ছবির মানুষের ছবি হয়ে যাওয়া

সদ্য লোকান্তরিত আলোকচিত্রী দীপক সাহা

আলোকচিত্র শিল্পীদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার এক জীবনের কতো কতো ঐতিহাসিক এবং স্মৃতিময় মুহুর্তের ছবি যে আমি পেয়েছি তাঁদের কাছ থেকে তার কোনো হিশেব নেই। দেশের নবীন প্রবীন প্রায় সব আলোকচিত্রির সঙ্গেই আমার সখ্য ছিলো। জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ বহু ছবি আমি উপহার পেয়েছি তাঁদের কাছ থেকে। যে ছবিগুলোর অন্যতম চরিত্র আমি।

এমনকি আমার চেনা জানা নয় এমন তরুণ আলোকচিত্রিরাও আমার জন্যে অত জরুরি বহু ছবি ভালোবেসে আমাকে দিয়ে গেছেন। এমন কি সেই ছবির মিনিমাম প্রিন্টিং কস্‌ট্‌ও দিতে পারিনি কাউকে। দেয়ার চেষ্টা করলে সেই প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভালোবাসাকে টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

- Advertisement -

এমনই একজন আলোকচিত্রশিল্পী নাম দীপক সাহা।

আশির দশকের শেষান্তে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। তখন, বাংলা নববর্ষ বরণের প্রধান অনুষ্ঠানটির সূচনা হতো সূর্যোদয়ের মুহূর্তে ঢাকার রমনার বটমূলে ছায়ানটের–সম্মিলিত কণ্ঠে এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটির মাধ্যমে। বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষ নবীন প্রবীন কিশোর তরুণের তারুণ্যের জোয়ারে তখন ভেসে যেতো যাবতীয় অপশক্তির সমুদয় অশুভ তৎপরতার সমস্ত প্রয়াশ।

শিশুপার্কের মূল ফটকে নারকেল বিথী চত্বরে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে ছড়া পড়ছেন লুৎফর রহমান রিটন আলোকচিত্রী দীপক সাহা

এক পর্যায়ে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর ব্যানারে গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর রমনার বিপরীতে শিশু পার্কের সামনে নারকেল বিথী চত্বরে স্টেজ বানিয়ে সকাল শুরু হতেই বাংলা নতুন বছরকে বরণ উৎসব শুরু করলো। এই অনুষ্ঠানে ফকিরের ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পীরা গান গেয়ে মাতিয়ে রাখতেন শত সহস্র দর্শককে। ফকির আলমগীর আমাকেও আমন্ত্রণ জানাতেন স্বৈরাচার বিরোধী ছড়া পড়বার জন্যে। আমি পড়তাম–আবদুল হাই করে খাই খাই নামের বিশাল একটা ছড়া।

সেই সময়ের ঋষিজের কোনো এক নববর্ষের অনুষ্ঠানে, নারকেল বিথী চত্বরে আমি ছড়া পড়ছি, আমার সামনে বিপুল সংখ্যক জনতা, তাঁরা আমার ছড়া শুনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, উল্লাস প্রকাশ করছেন, হেসে কুটিপাটি হচ্ছেন, এরকম কয়েকটা ছবি নিয়ে শান্তিনগরে দৈনিক খবর হাউসে আমার অফিসে এসে হাজির সুদর্শন হাস্যোজ্জ্বল তরুণ এক আলোকচিত্রী দীপক সাহা।

( এই সিরিজের একটি ছবি মুদ্রিত হয়েছে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত আমার ‘একশো রিটন’ নামের বইয়ের ভূমিকাভাষ্যের সঙ্গে।)

ছবিগুলো পেয়ে উচ্ছ্বসিত আমি ওকে আমার লেখা একটা বই উপহার দিলাম। অটোগ্রাফে দীপক সাহার নামটি খানিকটা পালটে দিয়ে লিখেছিলাম–উদ্দীপক সাহা। আর সেইটা দেখে দীপকের সে কী আনন্দ!!

সেই থেকে দীপক সাহাকে আমি উদ্দীপক সাহা নামেই ডাকতাম।

ভিড় ভাট্টায় উদ্দীপক নামে ডাকলে সহাস্যে সে হাজির হতো আমার সামনে।

আমার বিশেষ প্রীতিভাজন সেই উদ্দীপক সাহা গতকাল শুনলাম শামিল হয়েছে অনন্তযাত্রায়!

তোমার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক অনুজপ্রতিম বন্ধু আমার।

অমৃতলোকে পরম শান্তিতে থেকো তুমি।

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent