বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা

সদ্য স্বাধীন দেশে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অতি আবেগী ও বিশাল হৃদয়ের এই মহান নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সাম্প্রদায়িক শক্তির সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছিল

চাইলেই কি স্বাধীনতা পাওয়া যায়? অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামলেই কি দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে স্বাধীন ভুখন্ডের নাগরিক হওয়া যায়? না, যায় না। প্রমান টানা ২৩ বছর ধরে শ্রীলঙ্কার তামিল জাতিগোষ্ঠির সশস্ত্র লড়াই। তাদেরও একজন আপোষহীন নেতা ছিলেন ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। তাঁর হত্যার মধ্যে দিয়েই তামিল জাতিগোষ্ঠির স্বাধীনতার লড়াই অস্তমিত হয়ে গেছে ।  ফিলিস্তিনের জনগণের আত্ননিয়ন্ত্রণাধীকারের লড়াই তো টানা চার দশকের , সেখানেও ছিলেন প্রবাদপ্রতীম নেতা ইয়াসির আরাফাত। আরাফাত নেই , এখনো তাদের লড়াই থেমে নেই । কিন্তু পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের দীর্ঘদিনের অপশাসন , শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে  জাগ্রত করেছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার উন্মাদনা দিয়েছিল। সেই উন্মাদনার কবিতা রচনা করেছিলেন তিনি । যে কবিতা অন্য কেউ লিখতে পারে না। ৭ ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ জনতার সামনে সেই অগ্নিঝরা  কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তিনি।

১৯৪৭ এ  দ্বিজাতিতত্বের সৃষ্ট পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের ভাওতাবাজী এবং সামগ্রিক অর্থেই মিথ্যা মুসলিম ভাতৃত্ববোধের অযুহাতে পূর্বের উপর পশ্চিমের শোষণ,  সেখান থেকে মুক্তির পথের দিশা যে মহান নেতা আমাদের দিয়েছিলেন তাঁর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বিচক্ষণতা দুরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্ব মাত্র ৯ মাসেই বাঙালিদের জন্য একটি মুক্ত স্বাধীন ভুখন্ড উপহার দিতে পেরেছে। পৃথিবীর বুকে ভাষাভিক্তিক অসাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ে আমরা ১৯৭১ এ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আর আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানীদের চাইতে আমরা এখন অনেক ভাল আছি। বাংলাদেশের মানুষ এখন পেট ভরে খেতে পায়। বঙ্গবন্ধু এটাই চেয়েছিলেন।

- Advertisement -

সদ্য স্বাধীন দেশে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অতি আবেগী ও বিশাল হৃদয়ের এই মহান নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র ও  আন্তর্জাতিক  সাম্প্রদায়িক শক্তির সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি প্রো পাকিস্তানী রাজাকার আলবদর। যুদ্ধ বিধস্ত একটি দেশের ভেঙে পরা অবকাঠামোর উন্নয়নে তখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেনি উল্লেখযোগ্য কোন মুসলিম দেশ। সৌদি আরব , ইয়েমেন, বাহরাইন সহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় বেশিরভাগ দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি পর্যন্ত দেয়নি, ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে শুধু খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরণ করেন অনেক মানুষ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতি বিপ্লবী বামফ্রন্টরা গড়ে তোলে সর্বহারার জিগির তোলা বাম সন্ত্রাসের সংগঠন জাসদ। সেনাবাহিনীর মধ্যে পোলারাইজেশন ঘটে পাকিস্তান ফেরত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি প্রো-পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হয়েও বঙ্গবন্ধুকে তখন চরম অসহায়ত্বের মধ্যে ওআইসি’র সম্মেলনে যোগ দিতে হয়। কিন্তু তাতেও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থামেনি।

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরেই যে ভয়ন্কর ষড়যন্ত্র চলছে এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতেই সতর্ক করে দেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা  রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং ( RAW) । কিন্তু হিমালয়ের মতো বিশাল যাঁর হৃদয়, যে বাঙালিদের ভালবেসেই জীবনের দীর্ঘকাল কারাবাসে কাঁটিয়েছেন, কতটা অধিকার থাকলে যিনি বলতে পারেন ” তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরবা, …..মনে রাখবা , রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো তবু এদেশকে স্বাধীন করে তুলবো ইনশাল্লাহ…. ।  এই মানুষকে কি বাঙালিরা হত্যা করতে পারে?

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষকে হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। অতি সাধারণ ছিল তাঁর যাপিত জীবন। তাঁকে বাঙালিরাই হত্যা করে অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতার চড়ম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে। বাঙালি এমনই এক স্বার্থপর জাতিগোষ্ঠির নাম। খুব কম সময়ে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম। ৯ মাসের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যদি ৯ বছর গড়াত তাহলে স্বাধীনতার মুল্য হয়ত আমরা বুঝতে পেতাম। আর বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বলিষ্ঠ নেতা পেয়েছিলাম বলেই আমরা স্বাধীন হতে পেরেছিলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি আমার সশ্রদ্ধ সালাম ও শ্রদ্ধান্জলি।

- Advertisement -

Read More

Recent