রবিবার - জুলাই ১৪ - ২০২৪

আমার ছড়ার জার্নি

তরুণ বয়েসে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন

সত্তুর আশি ও নব্বুইয়ের দশকে মফস্বলের চা-মিষ্টির দোকান বা হোটেলের বেড়ার দেয়ালে দৈনিক পত্রিকার ব্রডশিট পাতাগুলো আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে রাখা হতো। তাতে খুব অনায়াসে আড়াল করা যেতো বাঁশের চাটাই নির্মিত দেয়ালের এবড়ো খেবড়ো অবয়বকে। দৈনিক পত্রিকার পৃষ্টার জায়গায় কোনো কোনো দোকানে ঠাঁই পেতো সুজাতা-আজিম রাজ্জাক-কবরী কিংবা শাবানা-ববিতার ছবি সম্বলিত চিত্রালী পূর্বানীর আকর্ষণীয় পাতাও।

শেষ দিকে মাঝে মধ্যে সিনেমার রঙিন পোস্টারও সাঁটিয়ে রাখতেন কোনো কোনো হোটেল মালিক।

- Advertisement -

সত্তুরের দশকের শেষ দিকে কোনো এক মফস্বল এলাকায় ওরকম একটা দোকানে বন্ধুর সঙ্গে মিষ্টি খেতে বসে সহসা আমার বাঁ দিকের বেড়ার দেয়ালে সাঁটানো দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসর পাতাটায় ডাবল কলাম বক্স করে ছাপা আমার একটা ছড়া দেখে কী যে খুশি হয়েছিলাম! বয়েসে অতি তরুণ আমি সেদিন বিপুল আনন্দে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে খড়খড়ে বেড়ার ওপর লেই দিয়ে সাঁটিয়ে রাখা ইত্তেফাকের পাতাটায় ডান হাতের মমতাপ্লাবিত স্পর্শে স্পর্শে মুগ্ধতা প্রকাশ করছিলাম।

আমার ছড়ার ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছিলাম ছড়াটাকে। ছড়াটাকে আদর করার ছলে আমি আসলে আদর করছিলাম আইনুল হক মুন্নার করা লেটারিং-এ আমার নামটাকেও।

দৃশ্যটা সারা জীবনের জন্যে গেঁথে গিয়েছিলো আমার স্মৃতিতে, করোটিতে, চিরস্থায়ী ছাপচিত্রের মতো।

এই যেমন এখনও, দৃশ্যটাকে লিখতে গিয়ে হাতের তালুতে আমি গ্রামের বেড়ার দেয়ালের খড়খড়ে সারফেসের ওপর সাঁটানো নিউজ প্রিন্টের পত্রিকার ঘ্রাণের সঙ্গে আটা বা ময়দার লেইয়ের গন্ধ পাচ্ছি। যাতে কাঁচা বাঁশের হালকা একটা সুরভীও মাদকতা ছড়াচ্ছে।

এই অতি সামান্য ঘটনাটা আমার কাছে অনুপ্রেরণার হিমালয় হয়ে এসেছিলো। আমার স্বভাবটাই এমন। অতি তুচ্ছ জিনিস থেকেও আমি প্রেরণা সংগ্রহ করতে পারি। মামুলি ঘটনা থেকেও আনন্দ কুড়িয়ে মুঠোবন্দি করতে পারি।

আশির দশকের সম্ভবত মধ্যাহ্নে, একদিন, পুরোন ঢাকার তস্য গলির একটি ভাঙাচোড়া হোটেল বা চায়ের দোকান থেকে সদ্য ভাজা গরমাগরম ডালপুরি কিনে নিউজ প্রিন্টের ঠোঙায় নিচের দিকের ভাঁজের ভেতরে ঢুকে যাওয়া নিজের শাদাকালো একটা সিঙ্গেল কলাম ছবির অংশ বিশেষের উপস্থিতি দেখেও আনন্দে বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম–আরে কী কাণ্ড! এইটা তো আমি!

আমার সঙ্গে থাকা বন্ধুটা মহা বিস্মিত কণ্ঠে বলেছিলো–আব্বে হালায় ঠোঙ্গার মইধ্যে দেহি তুই!!

নিউজ প্রিন্টের সেই ঠোঙাটা সম্ভবত সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর কোনো একটা সংখ্যার পৃষ্ঠা দিয়ে বানানো ছিলো। আমার শাদাকালো ছবিটার আলোকচিত্রী ছিলো প্রিয় বন্ধু বাতেন সিরাজ।

ডালপুরি থেকে চুঁইয়ে পড়া তেলে আমার চেহারাটা ছিলো একেবারে জবজবা। ডালপুরির ঠোঙায় নিজের এমন তেলতেলে ছবি দেখার সৌভাগ্য আমার এক জীবনে আর দ্বিতীয়বার আসেনি।

ঠোঙাটা সংরক্ষণ করতে চেয়েছিলাম। করা হয়নি। ওরকম তেলতেলে ঠোঙা রাখবো কোথায়? তখন পলিথিনের জিপলক সিস্টেমের নানান সাইজের স্যান্ডুইচ ব্যাগেরও আগমন ঘটেনি আমাদের সংস্কৃতিতে।

ঘটনা দু’টো আমার ছড়ার জার্নিতে লাল মোরগের ঝুঁটির মতো চকচকে একটা মুকুটসদৃশ্য গৌরব এঁকে দিয়েছিলো। সেই গৌরব অনুপ্রেরণার হিমালয় পর্বত হয়ে আমাকে ছড়া লিখতে উদবুদ্ধ করে আজও। ছড়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি প্রতিদিন সাধনার ধ্যানমগ্ন উপাসনার মতো করে লিখে যাই ছড়া, ছোটদের জন্যে কিংবা বড়দের জন্যে।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কোনো সাম্প্রতিক বিষয় আমাকে মুগ্ধ মোহিত বিস্মিত কিংবা ক্রুদ্ধ  করে ফেললে মুহূর্তেই সেটা ছড়ার অবয়বে প্রকাশ করার জন্যে আমার ভেতরে আমি অদ্ভুত একটা অস্থিরতা অনুভব করি। যতোক্ষণ পর্যন্ত ছড়াটা লিখে না ফেলি, অস্থিরতা আমাকে ছাড়ে না। ছড়াটা লিখে ফেললেই আমি মুক্তি পেয়ে যাই অস্থিরতার হাত থেকে।

এই যেমন সাম্প্রতিক কালে পৃথিবীর সবচে বড় ইভেন্ট, যাকে বলা হয় দ্য গ্রেট শো অন আর্থ সেই ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবলকে বিষয় করেও লিখেছি আমি একাধিক ছড়া। যার একটি ছিলো ফুটবল বিস্ময় লিওনেল মেসিকে নিয়ে–একজনই মেসি থাকে একটি প্লানেটে। সর্বশেষ ছড়াটা আমি লিখেছি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলাটা দেখার পর পর, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়, যার শিরোনাম ছিলো ‘আর্জেন্টিনা আর্জেন্টিনা’। এভাবেই সমসাময়িক বিষয় নিয়ে রচিত লেখাটা বা ছড়াটা আমাকে কানেক্টেড রাখে পাঠকের সঙ্গে। অগুন্তি পাঠকের মনোজগতে ঘুরপাক খাওয়া কিছু কথা বা উপলব্ধির সঙ্গে স্থাপিত হয় ঐক্য। সেই ঐক্য চিন্তার। সেই ঐক্য ভালোবাসার।

এবং দিনশেষে আমি খুব অনায়াসে অনুভব করতে পারি যে–ছন্দ এবং ছড়াই আমার ভালোবাসার প্রধান এবং একমাত্র মাধ্যম।

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent