বুধবার - ফেব্রুয়ারি ২১ - ২০২৪

বারো বছর কানাডায়

প্রথম ভোট দয়িে মনে হয়ছেে আমি ক্যানাডয়িান সটিজিনে একজন প্রাইমনিস্টিার জয়ী হবার পছেনওে আমার মতামত কাজ করছেে

এই দেশটাতে আছি বারো বৎসরের উপর হবে। নানা কারনেই দেশটিকে ভালো লাগে। মে মাসের ৮ তারিখ যেদিন কানাডার মাটি স্পর্ষ করি সেদিন সামারেও হঠাৎ তামমাত্রা একটু নেমে গিয়েছিল। টার্মিনালের সব আনুষঙ্গিকতা শেষ করে যখন বাইরে আসলাম তখন কনকনে একটা ঠান্ডার স্রোত শরীরটাকে কাপিয়ে দিয়ে গেল।

বোন দুলাভাই আমাদেরকে পিয়ার্সন এয়াপোর্টে নিতে এসেছিল। হাইওয়ে দিয়ে যখন আসছিলাম তখন উচু উচু বিল্ডিং আর সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রশস্থ হাইওয়ে আর চারিদিকে পরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠা নগরী দেখে আমি খুব অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। কোথা থেকে যেন কোথায় চলে আসলাম। কেউ না আসলে সে বুঝবে না পৃথিবীর ও প্রান্তে কি আছে!!

- Advertisement -

প্রথম দিনের সেই মুগ্ধতার রেষ এখনো আমি অনুভব করি। উঠেছিলাম বাংগালী অধ্যুষিত ক্রিসেন্ট প্লেসের ৭ নাম্বার বিল্ডিংয়ে। বাংলাদেশীরা প্রথম প্রথম এই সব বিল্ডিংয়েই উঠে। আমিও যথারীতি বোনের বাসায় প্রায় দু সপ্তাহ থেকে এই ক্রিসেন্ট প্লেসের বাসিন্দা হলাম। এই বিল্ডিংয়ে অনেক বাংলাদেশীর দেখা পেতাম সেই সময়। সবাই ব্যস্ত থাকায় লবি এলাকায় ওই হাই হ্যলো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। তবে হাতে গোনা কয়েকজনের সাথে একটু ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। মেয়েকে এই ক্রিসেন্ট প্লেসের এলিমেন্টারি স্কুলে ভর্তি করে দিলাম। ওকে সকালে ওর মা স্কুলে দিয়ে আসতো, আবার নিয়েও আসতো।  মাঝে মাঝে আমিও এই কাজটি করতাম। আমরা প্রথম প্রথম যখন গ্রোসারী এবং কেনাকাটা করতে যেতাম তখনও চোখে মুখে মুগ্ধতার ভাব ছিল।সুপার মার্কেট গুলি বিশাল বিশাল আর ঝকঝকে তকতকে পরিচ্ছন্ন। দেখে ভালো লাগতো। কোথাও অপরিচ্ছন্নতা তেমন দেখি নাই। তবে ৭ ক্রিসেন্টের অনেক ছোট বড় সমস্যার একটি হচ্ছে বেড বাগ। তিক্ত এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল তখন। পেস্ট কন্ট্রোলের লোকজন এসে ঔষধ দিয়ে যেত কিন্তু লাভ তেমন হতো না । কিছু দিন পর আবার উপদ্রোপ দেখা দিতো। এর মধ্যে আড়শোলাও বিরামহীনভাবে বংশ বিস্তার করতো। বেড বাগ এখানে খুব মারাত্নক বিষয়। কেউ শুনলে খুব খারাপ ভাবে নিতো। সবার এমন একটা ভাব,বেড বাগ হওয়াটা ছিল একটা বড় অপরাধ। অনেককেই দেখেছি কিছু দিন পর পর বেড মেট্রেস গারবেজ করে দিতো। এই বেড বাগের যন্ত্রনায় রাতে ঘুমাতে পারতাম না। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনো মনে পড়লে গা শিউরে উঠে।

সামারটা মোটামুটি ভালোই গেল। সেই সময় গাড়ি ছিল না। এক পরিচিত আমাদেরকে তাদের সংগে নায়াগ্রা নিয়ে গিয়েছিল। নায়াগ্রা দেখে মনে হয়েছিল এটি প্রকৃতির এক অনন্য কৃর্তী। এর কাছে এসে মনের সব ভার মুক্ত হয়ে যায়। এই বিপুল আর বিশালত্বের কাছে আমি খুবই ক্ষুদ্র। এ এক অপার রহস্য। অসংখ্য স্রোত ধারা নিচের দিকে পড়ে যাবার স্বশব্দ ধ্বনি মুখরিত হয়ে উঠার মধ্যে কি যেন এক আহ্বান আছে। সে আহবান বিলিন হবার,মিশে যাবার।।মন্ত্রমুগ্ধের মত এই অসীম সৃষ্টিকে দেখার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আছে,তৃপ্তি আছে। এর পর সামার চলে গিয়ে শীতের দেখা পেলাম। সেটি আরেক অভিজ্ঞতা।শীত কত প্রকার ও কিকি কেউ বুঝতে চাইলে তার কানাডা আসা উচিত। ততক্ষনে আমরা দুজনেই সেপ্টেম্বরের সেমেষ্টার ধরে ফেলেছি। আমি সেন্টেনিয়ালের এস্টোনবি ক্যাম্পাসে যেতে লাগলাম আর আমার স্ত্রী ডেনফোর্থের একটি এস্থেটিক কলেজে। শীতের সাথে সাথে আসলো তুষার পাত। প্রথম স্নো দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অন্যরকম। হঠাৎ আমাদের পাচ তলার ব্যালকনী থেকে দেখতে পেলাম তুলোর মত সারি সারি কি সব আকাশ থেকে নিচের দিকে  ধাবিত হচ্ছে। প্রথমে হঠাৎ দেখে বুঝি নি এই সব কি!  পরে মাথায় খটকার মত লাগলো,এটাই বুঝি স্নো। স্ত্রী, মেয়ে দুজনেই ব্যালকনী দিয়ে সেই স্নো দেখতে থাকলো আমার সাথে। সে এক বিস্ময়। স্নোও প্রকৃতির আরেক অপরূপ সৌন্দর্য। তবে এই সৌন্দর্য দেখতেই ভালো লাগে। স্নো দিয়ে খেলতেও ভালো লাগে কিন্তু স্নো পেরিয়ে গ্রোসারী করতে যাওয়া ভালো লাগে না। সে এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। ভারি বুট পড়ে স্তুপ হয়ে থাকা স্নো পেরিয়ে গ্রোসারী করতে যাওয়া খুবই কঠিন একটা বিষয় ছিল আমাদের জন্য। আমি এই স্নো পেরিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্ক স্টেশনে এসে যখন পৌছতাম তখন কিছুটা হাফ ছেড়ে বাচতাম। তার পর ট্রেনে বাসে করে এস্টোনবি ক্যাম্পাসে নেমে আবার স্নো পেরিয়ে কলেজে ঢুকার পর শান্তি। এই সময় গুলি ছিল খুব কষ্টের। ব্ল্যাক আইস এড়িয়ে পিছলে পড়া থেকে বেচে বেচে সেই দিনগুলি পার করেছি।  তবে দেশটার অনেক কিছুই ভালো এবং কল্যানকর। চিকিৎসা সেবা বলা যায় একরকম ফ্রি। শুধুমাত্র ড্রাগের কস্ট পকেট থেকে দিতে হয়। যত বড় সার্জারীই হোক না কেন একেবারে বিনে পয়সায় হয়ে যায়। একটি পয়সাও দিতে হয় না। প্রতিটি কমিউনিটিতে ওয়াক ইন ক্লিনিক আছে, আছে ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান। আমার মেয়ের স্কুলে যেতে কোন রকম ফি লাগতো না। এটা ওর টুয়েলভ গ্রেড পর্যন্ত ছিল। মেয়ে ১৮ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে চাইল্ড ট্র‍্যাক্স বেনিফিট পেয়েছে। এই সব প্রথম প্রথম আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু পাওয়া বলে মনে হতো। ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া আর সিটিজেনশিপ পাস করার পর নিজেকে মনে হয়েছে আমি এই দেশে পূর্নতা পেয়েছি। প্রথম ভোট দিয়ে মনে হয়েছে আমি ক্যানাডিয়ান সিটিজেন। একজন প্রাইমিনিস্টার জয়ী হবার পেছনেও আমার মতামত কাজ করেছে। এই সব ভাবতে ভালো লাগে। তখন মনে হয় আমি অধিকার প্রাপ্ত হয়েছি।

দেখতে দেখতে অনেক গুলি বৎসর কেটে গেলো। এখন স্থান কাল পাত্র,অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে । এখন আর সেই বেড বাগের উপদ্রোপের মধ্যে থাকি না। এখন আর খাবারের মধ্যে আড়শোলা দেখে ঘেন্নায় গা গুলিয়ে আসার ব্যাপার নেই  এখন আর কষ্ট করে স্নো পেরিয়ে গ্রোসারী করতে হয় না। আমি জানি এগুলি শুধু আমার নিজের গল্প নয় । প্রতিটি ইমিগ্রেন্টের গল্প। সবাইকেই এই হার্ডেলগুলি পেরিয়ে আসতে হয়েছে।আমাদের নতুন প্রজন্ম প্রথম প্রজন্মের এই সেক্রিফাইস গুলি বুঝবে না!

তবে স্নো পড়তে দেখলে এখনো ভালো লাগে। এখনো নায়াগ্রার কাছে গেলে বুকের ভার নেমে যায়। ভুলে যাই এই কষ্টগুলি পেরিয়ে এসেছি।

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent