শুক্রবার - জুলাই ১৯ - ২০২৪

ফ্রান্সের প্যারিস ভ্রমণ

ফ্রান্সের প্যারিস ভ্রমণ

`easyjet airlines’-এ ইটালির ভেনিস থেকে ফ্রান্সের প্যারিস আমাদের ফ্লাইট সকার সাড়ে নয়টায়। এদিকে জার্মানের বার্লিন থেকে প্যারিস গামী সজল ভাইয়ের ফ্লাইটও সকাল সাড়ে নয়টায়। এ ফ্লাইট সিডিউল আমরা সাজিয়েছিলাম একমাস আগে ঢাকায় বসে। আমস্টার্ডাম থেকে আমরা যখন আলাদা হই তখন আবার কিভাবে একত্র হবো সেই চিন্তা মাথায় রেখেই বার্লিন এবং ভেনিস থেকে কিভাবে দু’জন একসাথে প্যারিস পৌঁছাতে পারি সেভাবে টিকেট বুকিং করি। যদিও আমি যখন ভেনিস এয়ারপোর্টে ডিপার্চার লাউঞ্জে বিমানের জন্য অপেক্ষা করছি তখন সজল ভাই ফোন করে জানালেন তার বিমান ১ ঘণ্টা ডিলে। কি আর করা , যাক অল্পতে সারলো, মাত্র ১ ঘণ্টা, বেশি হলে কি করা যেত। যাক, আপাতত শেষবারের মত ইউরোপের অভ্যন্তরিণ ফ্লাইটে উঠলাম। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে, বিমান ভ্রমণে মজার মজার খাবার পরিবেশনের খবর সাধারণ আমরা সবাই জানি, কিন্তু ইউরোপের অভ্যন্তরিণ ফ্লাইটে না কোনো খাবার, না কোনো কফি। উপরন্তো আরও ৭ কেজি ওজনের হেন্ড লাগেজ ব্যতিত অন্যান্য লাগেজের জন্য অনেক টাকা ফেয়ার আদায় করে। আর হেন্ড লাগেজ যদি ওজন ৭ কেজি ঠিকইে আছে কিন্তু সাইজে এক-দেড় ইঞ্চি বড় আবার সাইজ ঠিক আছে ওজনে এক/দুই কেজি বেশি তাহলেও গুনতে হবে মোটা অংকের ভাড়া।

যাক, অবশেষে ফ্রান্সের Paris-Orly Airport-এ সকাল সাড়ে দশটায় নামলাম, বার্লিন থেকে সজল ভাই আসবেন এক ঘণ্টা পর। আমি এক ঘণ্টা অপেক্ষা করবো, এমন সময় মিল্টন ইটালি থেকে ফোন করে আমি বিমান থেকে ঠিকমত নামতে পারলাম কিনা তার খবর নিল, সেই সাথে সতর্ক করলো আমি যেন লাগেজ বেল্টের কাছেই বসে থাকি, কারণ লাগেজ গেইটের বাইরে কাস্টমস সিকিউরিটি চেক এরিয়া, অযথা কাউকে ঘুরতে দেখলে কোনো কারণ ছাড়াই নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে পারে। কিন্ত আমি আগেই বলেছি ইউরোপের বিমানে যাত্রী অনেক থাকলেও লাগেজ বেশি থাকে না, আমাদের ফ্লাইটেও ৫/৬টি লাগেজ ছিল, তাই দ্রুত লাগেজ পেয়ে যাই, এখানে কোনো লোকও নেই , আমি এখানে একা একা বসে থাকলে বোর লাগবে। তাই আমি একেবারে এরাইভেল গেইট পার হয়ে বাইরে দাঁড়ালাম। আর এয়ারপোর্টের বাইরের দৃশ্য দেখতে থাকলাম। দেখতে দেখতে সময় পার হয়ে গেল সজল এসে নামলেন।

- Advertisement -

সজল ভাইয়ের একজন পরিচিত লোক কবি এমদাদ ভাই আমাদের এয়ারপোর্টে রিসিভ করার কথা ছিল, কিন্ত তিনি আসতে পারেননি, তবে আমাদের সাথে বিকেলে মিট করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা প্রথমে আমাদের নির্ধারিত হোটেলে যাওয়ার জন্য মেট্রোতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু বিশাল লাইন থাকার কারণে, আমরা উবার নিয়েই ‘ibis Budget Paris Nord 18eme, 7 IMPASSE MARTEAU, Franch’ হোটেলে রওয়ানা হলাম। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সময় আমাদের পরিচিতজন সবাই আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের মত কিন্তু প্যারিস নয়, এখানে সবসময় প্রচুর জনমানেুষের ভীর থাকে, আর চুরি-ছিনতাইয়ের সম্ভাবনাও আছে। আমরা হোটেলে পৌঁছে খুব বেশি দেরি না করে বেরিয়ে পরি পৃথিবীর রোমান্টিক শহর বলে খ্যাত প্যারিস দেখতে।

সেইন নদীর তীরে অবস্থিত প্যারিস শহর শুধু রোমান্টিকই নয় এটি শিল্প-সাহিত্যের শহরও বটে। প্যারিস একটি প্রাচীন নগরী। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও নিরাপদ। ফ্রান্স ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। এর আয়তন ৫ লক্ষ ৪৩ হাজার বর্গ কি.মি., জনসংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। ভাষা ফরাসী। অভিবাসীদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ ফ্রান্স। ফ্রান্সের কান নগরিতে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসব। পঞ্চম প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সে জনগণের প্রতক্ষ্য ভোটে সরাসরি প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন এবং আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হয় আইনসভার নির্বাচন। আইনসভার সদস্য সংখ্যা ৫৭৭ জন।

আমরা হোটেল থেকে বের হয়ে একজন পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মেট্রো যোগে আমরা রওয়ানা হলাম প্যারিসে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত ল্যূভ মিউজিয়াম দেখতে, যেখানে মোনালিসা-সহ তাবৎ দুনিয়ার বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম রক্ষিত আছে। মেট্রো আমাদের একেবারে মিউজিয়ামের কাছে নামিয়ে দিল। আমরা মিউজিয়াম ঘুরে দেখলাম। শুধু মিউজিয়াম নয় আশ-পাশও অনেক সুন্দর, যতটুকু সম্ভব ঘুরে দেখলাম। সেখান থেকে বাসে করে আমরা রওয়ানা হলাম প্যারিসের ঐতিহাসিক আইফেল টাওয়ার দেখার জন্য, পথিমধ্যে আমরা দেখতে পেলাম সেই স্থানটি, সাবওয়ে রাস্তায় বৃটেনের রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়না রহস্যজনক এক সড়ক দূর্ঘটানায় নিহত হন। সেখানে তার স্মৃতিস্তম্ভ আছে। তারপর আমরা চলে এলাম আইফেল টাওয়ারের একেবারে কাছে।

আইফেল টাওয়ার এমন এক স্থাপনা যা নিজ চোখে না দেখলে এর সুন্দর‌্য বা এর বিশেষত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আমি যখন এক কি.মি. দূরে অবস্থান করছি তখনও মনে হচ্ছে যে আইফেল টাওয়ার একেবারে আমার মাথার উপর। আমরা টাওয়ারের নিচে কতক্ষণ ঘুরে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম উপরে উঠার। ২৭ ইউরো করে ৫৪ ইউরো দিয়ে আমরা টিকেট কেটে উপরে উঠলাম। উপর থেকে পুরো প্যারিস দেখতে অসাধারণ যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আইফেল টাওয়ারের কাছেই ফ্রান্স জাতীয় পার্লামেন্ট ভবন। আমরা যখন আইফেল টাওয়ারের ওপরে তখন এমদাদ ভাই ফোন করলেন এবং জানালেন যে তিনি নিচে আছেন। উপরে ওঠা-নামার জন্য কিছুপথ পায়ে হাঁটতে হয়, আর বাকী পথ এক্সেলেটর দিয়ে।

আমরা আস্তে আস্তে নিচে নামলাম। নিচে নেমে এমদাদ ভাইয়ে সাথে দেখা হয়, তিনি আমাদেরকে প্যারিস শহরের আরও কিছু এলাকা দেখানোর জন্য নিয়ে চললেন। সেখান থেকে আমরা হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে গেলাম মাদাম মেরীর প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত নটর ডেম ভবন, স্থানীয় অধিবাসীগণ একে উচ্চারণ করেন ‘নর্ত দ্দাম’। এই নটর ডেম-এর নামানুসারে আমাদের বাংলাদেশের ঢাকা ও ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত হয় নটর ডেম কলেজ। ২০২১ সালে এক অগ্নিকাণ্ডে ভবনটি ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। এই নটর ডেম ভবনের সামনের রাস্তার দুপাশ দিয়ে ফুটপাতে আমাদের ঢাকা নীলক্ষেত ও কলকাতার কলেজ স্ট্রিট-এর মত ছোট ছোট বইয়ের দোকান। যদিও আমরা যখন ওখানে গিয়েছি তখন বেশ রাত, তাই দোকানগুলো বন্ধ ছিল।

তারপর সেখান থেকে চলে এলাম প্যারিসের বাংলাপাড়া বলে খ্যাত একটা এলাকায়, এমদাদ ভাই আমাদেরকে নিয়ে তিনি একটি বাঙালি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলেন, রেস্টুরেন্টের মালিক কর্মচারী সবাই বাংলাদেশের চট্টগ্রামের লোক। প্যারিসের রাস্তায় আরও একটা বিষয় চোখে পরলো, আর সেটা হল রাস্তার ফুটপাতে অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুরা বিছানা বিছিয়ে শুয়ে আছে। এসব মানুষ সিরিয়া, ফিলিস্তিনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার অধিবাসী। যদিও কিছু কিছু রুমানিয়ানও রয়েছে। এদেরকে ফ্রান্স সরকার তাড়িয়ে দেয় না।

এ দিক থেকে ফ্রান্স একটা মানবিক দেশও বটে। এমদাদ ভাই আমাদের সম্মানে রাতের ডিনারের আয়োজন করেছেন। আমরা দেশি খাবার খেলাম, খাবার খেয়ে আমরা চলে গেলাম প্যারিস কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে । ঘড়ির কাটা তখন প্রায় বারো ছুঁই ছুঁই। রেলস্টেশন দেখে কাছেই এক মেট্রো স্টেশন থেকে মেট্রো দিয়ে আমরা আমাদের হোটেলের কাছে চলে আসলাম। প্যারিসে রাত বারোটার পরও মেট্রো চলাচল করে। তবে প্যারিস সারা রাতই জেগে থাকে। কিন্তু আমাদের আগামীকাল সকালে গাল্ফ এয়ার যোগে দেশের পথে ফ্লাইট।

- Advertisement -

Read More

Recent