বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

এডিনবার্গ থেকে ভেনিস : পর্ব ০৭

অবশেষে বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের মাটিতে পা রাখলাম

১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ : স্টকহোম, সুইডেন ভ্রমণ

এদিকে এতক্ষণ যাবৎ আমাদের কোনো খবর না পেয়ে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মেয়ে মিতুল তার স্বামী অনলাইনে খবর নিয়ে জানতে পারে যে আমাদের নির্ধারিত ফ্লাইট সঠিক সময়েই এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছে, তবু ফোনে আমাদেরকে পাচ্চে না। এ খবর জেনে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা জাহাঙ্গীর ভাই আমার মেসেঞ্জারে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। কিন্তু ইমিগ্রেশন ক্রস না করে আমরা WiFi কানেক্ট করতে পারছিলাম না। আর অন্যদিকে রনি ভাই নিজের অফিস থেকে আগাম ছুটি নিয়ে আগে থেকেই গাড়ি নিয়ে এরাইভেল গেইটের বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রনি ভাই বেশ কয়েক বছর হলো তিনি সুইডেন থাকেন। গতবছর সজলভাই যখন সুইডেন এসেছিলেন তখন রনি ভাই তাকে গাইড করছিলেন।

- Advertisement -

যাক, অবশেষে বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের মাটিতে পা রাখলাম। শীতপ্রধান দেশ সুইডেন পৃথিবীময় পরিচিত একটি বিষেশ কারণে, সেটি হল আলফ্রেড নোবেল, যিনি ডিনামাইট আবিস্কার করেছিলেন। যার নামে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম-এর সিটি হল থেকে প্রতি বছর শান্তি ছাড়া বাকী সব বিষয়ে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। সুইডেন একটি শান্তিপ্রিয় দেশ, তারা সর্বশেষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ১৮১৪ সালে। সুইডেনে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রচলিত। আইনসভার নাম রিডবার্গ, চার বছর পর পর আইনসভার নির্বাচন হয়। সুইডেনের জনপ্রিয় খেলা ফুটবল এবং আইস হকি। সুইডেনের মুদ্রার নাম সুইডিস ক্রোনা। যদিও তার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য তথাপি তারা ইউরো ব্যবহার করে না।

সুইডেনের নাগরিকরা খুব কম কথা বলেন, তারা সাধারণত হাই এবং বাই ছাড়া তেমন কোনো কথা বলেন না। এখানে বছরে ১০০দিন জন্য ডুবে না। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম শহরটি বাল্টিক সাগরের ছোট-বড় ১৪টি দ্বীপ এবং ৫৭টি সেতুর সমন্বয়ে গঠিত। সুইডেনে মাতৃকালিন ছুটি ১৬ মাস, সন্তান জন্মের আগে ৮ মাস এবং পরে ৮ মাস। তাছাড়া সন্তান লালন-পালনের জন্য স্বামীরা সমান সুযোগ পান। সুইডেনের আবাদি জমির পরিমাণ খুবই কম, সমগ্র দেশ পাথরে আবৃত। অল্প কিছু আবাদযোগ্য জমি আছে যেখানে গম, বার্লি, তৈলবীজ, আলূ ইত্যাদি চাষ করা হয়। সুইডেনের মোট আয়তন ৪ লক্ষ ৫০ হাজার ২৯৫ বর্গ কি.মি. এবং মোট জনসংখ্যা ১ কোটি। অধিবাসীদের বেশিরভাগ খ্রিস্টান। সুইডেন দেশটি খুবই সুন্দর, দেশটি চার পাশ সাগর বেষ্টিত। সুইডেনে কোনো আবর্জনা পাওয়া যাবে না। তারা রিসাইক্লিয়ের জন্য বিদেশ থেকে বর্জ্য আমদানী করে। এখানে পড়াশুনা সম্পূর্ণ ফ্রি।

সুইডেনের মাটিতে পা রেখে রনি ভাইয়ের সাথেই আমার প্রথম পরিচয়। পার্কিং সমস্যার কারণে আমরা দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লাম। রনি ভাই গাড়ি ড্রাইভ করে আমাদেরকে হোটেলের দিকে নিয়ে চললেন। গাড়ি চলছে, প্রতিটা দেশ-শহর-অঞ্চল যেহেতু আমার কাছের নতুন তাই আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টকহোম শহর দেখছি। ছাত্রজীবন থেকেই জেনেছি সুইডেন একটি সমৃদ্ধশালী দেশ, অনেক ছোট ছোট দ্বীপের সম্বয়ে গড়া এই সুইডেন। তবে ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তা-ঘাট এমনভাবে তৈরি যে বুঝার উপায় নেই অনেকগুলো দ্বীপের সংমিশ্রণে গড়া এই দেশ।

পথিমধ্যে তিনি আমাদেরকে নিয়ে উনার বাসায় ঢুকে গেলেন, বাসায় আছেন উনার স্ত্রী, ৩ মাস বয়সী ছেলে ও বেড়াতে আসা উনার শাশুড়ি। আমরা উনাকে অনুরোধ করেছিলাম বাসায় না বসে আমাদেরকে হোটেলে নিয়ে যেতে, তিনি শুনলেন না, বললেন সারাদিন আপনারা কিছু খাননি, আগে খাওয়া দাওয়া করে নিন। এ বাসায় উঠেছেন মাত্র তিন দিন হয়, আগের বাসা আরও অনেক বড় ছিল, হঠাৎ তাৎক্ষণিক নোটিসে বাসা ছাড়তে হয়েছে। কারণ কোনো একদিন উনার বাসায় মশলা দিয়ে তরকারি রান্না করা হয়েছিল আর সে মশলার গন্ধ উপরতলার সাদা চামরার লোকজনের নাকে লাগে, তাই তারা পুলিশে অভিযোগ করেছে, তাই পুলিশ এসে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসা ছাড়তে বাদ্য করেছে।

প্রায় সাতদিন আগে ঢাকা থেকে যে দেশি খাবার খেয়ে এসেছি এ কয়দিন আর কোনো দেশি খাবারের চেহারা দেখিনি। আজ রনি ভাইয়ের বাসায় সাতদিন পর দেশি খাবার খেয়ে অনেক তৃপ্ত হলাম। যাক খাবার খেয়ে আবার আমরা চললাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। Hotel Dialog, Dialoggatan-1, Stockholm, Sweden. এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব প্রায় ৫০ কি.মি., শহরের অপর প্রান্তে। হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন সবে সন্ধা নামলো, যদিও ঘড়ির সময় ৯টার উপরে। হোটেলের রিসিপসনিস্ট একজন আফগানী। আমরা বাংলাদেশী শুনে তাকে কিছুটা উৎফল্ল মনে হলো। আমাদের মোবাইলের চার্জার সমস্যা সে নিজের চার্জার দিয়ে সমাধান করে দিল। হোটেলের সামনে একটি বড় শপিং মল রয়েছে, যার নাম ‘হিরন সেন্টার’, পাশে একটি ইউনিভার্সিটিও আছে। হোটেলটি দ্বিতলা ভবন, তবে লম্বায় প্রায় পাঁচশত ফুট, হোটেলের পিছনে পাথর বেষ্টিত পাহাড়, এ পাহারে শুধু আছে অনেক উঁচু উঁচু গাছ, এসব গাছের কাঠ না কি অনেক দাম। সারাদিন এতো পরিশ্রম করার পরও রনি ভাই আমাদেরকে নিয়ে আবার বেরিয়ে পরলেন রাতের স্টকহোম দেখানোর জন্য। মোটামুটি যতটুকু দেখা সম্ভব দেখে মধ্য রাতে আবার হোটেলে ফিরে আসলাম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে হোটেলের বুফে নাস্তা সেরে আসেপাশের পায়চারি করতে থাকলাম এমন আমাদেরকে নিতে আসলেন জাহাঙ্গির ভাইয়ের জামাতা মিশুক। তিনি আসলেই একজন মিশুক মানুষ, আগেই বলেছি আমি সুইডেন আসবো জানতে পেরে মিতুল আমাকে দাওয়াত দিয়ে রেখেছে আমি যখনই সুইডেন আসি তার বাসায় যেন উঠি, কোনো হোটেলে না উঠি। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে রাজী করালাম যে আমার সাথে যেহেতু সজল ভাই আছেন আমরা আগে হোটেলে উঠি তারপর একদিন সারাবেলা তোমাদের সাথেই কাটাবো। সেভাবেই সবকিছু ঠিক হলো, তাই সকালেই মিতুলের স্বামী মিশুক গাড়ি নিয়ে আমাদেরকে হোটেল থেকে নিতে আসলো।

আমরা তার সাথে বেরিয়ে পড়লাম, এ দিন স্টকহোম শহরের বেশ কিছু এলাকায় হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম, প্রথমেই গেলাম স্টকহোম সিটি সেন্টারে যেখানে অবস্থিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সারা বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার যেখান থেকে প্রদান করা হয় নেই সিটি হলে। বৃষ্টির মধ্যেই আমরা সিটি হলটি ঘুরে দেখলাম, কিন্তু জানতে পারলাম এখান থেকে সব বিষয়ে অর্থাৎ সাহিত্য, চিকিৎসা, রসায়ন, পদার্থ ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হলেও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে।

যাক, বৃষ্টির মধ্যে যতটুকু সম্ভব ঘুরে চলে গেলাম মিতুলদের বাসায়। মিতুল দুই বছর হয় সুইডেনে এসেছে। তবুও এ অল্প দিনেই তারা সুইডেনের পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে ফেলেছে। সুইডেনে ভাড়া বাসায় থাকা অনেক সমস্যা যেমনটা আমি রনি ভাইয়ের বাসার কথায় ইঙ্গীত করেছি। এ বাসাটা মিতুলদের নিজস্ব, তারা নিয়ম অনুযায়ী কিনে নিয়েছে। মিতুলরা পারিবারিকভাবে শিক্ষা-দিক্ষায় সংস্কৃতিমনা মানুষ, তাই স্টকহোমের বাসাটিও সাজিয়েছে খুব সুন্দর করে, ডুপ্লেক্স বাড়িটি তিনদিকেই খোলামেলা, আছে ফুলের বাগানও।

বিদেশে ঘরের কাজ করার জন্য আলাদা কোনো লোক থাকে না, নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হয়। মিতুল তার ছোট মেয়েকে নিয়ে আমাদের জন্য নানা ধরনের বাহারী খাবার রান্না করেছে। সে একা এত খাবার কিভাবে রান্না করলো তা ভেবে আমরা তো অবাক! সজল ভাই অবশ্য খুব ভোজনরসিক, খাবারগুলো তার পছন্দ হলো। সজল ভাই একজন কবি ও নাট্য নির্মাতা জেনে মিতুল তো অনেক খুশি। ডাইনিং-এ সবাই একসাথে বসে দুপুরের খাবার খেলাম। খাবার শেষ করতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাঙ্গীর ভাই ফোন করলেন, তিনিও অনেক খুশি, কারণ তার মেয়ের বাসায় এখনও তিনি আসতে পারেননি, আমি তার এবং ভাবির একজন স্নেহাষ্পদ ছোট ভাই হিসেবে তার মেয়ের বাসায় এসেছি।

বাসায় অনেকক্ষণ আড্ডা বিকেলে মিতুলদের গাড়িতেই আমরা আবার বেড়িয়ে পড়লাম। এবার আমাদের যোগ দিলেন মিশুক, মিতুল ও তাদের ছোট মেয়েও। তারা আমাদেরকে স্টকহোমের অনেক সুন্দর সুন্দর এলাকা ঘুরিয়ে দেখিয়ে সন্ধায় Hotel Dialog-এ নামিয়ে দিয়ে গেল। এখানে সন্ধা হয় সাড়ে নয়টার দিকে। পরদিন আমাদের নরওয়ে যাত্রা, রাতে আমরা হিরন সেন্টার থেকে কিছু কেনা-কাটা করে হোটেলেই অবস্থান করি।

- Advertisement -

Read More

Recent