শনিবার - মার্চ ২ - ২০২৪

চিকা মারা

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিকা মারার জন্য ছোট ছোট গ্রুপ করে নিতাম আমাদের কেউ একজন দেয়ালে দ্রুত চুনকাম করে লেখার উপযোগি করত

১৯৮৬ সাল। স্বৈরাশাসক এরশাদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সারাদেশের মানুষ দাবানলের মতন ফুঁসছে।তার আঁচ আমার গায়েও লাগে। স্কুলে থাকাবস্থায় বড়ভাইদের মিছিল দেখলে ছুঁটে যেতাম। শ্লোগান দিতাম ” এক দফা এক দাবী, স্বৈরাচার তুই কবে যাবি।”

তখনো কোন সংগঠন করি না।কিন্তু  স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে প্রবেশ করে ছাত্র রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ি। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের একজন কর্মী হিসেবে প্রতিদিন কলেজের মিছিল সমাবেশে অংশ নেই। বিকেলে মাকসুদ ভাই, ইসমাঈল ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন এলাকায় পাঠচক্র  কিংবা  কর্মীদের সাথে যোগাযোগ, সন্ধ্যায় শহরে মিছিল আবার রাতে  চিকামারা ( দেয়াল লিখন) টিমের সাথে  যেতাম।

- Advertisement -

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিকা মারার জন্য  ছোট ছোট গ্রুপ করে নিতাম। আমাদের কেউ একজন দেয়ালে দ্রুত চুনকাম করে লেখার উপযোগি করত। একটু শুকালে মাকসুদ ভাই,জহিরভাই, ইসমাঈল ভাই লেখা শুরু করতেন। “স্বৈরাচার ও মৌলবাদ নিপাত যাক।”

” শৃংখলছাড়া  সর্বহারার হারাবার কিছু নেই, আছে জয় করার সারাবিশ্ব”।

আমার মুল কাজ ছিল তাদের সাথে  সাদা চুন দিয়ে চিকামারার জন্য দেয়াল প্রস্তুত করা। মাঝেমাঝে রাতের অন্ধকার ভেদ করে হেডলাইট জ্বালিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে আসত। দূর থেকে বুঝতাম পুলিশ আসছে। চিকামারার ডিব্বা,বালতি, রঙ, ব্রাশ আড়ালে রেখে আমরা সাধারন পথিকের মতন পুলিশের গাড়ি ক্রস করে যেতাম। পুলিশ গেলেই আবার চিকা মেরে আরেক এলাকায় যেতাম। মাকসুদভাইরা যখন সুন্দর হাতের লেখায় দেয়াল ভরিয়ে তুলতো আমার হাত নিশপিশ করত ”কবে আমাকে বলবে তুমিও লিখো।”

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধের ডাক দিয়েছে ৫,৭ ও ৮ দলীয় জোট। বেশ কদিন যাবত সারাদেশে উত্তেজনা। কি হয়, কি হবে এ ভাবনায়  মানুষ চাপা আতংক ও ক্ষোভে ফুঁসছে।

এ রকম সময় ২/৩ নভেম্বর  রাতে  নারায়নগঞ্জের পুরানো কোর্টবিল্ডিং এলাকায় চিকা মারতে গিয়েছি। তখন রাত প্রায় ১২টা।  মাত্রই দেয়ালের গায়ে  জহির ভাইর ব্রাশের আঁচড় পড়েছে  হঠাৎ  সিভিলে বেশ ক’জন পুলিশ এসে তাকে ধরে ফেলে। আমি, নান্নু,  মাসুম, শফিক,হান্নান ভাই একটু দুরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। পুলিশ দেখে প্রথমে শফিক এগিয়ে গিয়ে জিগেস করে, ভাই উনাকে কেন ধরছেন?  উনিতো রাজনৈতিক শ্লোগান লিখতে আসে নাই। উনি আমার কোচিং সেন্টারের একটা বিজ্ঞাপন লিখবে।’

পুলিশগুলো বদলি হয়ে শহরে নতুন এসেছিল। তারা আমাদের কাউকে চিনতো না। শফিকের কথা বিশ্বাস করে পুলিশ জহিরভাইকে ছেড়ে দেয়। যাবার সময় একজন বলে গেল,  বুঝেন তো দেশের অবস্থা খারাপ, বেশীরাত এখানে থাইকেন না।”

পুলিশ চলে যেতেই আমরা দ্বিগুন উৎসাহে চিকামারি

” চলো চলো ঢাকা চলো, ১০ নভেম্বর অবরোধ সফল করো- ৫ দল”।

এর কিছুদিন পর বাসদনেতা এম. এ মান্নান, ছাত্রনেতা জি এম ফারুকসহ জেলার ৩ জোটের সকল শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকে  পুলিশ গ্রেফতার করে। সারা শহর থমথমে।এদিকে বাসায় কারফিউ জারি করেছে বাবা। আমার বাহিরে যাওয়া নিষেধ। কলেজ থেকে ফিরে ছুঁতো খুঁজতে থাকি  কখন বের হয়ে বিকেলে গুলশান সিনেমা হলের  পিছনে আমাদের দলের  যোগাযোগ পয়েন্টে যাব।

বিকেলে পাঠাগার হতে বই আনার কথা বলে বাসা থেকে টুপ করে বেরিয়ে যাই।

গুলশান সিনেমা হলের কাছে যেতে দেখি পুলিশের ছড়াছড়ি। মারদাংগা ভাব নিয়ে অবস্থান করছে। কাউকে রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না। পাশের মার্কেটের ভিতর দিয়ে ফাতেমা কনফেকশনারির সামনে গিয়ে দেখি আমাদের কেউ নেই। চলে যাব কিনা ভাবছি এসময় হঠাৎ ছোট ফারুকভাই এসে ফিসফিসিয়ে বললেন,তোমারে খায়ের ভাই ডাকে। উপরে টিটুভাইয়ের গদিতে যাও।

একথা বলেই উনিও কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন।

টিটুভাইয়ের গদিতে খায়েরভাই অন্ধকার রুমে বসে আছেন।আমাকে বললেন, এক্ষুনি চুন, ব্রাশ, ব্ল্যাক ও রেড অক্সাইড কিনে বাসায় যাও। রাতেই মান্নানভাই, ফারুকের মুক্তি চেয়ে চিকামারবা।”

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমি তো কখনো চিকামারি নাই।

খায়েরভাই তার স্বভাবসুলভ কন্ঠে বললেন, ‘কখনো চিকামারি নাই, পারি না এ শব্দ বিপ্লবীদের জন্য নয়। যা বলছি তাই করো।’

আমি মিনমিনে গলায় বললাম, আমার হাতের লেখা খারাপ।

এবার খায়েরভাই একটু রেগে গিয়ে বললেন,যা বলেছি সেটা করো। কাল ভোরে আমি জামতলায় যাব। দেখব তুমি কি লিখেছো।এখন যাও।’

১৫০টাকা নিয়ে নয়ামাটির দরিদ্রভান্ডারের সামনে বলাকা পেইন্ট থেকে রঙ কিনে মহল্লায় চলে আসি। এগুলো নিয়ে বাসায় গেলে মার খেতে হবে। কোথায় যাই ভাবতে ভাবতে জনকল্যান ক্লাবের সাথে নেপালদার ডেরায় চলে আসি। জামতলায় তখন কাছিমের বানিজ্যিক চাষ হতো। বিদেশে কাছিম এক্সপোর্ট হতো। নেপাল দা ছিলেন ম্যানেজার।তিনি আমাকে পেলেই রাজনীতির আলাপ করতেন। তাকে গিয়ে বললাম, দাদা রঙ গুলাবো। চিকা মারতে হবে। হেল্প করেন।তিনি হাসিমুখে দরজা লাগিয়ে চুন,রঙ গুলিয়ে দুটা বড় বালতি দিলেন। একা একা চিকা মারব দেখে সাথে তার একভাই কার্তিককে বললেন আমার সাথে যেতে ।

আমি আর কার্তিক রাত জেগে সারা জামতলার বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে  লিখে ভরিয়ে  দিলাম ” পাঁচদল ও বাসদ নেতা এম. এ মান্নানের মুক্তি চাই”,

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেতা জিএম ফারুকের মুক্তি চাই”।

সেই থেকে শুরু চিকামারার হাতেখড়ি।

১৯৯০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনের সময়কার একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি। কুয়েত মৈত্রী হলে গিয়েছি চিকা মারতে। সাথে জহিরভাই।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মুশতাক-স্বপন-টুলু পরিষদের পক্ষে কুয়েত মৈত্রী হলে প্যানেল ছিল  স্মৃতি -? আর কে যেন জিএস ছিল মনে নেই। সন্ধ্যাবেলা প্রভোস্টের পারমিশন নিয়ে আমরা দুজন  হলে প্রবেশ করে মাত্র দেয়াল লেখা শুরু করেছি, এসময় ছাত্রদলের মেয়েরা টফি- পপি পরিষদের পক্ষে মিছিল করে আমাদের মেয়েদের ওপর আক্রমন করে। দু’দলের সেকি ভয়ানক মারামারি।কোমড়ে ওড়না বেঁধে হাতে গামলা,বড় পিতলের চামচ, বেত নিয়ে মারামারি ও চুলোচুলি আর অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনে আমি ভয়ে অস্থির। সেদিন আমাদের দুজনের দিকে ছাত্রদলের মেয়েরা  তেড়ে এসেছিল মারতে।

সত্যি কথা এতোগুলো মেয়ের মাঝখানে ভয়ে  আমি কোনরকম দেয়াল টপকে প্রান ও মান নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। হা হা হা….

মেয়েদের মারামারি কি জিনিষ তা চাক্ষুষ দেখে পরেরদিন রাতে আমি শামসুননাহার হলে আর চিকা মারতে যাইনি।

ছবি:  মীর শামসুল আলম বাবু

মন্ট্রিয়ল, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent