’রা যায়। চার ভাইবোনের মধ্যে তমা ছিলো তিন নম্বর। বড় দুই ভাই, আর সব ছোট এক বোন। বড় ভাই বিয়ে করে আগেই আলাদা হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম দেখলেও এখন আর দেখেনা।

তমার বাবা মা’রা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরে তার মেজো ভাই সালাম। ইটের ভাটায় কাজ করে সে। প্রতিদিন কাজের জন্য যা পায়, তা দিয়ে সংসার মোটামুটি চলে যায়। তমার মা পাশের বাড়িগুলোতে কাজ করে দেয়। তাতে সামান্য কিছু টাকা, আর এক বেলার খাবার পায়।

তমা আর তার ছোটবোন পড়তে থাকে। কষ্ট হলেও চলে যাচ্ছিলো দিন। লেখাপড়ায় তমা খুব ভালো। আর চৌকস। ক্লাসে কোনোদিন প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। ওর ইচ্ছা ছিলো অনেকদূর পড়াশোনা করবে। কিন্তু এরমধ্যেই নেমে আসে দূর্ভোগ।

সালামের হার্টে সমস্যা দেখা দিলো। একদিন কাজ করতে গিয়ে বুকে ব্যথা ওঠে তার। আশপাশের সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিলেন হার্টে দুটো ব্লক। রিং পড়াতে হবে।

সব শোনার পর তমার পরিবারে কালো ছায়া নেমে আসে। তবুও দমে থাকার পাত্রী নয় তমা। সে শীতলপাটি বানানো শুরু করে। স্কুলে যাওয়ার সময় বাজারে বিক্রি করে। সেই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে আরো বেশি করে সরঞ্জাম কিনে আনে। দুই বোন এবং মা মিলে শুরু করে তাদের নতুন কাজ, শীতলপাটি বানানো।

ভালোই চলছিলো তাদের সংসার। পড়াশোনায় টান পড়ে তমার। কিন্তু ছোটবোন যাতে পড়াশোনা করতে পারে, সে ব্যবস্থা ঠিকই করে।

তমার বয়স এখন ১৭। উঠতি বয়স। যৌবনের প্রথম ধাপে পা দিয়েছে সে। সুন্দর, সুশ্রী, এবং নিদারুণ ভদ্র এক তমাকে সবাই ভালোবাসে। কিন্তু সমস্যা বাঁধে অন্যখানে। এলাকার মেম্বারের নজরে পড়ে তমা। সাক্ষাৎ চরিত্রহীনের তকমা গায়ে লেপ্টে বেড়ানো মেম্বারের জিভে জল আসে তমাকে দেখে। মুহুর্তের মধ্যেই কুপ্রস্তাব দিতে দেরি হয়নি তার।

ভয় পেয়ে যায় তমার পরিবার। মেয়েটা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। শীতলপাটি নিয়ে বাজারে বিক্রি করে তার ভাই সালাম। এভাবেই চলছিলো। বাড়িতে এসে ক্রমাগত হুমকি ধামকি দিতে থাকে মেম্বার। আবারো তাদের পরিবারে কালো ছায়া নেমে আসে।
তমার জীবনের এই বিষয়গুলো খুব নরমাল হয়ে গিয়েছিলো। যখনই জীবনকে একটু গুছিয়ে নিবে, তখনই নতুন সমস্যা এসে হাজির হয়।

মেম্বারের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাতারাতি তমার বিয়ে দেয় তার পরিবার। ভালোই যাচ্ছিলো দিন। তার মা আর ছোটবোন শীতলপাটি তৈরি করে, সালাম বাজারে বিক্রি করে। এদিকে সে সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

আসল সমস্যা দেখা দেয় বিয়ের ছয়মাস পর। সে জানতে পারে তার স্বামী নেশা করে, এবং প’রকীয়া করে। জানার পর তমা অনেক অনুরোধ করেছে এসব ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সে ছাড়েনি। উল্টো তাকে মা’রধর করে, এবং যৌতুক আনতে বলে। তমা তবুও মাটি কামড়ে পড়ে ছিলো।

প্রায় আড়াই মাস পরের ঘটনা। তমা রান্না করছে। হঠাৎ তার বর বাড়ি এলো। সাথে একটা মেয়ে। গায়ে নতুন শাড়ি জড়ানো। মেয়েটা আর কেউ নয়, তমার সতীন। সে দিনরাত কাঁদতে থাকে। তাকে দেখার কেউ নেই, শোনার কেউ নেই। সকালে কান্না করে ওঠে, রাতে কান্না করে ঘুমাতে যায়। এভাবেই চলছিলো।

বোনের এই দুঃখ সইতে না পেরে বাড়ি নিয়ে আসে সালাম। সাথে পনেরো দিন পর আসে ডিভোর্স পেপার। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে তমা। ছুটে যায় স্বামীর কাছে। পায়ে ধরে পরে থাকে। কিন্তু পাষাণ মন গলেনি। ফিরে আসতে হয় তাকে।

এবার সে নিজের সাথে যু’দ্ধ ঘোষণা করে। শীতলপাটি বিক্রির জমানো কিছু টাকা দিয়ে ছাগল কিনে। ভর্তি হয় স্কুলে। এরমধ্যে একবছর পার হয়ে গেছে। জীবনে আর কিছুই পিছে ফিরে দেখতে চায়না সে। শুধু পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। টিউশনি শুরু করে। ইচ্ছে ছিলো টাকা জমিয়ে ভাইয়ের চিকিৎসা করাবে। হয়নি। ভর্তির মাসছয়েক পরে সালাম মা’রা যায়। তমা আবারো ভেঙে পড়ে।

তখন তার পাশে দাঁড়ায় দীপ্ত নামের এক ছেলে। তমার ব্যাচমেট। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। তমাকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুজনের মধ্যে প্রণয় হয়। তবে বাধসাধে তমার অতীত। সব জেনে দীপ্ত পিছুটান নেয়। সে মুচকি হাসে। জীবন এমনও হয়?
অবশ্য এই দুঃখ তমাকে টলাতে পারেনি। বাবা হারানো, ভাই হারানো, ভাইয়ের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া, ডি’ভোর্স, অল্পবয়সে ব্যাড টাচ, মেম্বারের লোলুপদৃষ্টি, এগুলোই যখন এতদিন বাঁধা হতে পারেনি, দীপ্তের চলে যাওয়া সেখানে আহামরি কিছুই না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করে তমা লেকচারার হিসেবে যোগ দেন দেশের অন্যতম এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।”

এতদূর এসে থামলেন নাফসি চৌধুরী। তার চশমার কাঁচ ভিজে উঠেছে। চোখ মুছে সামনে তাকালেন। দেখলেন সবার চোখে পানি। একটু পিছিয়ে তিনি বোর্ডে লিখলেন, নাফসি চৌধুরী তমা।

পুরো ক্লাস থমথমে অবস্থা! এতক্ষণ কি তাহলে ম্যাম নিজের গল্পই করছিলেন? প্রফেসর বললেন, তোমরা যা ভাবছো তাই। এতক্ষণ আমি নিজের গল্পই করছিলাম। আমিই সেই তমা। যার জীবনে যু’দ্ধ ছাড়া আর কিছু নেই।

তিনি আরো বললেন, মনে রেখো, জীবনে বেঁচে থাকাটাই আসল। বাকি সবকিছু মিথ্যে, সবকিছু নকল, সবকিছু মরীচিকা। জীবন কোনোকিছুর জন্যই থেমে থাকেনা। একটা কথা মনে রাখবে, পুঁথিগত বিদ্যা আমাদের যা শেখায়, তা বড়জোর সাধুতা। কিন্তু জীবন যা শেখায়, তা মূলত বেঁচে থাকার লড়াই।

এবার তিনি সেই মেয়েটির দিকে আঙুল তুলে বললেন, তোমার পরিচয় দাও এবার।

শুরুতে যে মেয়েটির কথা আটকে যাচ্ছিলো, গলা ভারী হয়ে এসেছিলো, সেই মেয়েটিই এবার জোরেশোরে বললো, আমি কাজী প্রীতি। রসায়ন বিভাগ, প্রথম বর্ষ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

গতকাল রাতে প্রীতির ব্রেকাপ হয়েছে। তাই আজ তার একা লাগছিলো, ভীষণ একা। মনে হচ্ছিলো তার জীবন বোধহয় থমকে গেছে। তাই সে প্রথমদিন ভার্সিটিতে আসতে চায়নি। কিন্তু এখন সে জেনে গেছে, এগুলো কেবল জীবনের অংশ। অপরিহার্য কিছু নয়। জীবনের অপরিহার্য জিনিস হচ্ছে, লড়াই, যু’দ্ধ, বেঁচে থাকা।

- Advertisement -

Read More

Recent