বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

আমার ইউরোপ ভ্রমণ : পর্ব ৬

আমার ইউরোপ ভ্রমণ

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ : স্টকহোম, সুইডেন যাত্রা
আগের দিন রাতেই লাগেজ গুছিয়ে রেখেছিলাম। তাই সকাল ৬টায় হোটেল থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। এবার আর হিথ্রু বিমানবন্দর নয়, লন্ডন শহরের চারদিকে চারটি এয়ারপোর্ট রয়েছে, এগুলো হলো- Heathrow Airport, London City Airport, London Gatwick Airport & London Stansted Airport. আমরা যাবো London Gatwick Airport দিয়ে। তাই Gatwick Airport উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। গত কয়েকদিন লন্ডনের যেদিকে আমরা ঘুরে দেখেছি এবার অন্য দিক দিয়ে যাচ্ছি, রাস্তার দু’পাশ দিয়ে সারি সারি গাছ, সবুজ আর সবুজ কি অপূর্ব দৃশ্য !

ঢাকা থেকে আমরা লন্ডন এসেছি গাল্ফ এয়ারলাইন্সে। কিন্তু ইউরোপের বাকি ছয়টি দেশ ভ্রমণ করেছি Norwegian Airlines & Easyjet Airlines-এ। লন্ডন টু স্টকহোমে ছিল Norwegian Airlines। যাক লন্ডন থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় আমরা সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে পৌঁছলাম।

- Advertisement -

তারপর যথারীতি ইমিগ্রেশনের জন্য লাইন, তবে লন্ডনের মত এত বড় নয়, ৩০/৪০ মিনিটেই লাইন শেষ। কিন্তু স্টকহোম এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে আমাদের এক অভাবনীয় দুর্ভোগের শিকার হতে হলো। শুধুমাত্র ভাষাগত সমস্যার কারণে এ দুর্ভোগ। আমি আর সজল একই সময়ে পাশাপাশি দুইজন অফিসারের সামনে দাঁড়িয়েছি, আমাদের কাগজপত্র দেখা প্রায় শেষ শুধু পাসপোর্টে এন্ট্রি সিল মারবে, ঠিক এমন সময় আমার সামনে যে মহিলা অফিসার তিনি জানতে চাইলেন আমি কবে ফিরবো? উনাদের ইংরেজি বলার ধরন আমাদের মত নয়, তাই বাইরের অন্যান্য দেশের মানুষের উনাদের ইংরেজি বুঝতে একটু অসুবিধা হয়, আমি যে ফ্রান্স থেকে ঢাকা ফিরবো তার যে রিটার্ন টিকেট সেটা বললাম এবং দেখালাম।

ঠিক একই সময়ে পাশের অফিসারের প্রশ্নের উত্তরে সজল ভাইও বলেছেন যে আমি ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ঢাকা ফিরবো। এই কথাটি আমার সামনের অফিসার শুনেছেন, তাই তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কি দুইজন একসাথে? আমি হ্যাঁ সূচক উত্তর দেই। সাথে সাথে তিনি পাশের অফিসারকে বিষয়টি জানালেন এবং দুইজন কি যে শলাপরামর্শ করলেন এবং পাসপোর্টে আর এন্ট্রি সিল মারলেন না বরং বললেন তোমরা দু’জন পাশের চেয়ারে বসো। এই বলে দইজনের পাসপোর্ট একসাথে একটি ছোট ব্যাগে নিয়ে মহিলা অফিসারটি কোথায় যেন চলে গেলেন।

আমরা দু’জন চেয়ারে বসে রইলাম আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলাম কি কারণে আমাদেরকে বসতে বললেন। আমি প্রথমবার সুইডেন আসলেও সজল ভাই কিন্তু এর আগে আরও দু’বার সুইডেন এসেছেন। আমি ইউরোপ ভ্রমণে সজল ভাইয়ের সঙ্গি হওয়ার পিছনে উনার অন্যান্য গুণাবলির পাশাপাশি তিনি যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এক বা একাধিকবার এসেছেন সেটিও একটি কারণ। বেশ কতক্ষণ বসে থাকার পর কালো পোশাক পরা সুঠামদেহী চারজন অফিসার আসলেন এবং আমাদেরকে পাশেই একটি বেষ্টনির মধ্যে নিয়ে গেলেন।

একজন অফিসার বাকি তিনজনের পরিচয় তুলে ধরে বলছেন উনার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তোমাদেরকে উনারা প্রশ্ন করবেন তোমরা কি আমাদেরকে সহযোগিতা করবে? আমরা আগ্রহের সহিত হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে তারা প্রশ্ন শুরু করেন। প্রথমেই আমাদের দুইজনকে জিজ্ঞাসা করেন তোমরা একসাথে? আমরা একসাতে ইয়েস বলি। তারপর সজল ভাইকে প্রশ্ন করেন তাহলে তুমি ইমিগ্রেশন অফিসারকে কেন বলেছো যে তুমি একা? সজল ভাই বলেন না তো, আমি তো এ কথা বলি নাই, তাহলে আমাদের অফিসার কি মিথ্যা বলেছে! সজল ভাই যতই বলছে উনার মানতে চাচ্ছে না। তারা আমাদের কারেন্সি, ক্রেডিট কার্ড দেখতে চাইলে আমরা দেখাই। আরও কিছু প্রশ্ন করে সন্তুষ্ট না হতে পেরে সবাই বসতে বলে চলে গেলেন।

প্রায় এক ঘণ্টা পর একজন অফিসার এসে শুধু আমাকে তার সাথে যেতে বললেন, আমি গেলাম। টার্মিনালের ভবনে দোতলায় অনেক সরু গলিপথ ধরে হেঁটে একটি কক্ষে বসালেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা নিজস্ব ভাষা কি বাংলা? আমি বললাম হ্যাঁ। কিছুক্ষণ পর একটি টেলিফোন সেট টেবিলে রেখে রাউড স্পিকার দিয়ে বাংলা এবং সুইডিস ভাষা জানেন এমন একজনের সাথে যোগাযোগ করলেন। লোকটি একজন বাঙালি, অনর্গল সুইডিস ভাষা বলতে পারেন। অফিসারগণ যেভাবে উনাকে আদেশ করেন তিনি সেভাবে প্রশ্ন করেন।

আমাকে গতানুগতিক আগের প্রশ্নগুলোর সাথে নতুন যে প্রশ্নটি সেটি হলো আমি ইউরোপে সাতটি হোটেল বুকিং করেছি কিন্তু কেন ইটালিতে হোটেল বুকিং করিনি? অথচ ইটালির ভেনিসের টিকেট কাটা আছে। আমি বললাম ইটালিতে আমার কয়েকজন বড়ভাই এবং ছোট ভাই থাকেন, তারাই আমার থাকার ব্যবস্থা করবেন, তাই হোটেল বুকিং করিনি। আমি ঢাকা থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগেই মিল্টন, মাহবুব ও লিংকন আমাকে বলেছে আমি যেন ইউরোপ ঘুরে অবশ্যই ইটালি যাই। আমাকে আর বেশি কিছু জিজ্ঞাসা না করে পূর্বের স্থানেই আবার নিয়ে আসলেন, আসার সময় বলে রাখলেন আমার সাথে কি কথা হয়েছে আমি যেন আমার সঙ্গি সজল ভাইকে কিছুই না বলি। আমাকে রেখে এবার সজল ভাইকে নিয়ে গেলেন।

সজল ভাইকেও যথারীতি আগের প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি জানতে চাইলেন আমরা কেন ট্রাভেল প্ল্যান পরিবর্তন করেছি। ট্রাভেল প্ল্যান পরিবর্তন বলতে আমরা যখন ঢাকায় ভিসার জন্য আবেদন করি তখন অনুমান নির্ভর ৪/৫টি দেশ ভ্রমণের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এখনে কেন ৭/৮টি দেশ ভ্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি? আর দু’জন একসাথে থাকার পরও কেন তিনি একা এসেছি বলেছেন? ব্যাপক আলোচনার পর আসল ভুলটা জানা গেল, সেটি হলো- সজল ভাইকে ইমিগ্রেশন অফিসার জিজ্ঞাস করেছিলেন ‘আর ইউ এ্যালোন?’ অর্থাৎ তুমি কি একা? সজল ভাই শুনলেন- ‘হ্যাভ ইউ এ্যালাউন্স?’ তাই উত্তরে বলেছিলেন- ‘হ্যা’ অর্থাৎ আমার কাছে প্রয়োজনীয় এ্যালাউন্স বা অর্থ আছে।

এই একটা শব্দের কারণে যতসব ঝামেলা হয়ে গেল। যাক আরও কিছুক্ষণ পর একজন অফিসার এসে সমস্ত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং সুইডেনে স্বাগত জানালেন। তিনি নিজে ইমিগ্রেশন অফিসারের নিকট আমাদেরকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে পাসপোর্টে এন্ট্রি সিল মেয়ে আবারও স্বাগত জানিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে যেতে সহযোগিতা করলেন।

- Advertisement -

Read More

Recent