শুক্রবার - মে ২৪ - ২০২৪

বর্ধিত শরীরে টরন্টো ফেরা

ব্লু ওয়াটার ব্রিজের ক্রাউন পয়েন্টে উঠেই বুঝলাম বর্ডারের ভিড়টা আজ ভোগাবে বেশ। ক্রাউন বলছি একারণে যে আর্চ আকৃতির সেতুটি দুই পাড়ের তুলনায় মধ্যভাগে অনেক উঁচু। ওখানে পৌঁছাবার আগ পর্যন্ত সেতুর অন্যপ্রান্ত দেখা যায়না। ক্রাউন এলিভেশনে গাড়ি থামাতে হলো। এখান থেকেই ট্র্যাফিক জ্যাম শুরু। প্রায় এক কিলো দূরে ইউএস ইমিগ্রেশন ভবন দেখা যাচ্ছে। তবে কোনো সাইন পড়া যাচ্ছেনা।

- Advertisement -

বিরক্ত লাগার কথা। কিন্তু লাগছে না। উপর থেকে নদীর দুপাড় দেখছি। বাড়িগুলো খুব ছোট দেখাচ্ছে। এসফল্ট শিঙ্গেলে ছাওয়া বাড়ির ছাদগুলো আলকাতরা লাগানো ঢেউটিনের মতো লাগছে। কে বলবে এটি আশির দশকের গ্রামবাংলা নয়? অনেকটা যেনো এপাড়েে শাহজাদপুর ওপাড়ে বাদলবাড়ি! মাঝখানে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী!

শৈশবে দেখা গ্রামবাংলা আমার মস্তিষ্কে এমনভাবে বাসা বেঁধেছে যে সেন্ট ক্লেয়ার নদীকে করতোয়া বলে ভুল হলো। এ নদী চওড়ায় খারাপ না হলেও দৈর্ঘ্যে এতো বড় নয়। সেন্ট ক্লেয়ার নদী উত্তরে “লেক হুরনে’ উৎপন্ন হয়ে ‘লেক সেন্ট ক্লেয়ারে’ এসে থেমে গেছে। এরপর ডেট্রয়েট নদী নামধারণ করে ডেট্রয়েট নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লেক এরি পর্যন্ত। নদীর এই অংশটি অসম্ভব সুন্দর। কবিতাকেও হার মানায়। ডেট্রয়েট নদীকে অনেকেই পোয়েটিক রিভার বলেন।

সে যাক, আমরা পার হচ্ছিলাম সেন্ট ক্লেয়ার নদীর উপর নির্মিত ব্লু ওয়াটার ব্রিজ। পৃথিবীতে যে ক’টি ব্রিজের নাম আমার খুব প্রিয় ব্লু ওয়াটার ব্রিজ এর অন্যতম। চুরাশি বছরের পুরনো ব্রিজটি নির্মিত হয় ১৯৩৮ সালে। ক্যান্টিলিভার ট্রাসে করা টুইন স্প্যান ব্রিজ। কানাডা থেকে ইউএসএ যাবার জন্য একটি স্প্যান, যা ওয়েস্টবাউন্ড লেনগুলোকে সাপোর্ট করে। এর দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৮৮৩ কিলোমমিটার। অন্য স্প্যানে ইউএসএ থেকে কানাডায় আসার ইস্টবাউন্ড লেনগুলো নির্মিত হয়েছে। ইস্টবাউন্ড ব্রিজের দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৮৬২ মিটার। উচ্চতায় ওয়েস্টবাউন্ড ৬৪ মিটার হলেও ইস্টবাউন্ড ৭১ মিটার। প্রায় চব্বিশতলা ভবনের সমান উঁচু! ভারী লোহালক্করে ঠাসা ট্রাসের ব্রিজ দেখলেই বাংলাদেশের রেলসেতুগুলোর কথা মনে পড়ে।

বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে ইমিগ্রেশন চেকপয়েন্টে পৌঁছে গেছি খেয়াল করিনি। ইমিগ্রেশন অফিসারেরা একটু খিটবিটে হয়। কিন্তু এ তরুণকে দেখলাম ভীষণ হাসিখুশি। কেবল জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাচ্ছি।
বললাম, এই মিশিগান রাজ্যেই। রচেস্টার হিল শহরে বন্ধুর বাড়ি। এখান থেকে মাত্র ফর্টিফাইভ মিনিটের পথ।

কদিন থাকবে?

এইতো.. কেবল উইকএন্ড! টরন্টো থেকে আরেক বন্ধু এতোক্ষনে পৌঁছে গেছে সেখানে। ইউনিভার্সিটিতে আমরা একত্রে ছিলাম।

ওয়াও! তাহলেতো অনেক ফান হবে? গাড়িতে নিশ্চয়ই এলকোহল আছে?

হেসে দিলাম। বললাম, যে বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি সে প্র্যাকটিসিং মুসলিম। এলকোহল স্পর্শ করেনা।

অউউ! এনিওয়ে তোমার মেয়েকে ঘুম থেকে উঠতে বলো।

গাড়ির পেছনে তাকিয়ে দেখি কন্যা আমার অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পাশে বসা ওর ভাই ডেকে দিলো। “মর্ম ওঠো”!

ইমিগ্রেশন অফিসার গাড়ির ভেতর আমাদের চারজনের চেহারা আবার ভালো করে দেখে নিলো। পাসপোর্টগুলো হাতে ফেরত দিয়ে বললো, ইউ আর গুড টু গো।

গাড়ি টান দিয়ে বর্ডার থেকে হাইওয়েতে তুললাম। স্পিড উঠে গেছে ঘন্টায় ১৩০ কিলো। ইউএসের রাস্তার স্পিড লেখা থাকে মাইলে। কনভার্ট করে দেখলাম ঘন্টায় ১১০ কিলো নিরাপদ। তবু স্পিড কমালাম না। জানি, শৈবাল আর বাপ্পী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। আমার মনটাও তখন আঁকুপাঁকু করছে কখন ওঁদের দেখবো!

পাদটীকাঃ একুশ থেকে তেইশে জুলাই মিশিগান ট্রিপে বেড়ানোর চেয়ে আড্ডা হয়েছে বেশি। সাথে উর্মি ভাবীর (বাপ্পীর অর্ধাঙ্গীনি) তৈরী করা সুস্বাদু খাবারে কিঞ্চিৎ বর্ধিত শরীরে টরন্টো ফেরা।

- Advertisement -

Read More

Recent