বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

আমার ইউরোপ ভ্রমণ : এডিনবার্গ থেকে ভেনিস : পর্ব ৫

১০-১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ : বইমেলা ও লন্ডন শহর দেখা

- Advertisement -

লিডস্ থেকে সকাল ৭টার ট্রেনে চড়ে লন্ডনের কিংক্রস স্টেশনে এসে নামলাম সকাল ৯টায়। সেখান থেকে মেট্রো যোগে সাউথ হ্যারো মেট্রোস্টেশনে এসে পৌঁছালাম সকাল দশটা নাগাদ। মেট্রোস্টেশন থেকে হোটেল কাছেই। স্কটল্যান্ড যাওয়ার আগে এ হোটেলেই আমাদের অন্যান্য লাগেজগুলো রেখে গিয়েছিলাম।

এ হোটেলের কাছেই থাকেন সুনামগঞ্জের সোলায়মান ভাই। তিনি সজল ভাইয়ের পূর্ব পরিচিত। খুবই ভালো মানুষ, সহজে কাউকে আপন করে নেন, মজা করে কথা বলেন। লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটির রাজনীতির সাথে জড়িত, দেশের সব খবরাখবর রাখেন. প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি এখানে থাকেন। তিনি তাঁর গাড়ি দিয়ে নিজে ড্রাইভ করে আমাদেরকে হোটেল থেকে ইস্ট লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় যেখানে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানে নিয়ে গেলেন। সজল ভাইকে মেলায় রেখে আমি চলে গেলাম ইস্ট লন্ডন শহরটা ঘুরে দেখার জন্য।

আমি লন্ডন বইমেলায় যাচ্ছি শুনে সাহিত্যিক কাজী এনায়েত হোসেন লন্ডনে বসবাসরত তাঁর ছেলে ও মেয়ে আগেই আমার ব্যাপারে ফোন করে বলেছিলেন। তাই উনার মেয়ের স্বামী কামরুজ্জামান রুপক ও ছেলে কাজী সায়মন হোসেন ইতোমধ্যে মেলার গেইটে এসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। উনাদের দেখে খুব সহজেই আমরা নিজেদের মধ্যে পরিচিত হয়ে গেলাম। উনারা দুজনই খুবই অমায়িক ও ভদ্র মানুষ। লন্ডনের মত শহরে শত ব্যবস্থার মাঝেও আমাকে সময় দেওয়ার জন্য তারা দুজন চলে এসেছেন। উনাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।

আর কথা না বাড়িয়ে উনাদের সাথে বেরিয়ে পড়লাম লন্ডন শহর দেখতে। যেহেতু গাড়ি পার্কিং খুবই সমস্যা তাই কতটুকু গাড়ি দিয়ে যাওয়ার পর অনেক চেষ্টা করে একটা যায়গা বের করে গাড়ি পার্কিং করা হলো। তারপর পায়ে হেঁটে চললাম। যতই সামনে এগেুচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় মেট্রো স্টেশনের নাম বাংলায় লেখা “হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশন”। বিলেতে ইংরেজি বাবুদের দেশে একটা সরকারি রেল স্টেশনের নাম বাংলায় লেখা! তার সামনেই সুউচ্চ ভবন লন্ডন জামে মসজিদ। আরও কিছুদূর এগুতে দেখি একটি পার্ক, পার্কের এক কোণায় অবস্থিত ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের আদলে নির্মিত একটি শহিদ মিনার।

দেখে তো মনে হলো আমি বুঝি ঢাকায় ফিরে আসলাম। পার্কটির নামও একজন বাঙালির নামে- ‘শহিদ আলতাব আলী পার্ক’। এটি টাওয়ার হেমলেট এলাকা, এ এলাকার মেয়রও একজন বাঙালি, নাম লুৎফর রহমান। যদিও লন্ডন শহরের মেয়র পাকিস্তানী বংশ্দভূত সাদিক আহসান। এরপর গেলাম লন্ডনের বাংলা টাউন এলাকায়, ঐ এলাকায় ঢুকতেই দেখি আমাদের বাংলাদেশের মত রাস্তার ওপরে তোরণ বানিয়ে লেখা হয়েছে ‘বাংলা টাউন’। তারপর শহরের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে লন্ডন আইচ দেখে পৌঁছে গেলাম আমার কাছে আকর্ষণীয় ও লন্ডন বলতে যে প্রতীকটি সবার আগে সামনে আসে সেই লন্ডন ব্রিজ এখানে যার নাম ‘টাওয়ার ব্রিজ’।

এটি ব্রিটিশদের একটি ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ট্যামস নদীর ওপর নির্মিত এ ব্রিজটি না দেখে কল্পনায় আনা সম্ভব নয়। ব্রিজের মাঝখানের অংশটির স্লাব প্রতিদিন একবার বা দুইবার আস্তে আস্তে ওপরের দিকে সরে গিয়ে দুই পাশে শুন্যে খাড়া হয়ে যায়। তখন মাঝখান দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য! এরপর সায়মন ভাই ও রূপক ভাই আমাকে নিয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তা হয়ে চলে এলেন আবার সেই হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় একটি আফগানিস্তান রেস্টুরেন্টে। অর্ডার করলেন বাহারি ধরনের খাবার. খাবার খেয়ে চলে এলাম যাওয়ার সময় যেখানে গাড়ি পার্কিং করেছিলেন সেই যায়গায়।

এতক্ষণ শুধু পায়ে হেঁটেই চলেছি, সুতারাং আমরা যারা বিদেশ ভ্রমণে আগ্রহী তাদেরকে অবশ্যই হাটার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। এতক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, উনারা আমাকে মেলার কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে গেছেন। আমি বইমেলায় ঢুকবো এমন সময় মাগরিবের আজান চলছে, লন্ডন শহরে ফজর ব্যতিত বাকি সময়ে মাইকে আজান চলে। আমি মেলায় প্রবেশ না করে মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য চলে গেলাম ইস্ট লন্ডন মসজিদে। মসজিদে বেশ কয়েকজন সিলেটি লোকের সাথে পরিচয় হল।

এরপর বইমেলায় যোগ দিলাম, মেলায় প্রবেশ করতেই প্রথমে দেখা হয়ে গেল অন্যন্যার মনির ভাইয়ের সাথে, কথা হলো কিছুক্ষণ- কোথায় গেলাম, কি দেখলাম ইত্যাদি নানা আলোচনা। এবারের বইমেলায় এসেছেন বাংলাদেশ থেকে ৭/৮জন প্রকাশক এসেছেন। অনান্যের মাঝে ফরিদ ভাই, অন্তর ভাই, রহমত ভাই, ইফতেখার ভাই, শফিক ভাই, শাওন ভাই এবং সজল ভাই তো আছেনই। এখানে বলে রাখা ভালো লন্ডন বইমেলা আর ভিন দেশে অনুষ্ঠিত অন্যান্য বইমেলা একরকম নয়। যেমন এখানে লন্ডন বইমেলায় প্রবাসী বাংলাদেশী কবি-সাহিত্যিক ও কিছু সাধারণ পাঠক, আর কলকাতা বাংলাদেশ বইমেলায় অংশগ্রহণকারী সকল প্রকাশক বাংলাদেশী কিন্তু পাঠক পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষাবাসি ।

আবার দুবাই বইমেলায় ১৫/২০ জন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রকাশক ছাড়াও দুবাই প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামগ্রীর স্টলও থাকে। এখানে আগন্তুক ব্যক্তিগণ সাধারণত দুবাইয়ে কর্মজীবী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারী ব্যবসায়ী এবং তাদের পরিবারের সদস্যগণ। কলকাতা বইমেলা ১০দিন ব্যাপি হলেও প্রবাসের অন্যন্য মেলাগুলো সাধারণত দুইদিন ব্যাপি হয়। এসব ক্ষেত্রে শুধু কলকাতার পাঠকগণ ভেবে চিন্তে বাছাই করে তার প্রয়োজনীয় বইটি ক্রয় করে। আর অন্য বইমেলাগুলোতে পাঠক সাধারণত খুব ভেবে বই কিনে না, মেলায় এসেছে একটা বই কেনা দরকার তাই কেনে। যাক, বইমেলা শেষে সজল ভাই ও আমি মেট্রো যোগে রাত দশটার পরে সাউথ হ্যারোতে ‘Eurotravell Hotel’-এ পৌঁছলাম।

এত অল্প সময়ে লন্ডন শহরের তেমন বেশি কিছু দেখা সম্ভব নয়। তবু আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে তাও আমার জন্য অনেক। আমি আগে ঢাকা থেকে কারও সাথে যোগাযোগ করে আসতে পারিনি। ১১ তারি বিকাল বেলায় সৌদি আরব থেকে আমাদের গ্রামের বকুল ভাই মেসেঞ্জারে ফোন করে আমার লন্ডন আসার খোঁজ-খবর নিলেন এবং জানতে চাইলে মমিন লন্ডন আছে তার সাথে যোগাযোগ হয়েছে কি না? মমিন আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু, আমারও অতন্ত ঘনিষ্ঠ ।

আমাদের পাশের গ্রামেই বাড়ি, কিন্ত সে কোথায় থাকে তা আমি জানতাম না। তাই বকুল ভাই মমিনকে ফোন করে বলেছেন আমার কথা, শুনেই কিছুক্ষণ পর মমিন আমার হোয়াটস অ্যাপে কল করে। আমি আগামীকালই লন্ডন ছেড়ে চলে যাচ্ছি শুনে খুব আফসোস করলো। আমার সাথে দেখা করার তার খুব ইচ্ছা ছিল।

- Advertisement -

Read More

Recent