শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

আমার লেখালেখি

আমার লেখালেখি

মনে পড়ল ২০০৮ সালে ফেসবুক একাউন্ট খুলেছিলাম। তখন সামাজিক মাধ্যম যে কি তাও জানতাম না । এখানেও যে আর্টিকেল লেখা যায় সেটা বুঝতে সময় লেগেছিল। লেখালেখি আমার নেশা, তবে একসময় খণ্ডকালীন পেশাও ছিল। নব্বইয়ের দশকে নিয়মিত বাংলাদেশের দৈনিকগুলোতে পপুলার আর্টিকেল লিখতাম, বিজ্ঞানের পাতা থেকে শুরু করে কৃষিভিক্তিক লেখা থেকে শিল্প সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য সবই নিয়েই লিখছি আশির দশকের সেই ছাত্র জীবন থেকে। এক সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন দূতাবাস থেকে প্রকাশিত উদয়ন পত্রিকাতে লিখতাম, দৈনিক সংবাদের চিঠি পত্রের কলামে সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই লিখতাম। দৈনিক সংবাদ তখন প্রগতিশীল পাঠকদের পত্রিকা ছিল ।

চিঠিপত্র কলামে নানা সমস্যা ও অসঙ্গতি নিয়ে টানা দশ বছর লেখার কারনে সংবাদের বিশিষ্ট কলামিস্ট সহযোগি সম্পাদক সন্তোষগুপ্ত আমাকে চিনতেন। একদিন বললেন চিঠিপত্র ছেড়ে দিয়ে আপনি আমাদের উপসম্পাদকীয় লিখতে পারেন, বিজ্ঞানের পাতায় লিখতে পারেন। উঠতি যুবক বয়সে এমন প্রস্তাবে আমি তো বাকরুদ্ধ হবার দশা। তখন প্রখ্যাত সাংবাদিক সোহরাব হোসেন রাজনৈতিক কলাম দেখাশোনা করতেন। তিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু প্রয়াত আয়ুব হোসেনের বড় ভাই। সোহরাব ভাই প্রথম আমার লেখা একটি উপসম্পাদকীয় সংবাদে ছাপেন। মনে পড়ল লিখেছিলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে। এরপর আরো অনেক লিখেছি। ভোরের কাগজে বিশাল একটা সময় ধরে লিখেছি। প্রথম আলোর সঙ্গেও দীর্ঘদিন সংযুক্ত ছিলাম।

- Advertisement -

লেখার জন্য যে পারিতোষিক দেয়া হয় সেটাও কখনও ভাবিনি। এটা পেতে শুরু করি দৈনিক সংবাদ থেকেই। খুব সামান্য রিম্যুনারেশন কিন্ত সেটার মর্যাদা ছিল আমার কাছে অনেক বড়। কারন আমি আমার ইন্টেলেকচুয়ালিটির বিপনন থেকে সেটা আমি পেয়েছিলাম। সেই টাকা অনেকদিন পর্যন্ত খরচ করিনি। মানিব্যাগে রেখে দিয়েছিলাম ,বের করে মাঝে মাঝেই দেখতাম আর ভাবতাম আমার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এই মুল্য দান অনেক গর্বের। এরপর নিয়মিত মাসিক রিম্যুনারেশন পেয়েছি।

এই যে লেখালেখি সেটা বাক্য বিন্যাস, বিষয়বস্তু ও সাহিত্য রসের রেসিপিটা আমার খুব ভাল করে শেখা ছিল। ভাল লেখার জন্য অনেক বই পড়তে হয়, ভেতরে জ্ঞানের অন্বেষা থাকতে হয়। তার সবই আমার ভেতর ছিল। একেক সময় মনে হত লেখালেখির জন্যই হয়ত আমার জন্ম হয়েছিল। এই একটি কাজ আমি ভাল পারি। আর কিছুই পারি না।

আশির দশকের শেষে দেশের তরুণ লেখক, সাংবাদিক, একটিভিষ্ট ,চিত্রকরদের নিয়ে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকার জগতে এক বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। কর্নেল কাজী শাহেদ , নাঈমুল ইসলাম খান , মতিউর রহমান প্রমুখ আধুনিক পাশ্চাত্যের ধারার দৈনিক আজকের কাগজ প্রতিষ্ঠা করলেন। অর্থ ও বেতন ভাতায় সাংবাদিক প্রদায়কের কাজ করেছিল ঢাকা ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতিশীল তরুন লেখকরা। সেখানে সংবাদের পাশাপাশি কার্টুন ও ইলাস্ট্রেশন আছে, শিল্প সাহিত্য আছে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন নিয়ে টিপস আছে। আহা যেন সাগরের সন্ধান পেলাম। দু হাতে লিখতে শুরু করলাম। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায় অথচ লেখালেখির উপর তেমন কোন চাপ নেই। একটা মধুর সময় ছিল তখন। আমার বন্ধুদের ভেতর বিসিএস দিয়ে আমলা হবার প্রতিযোগিতা অথচ আমি পত্রিকাতে লিখছি । জীবনের লক্ষ্য বলতে একজন লেখক হওয়া। আমার চিন্তা চেতনা থেকে উদ্ভূত কলমে লেখাগুলি ছাপার হরফে প্রতিদিন পাঠকদের কাছে চলে যাচ্ছে, এর চাইতে আনন্দ আর কি হতে পারে!

প্রবাসী হবার পর আমার লেখাতে বিরতি পরল। আর তখনই ফেসবুক আমাকে নিয়ে গেল লেখালেখির মহা সমুদ্রে। এই পড়ন্ত বয়সে আমার চিন্তা চেতনা জ্ঞান বয়সের সঙ্গে পরিপক্ক হয়েছে। অনেক বিষয়ের উপর বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট সক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্ত সমস্যা হয়েছে জীবিকা ও যাপিত জীবন। তার চেয়েও বড় সমস্যা অসহিষ্ণু কুপমুণ্ডুক নির্বোধ ধর্মান্ধরা। এরা যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ চায় না। লেখালেখির স্বাধীনতা মত প্রকাশের স্বাধীনতা জিনিসটা কি এরা বোঝে না। এদের যুক্তি দেবার ক্ষমতা নেই তবে বাঁধা দেবার শক্তি আছে। নানা প্রতিকুলতার ভেতর দিয়ে এদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাকে এগিয়ে যেতে হয়। কখনও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করি । নিজকে নিঃসঙ্গ মনে হয়। তবে এই নিঃসঙ্গতাকে আমি গর্বভরে অনুভব করি ।

বাংলাদেশের মানুষ বদলে গেছে, বদলে গেছে তাদের সেই আগের উদারতা, মত প্রকাশের অধিকারকে মেনে নেবার প্রবনতা । এদের বেশিরভাগই এখন একটি অলৌকিক বইয়ের পাঠক। সবাই যেন একটা ধর্মের গড্ডালিকা প্রবাহের দিকে ছুটে চলেছে বিরামহীন। আমার মত মানুষেরা সেখানে ব্যতিক্রম।

- Advertisement -

Read More

Recent