বৃহস্পতিবার - এপ্রিল ১৮ - ২০২৪

এডিনবার্গ থেকে ভেনিস : পর্ব-৮

এডিনবার্গ থেকে ভেনিস

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ : নরওয়ের অসলো ভ্রমণ

স্টকহোমের দ্বিতীয় দিনের আনন্দ-উল্লাস, ঘুরা ফেরা সব হয়েছ মিতুলদের পরিবারের সাথে। গতকাল সন্ধায় মিতুলরা আমাদেরকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর একবারে কাছেই একটা শপিং মল নাম ‘হিরন সেন্টার’ সেখান থেকে কিছু কেনা কাটা করে হোটেলে ফিরে রাতে ঘুমিয়ে পরি। সকাল ৭টা চল্লিশে আমাদের ফ্লাইট, নরওয়েজিয়ান এয়ারলাইন্সে স্টকহোম থেকে অসলো। কমপক্ষে দুইঘণ্টা আগে আমাদের এয়ারপোর্টে পোঁছাতে হবে। কীভাবে পৌঁছাবো এখান থেকে এয়ারপোর্টের দূরত্ব প্রায় ৫০ কি.মি.। ঠিক এমন সময় তাত্রার ভূমিকায় আবারও অবতীর্ণ হলেন সেই রনী ভাই। তিনি গাড়ি নিয়ে ভোর চারটায় চলে আসলেন আমাদের হোটেলের সামনে। মাত্র এক ঘণ্টায় আমাদেরকে স্টকহোম এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন তার অফিসে। আবারও কৃতজ্ঞতা রনি ভাইকে।

- Advertisement -

ইউরোপ ভ্রমণে অন্যান্য এয়ারপোর্টের মত এবার আর আমাদেরকে ইমিগ্রেশন করতে হবে না। শুধুমাত্র লাগেজ বুকিং আর সিকিউরিটি চেক করলেই হবে। আন্ত ইউরোপ ভ্রমণে বিমানে লাগেজের অনেক ভাড়া, তাই সাধারণত ইউরোপীয়ান যাত্রীদের বড় লাগেজ ব্যবহার করতে দেখা যায় না। তারা সাধারণত একটা হ্যান্ড লাগেজ ব্যবহার করে। ৭ কেজি ওজনের হ্যান্ড লাগেজের জন্য কোনো ভাড়া লাগে না। কিন্ত আমরা যেহেতু লন্ডন একেবারে ছেড়ে চলে এসেছি, ফিরবো প্যারিস থেকে তাই লাগেজ আমাদের সাথে রাখতেই হচ্ছে, এর জন্য আমাদেরকে বড় রকমের কাফফারাও দিতে হচ্ছে প্রতিটি ফ্লাইটে।

মাত্র ১ঘণ্টা ২০ মিনিটে স্টকহোম থেকে Oslo International Airport, Gardermoen-এ নামলাম। এখন সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি, তারপরও হালকা কনকনে শীত। উবার নিয়ে আমরা যথারীতি চললাম হোটেলের দিকে, এখানেও উবারের চালক একজন পাকিস্তানী। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল যথেষ্ঠ দূর। ইউরোপ ভ্রমণে আমরা যে সকল হোটেল বুকিং করেছি তার মধ্যে অসলোর হোটেলটি একটু আলাদা, কারণ আমরা যখন ঢাকা থেকে বুকিং ডট কমের মাধ্যমে হোটেল বুকিং করছিলাম তখন স্বাভাবিকভাবেই চাচ্ছিলাম তুলনামূলক সহনীয় দামের হোটেল।

কিন্তু অসলোতে যখন হোটেল বুকিং দেই তখন কমদামের সিরিয়ালের মধ্যে রেডিসন ব্লু-ও আছে। আমাদের তো বিশ্বাই হচ্ছে না, পরে দেখলাম যে এটা সীমিত সময়ের জন্য অফার। তাই আর দেরী না করে আমরা রেডিসন ব্লু-ই বুকিং করেছিলাম। অবশ্য অসলোতে বেশ কয়েকটি রেডিসন ব্লু হোটেল আছে। যাক, ১ ঘণ্টায় আমরা হোটেলে পৌঁছলাম। হোটেলটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, খুবই মনোরম পরিবেশ। হোটেল রুমে আগে থেকেই কফি রাখা ছিল, আমরা তা পান করে বেরিয়ে পরলাম। তারপর বেরিয়ে পরলাম শহরের সেন্ট্রালে যাওয়ার জন্য ।

আমরা যখন স্টকহোম এয়ারপোর্টে ছিলাম তখন সজল ভাইয়ের পরিচিত একজন লোক ফোন করলে সজল ভাই জানালেন যে, তিনি ইউরোপ ঘুরতে এসেছেন। তখন তিনি বললেন অসলোতে তার এক ভাগিনা থাকেন তাকে তিনি বলে রাখবেন। তাই আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই তার সাথে যোগাযোগ করলাম। তাঁর নাম আতিকুর রহমান, বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। তিনি আমাদেরকে অসলো কেন্দ্রিয় বাস টার্মিনালে যাওয়ার জন্য বললেন। আমরা গুগুল থেকে জেনে নিলাম কোথা থেকে কীভাবে পাবলিক বাস ধরা যাবে। পাবলিক বাস ধরে আমরা চলে গেলাম অসলো বাস টার্মিনাল।

সেখান থেকে আতিক এগিয়ে এসে আমাদেরকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। উনার বাসায় উনার স্ত্রী, শাশুড়ী ও একটি ছোট বেবী আছে। মাত্র ছয়দিন আগে বেবীটির জন্ম, সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে উনারা যথেষ্ঠ আনন্দে আছেন। উনার স্ত্রীর শারিরিক অসুস্থতা থাকার পরও তিনি আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। আটলান্টিক মহাসাগরের বিভিন্ন ধরনের মাছ ছাড়াও বাহারী আরও অনেক খাবার রান্না করলেন আমাদের জন্য। আমরা খাবার খেয়ে আতিক ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে পরলাম অসলো শহর দেখার জন্য ।

পৃথিবীর অন্যতম একটি সুখী দেশ এই নরওয়ে। এই দেশটি বছরের প্রায় আট মাস বরফে ঢাকা থাকে। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত দেশটিতে জনসংখ্যা খুবেই কম। দেশটির রাজধানী অসলো, খুবই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন শহর অসলো। নরওয়ে স্কান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের তথা ইউরোপের শেষ প্রান্তের দেশ। এখানে বছরে দুইমাস সুর্য ডুবে না এবয় দুইমাস সূর্য উদয় হয় না, অন্ধকার থাকে। এখানে মুসলমান জনসাধরণ ২৩ঘন্টা পর্যন্ত রোজা রাখেন। এই দেশের একটি শহরের মানুষ মারা যাওয়া আইনত অপরাধ, এখানে কোনো সাধারণত কেউ মারা যান না, যদি কেউ এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন যে একেবারে মুমুর্ষ অবস্থা, তখন তাকে এ শহর থেকে সরিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এর পিছনে একটি কারণও আছে, এখানে কোনো মাটি নেই যে মানুষ মারা গেলে তাঁকে সমাহিত করবে। পুরো শহর বরফে আচ্ছাদিত থাকে। নরওয়েতে সাধারণত কোনো মারামারি হানাহানি নেই। অপরাধ প্রবণতাও কম, যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কারণে কারও জেল হয়, তাহলে সে আরও আরামে থাকে। কারণ, নরওয়ের জেলখানার অবস্থা যে কোনো একটা ফাইভস্টার হোটলের মত। এখানে ওয়াইফাই কানেকশন, এনড্রয়েট টিভি, মোবাইল, চা-কফিসহ নানাবিধ ব্যবস্থা আছে। এককথায় অসলো একটি অপূর্ব শহর, বলা হয়ে থাকে নরওয়ে শহর যত সুন্দর তার মাত্র ১০% সুন্দর হলো অসলো শহর।

এবার একবার ভাবুন পুরো নরওয়ে শহরটা কত সুন্দর। এদেশে থাকার জন্য কৃষি কাজের জন্য সিজনাল ভিসার ব্যবস্থা আছে, তবে বাংলাদেশীদের জন্য নিষেধ আছে। এ সুযোগ পায় ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ কয়েকটি দেশ। বাংলাদেশীরা এক সময় এ সুযোগ পেত, কিন্তু তারা এ সুযোগের অপব্যবহার করেছে, সিজনাল ভিসার নিয়ম হল- ভিসার মেয়াদকাল ছয়মাস পেরুলে দেশ ছাড়তে হবে এবং আবার ভিসা নিয়ে আসতে পারবে, কিন্তু বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো তারা একবার নরওয়ে আসলে আর ফিরে যায় না, তারা অবৈধভাবে থেকে যায়।

আতিক ভাই আমাদেরকে নিয়ে গেলেন অসলো সেন্ট্রালে অবস্থিত অপেরা হাউসে। সেখানে প্রথমেই আমরা প্রবেশ করলাম বিশাল আকারের অসলো কেন্দ্রীয় পাঠাগারে। পাঠাগারটি এমন যে, তৃতীয় তলার পাঠাগার থেকে টপ ফ্লোর পর‌্যন্ত মাঝখানে ফাঁকা, বই পড়ার অনুকুল পরিবেশ বিরাজমান। পাঠাগারে শুনশান নিরবতা, যারা পাঠাগারের ভেতরে আছেন বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। আমরা পুরো পাঠাগার ঘুরে দেখলাম, বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত বই এখানে আছে, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইও আছে। আছে ইসলাম ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বই।

তারপর আমরা শহর ঘুরতে ঘুরতে গেলাম নরওয়ে ন্যাশনাল পার্লামেন্ট ভবনে। নিরাপত্তার তেমন কোনো বিধি-নিষেধ নেই, আমরা খুব সহজেই ভবনের কাছে গেলাম, ছবি তুললাম। নরওয়ে দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, রাজা হলেন নরওয়ের রাষ্ট্র প্রধান। প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংসদ নির্বাচন হয়, দুটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, দল দুটির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নেই কোনো হানাহানি , মত প্রকাশের স্বাধীনতা খুবই প্রাধান্য পায় এখানে। আমরা পার্লামেন্ট ভবন দেখে সামনে এগুচ্ছিলাম এমনসময় দেখলাম অল্প কয়েকজন লোক একটি ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে, একজন হ্যান্ড মাইকে বক্তব্য দিচ্ছেন।

সামনে সাংবাদিক ছবি তুলছেন, এটাই নাকি প্রতিবাদের জন্য যথেষ্ঠ। সামনে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে গেলাম রাজার বাড়ি। রাজার বাড়ির কাছে গিয়ে দেখি কতকগুলো তরুণ-তরুণি ছবি তুলছেন, একজন আমাকে অনুরোধ করলেন তাদের একটা গ্রুপ ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। ক্যামেরা ফেরৎ দেওয়ার সময় একজন আমাকে ‘কামছাম মিধা’ বলল। তখন আমি বুঝলাম এরা জাপানীজ। রাজার বাড়িতে তেমন কোনো নিরাপত্তার বিধি-নিষেধ নাই। কয়েকজন প্রহরি তরবারি হাতে নিয়ে নাক বরাবর ওপরদিকে সোজা করে ধরে রেখে ভবনের সামনে দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশ বীরদর্পে আসা-যাওয়া করছে।

রাজার বাড়ি থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে গেলাম যেখান থেকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রধান করা হয় সেই ‘Noble peach center’-এ। ২০০৬ সালে এখান থেকেই একমাত্র বাংলাদেশী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও গ্রামীন ব্যাংকের পক্ষে গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন মহিলা নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। এ মূহুর্তে পিস সেন্টারের কিছু সংস্কার কাজ চলছে, আমরা সামনে থেকে ছবি তুলে চলে গেলাম আটলান্টিক সাগর থেকে লেকের পার। লেকের পানিতে ভাসমান জাহাজগুলোতে হোটেল আছে। এগুলো ঘুরে দেখছিলাম, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে আমার পায়ে ব্যথা ধরেছে আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না। অথচ সারাদিন রোজা রেখেও আতিক ভাইয়ের যেন কোনো ক্লান্তি নেই।

তিনি আজ নফল রোজা রেখেছেন, তবুও আমাদেরকে সময় দিচ্ছেন। এখান থেকে ঘুরে দেখতে দেখতে আমরা চলে গেলাম অসলো সেন্ট্রাল রেলস্টেশনে, রেলস্টেশন তো নয় যেন পূর্ব এশিয়ার কোনো বিমানবন্দর! এখান থেকে চলে গেলাম সিটি সেন্টারে। ততক্ষণে ইফতারের সময় হয়ে গেছে, ঘরির কাটা তখন রাত সাড়ে দশটা, সূর্য তখন মাত্র ডুবতে যাচ্ছে। আতিক ভাই ইফতার করবেন, একটি ফার্স্টফুডের দোকানে গেলেন, ঐ দোকানের মালিক মকবুল ভাই গাজীপুরের টঙ্গির মানুষ, অনেক বছর ধরে তিনি নরওয়ে থাকেন, একজন স্টাফ নিয়ে নিজেই দোকান পরিচালনা করেন। আমার জেলার মানুষ হওয়ায় আলাদা খাতির পেলাপ। মকবুল ভাইয়ের সাথে দেশের নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা হলো। এরমধ্যে আতিক ভাই ইফতার সারলেন, আমরাও তার সাথে নাস্তা করলাম।

এমন সময় মকবুল ভাইয়ের দোকানে প্রবেশ করলেন একজন উবার চালক, তিনিও বাংলাদেশি, বাড়ি ভোলা, নাম বাবু ভাই। ততক্ষণে রাত বারোটা বেজে গেছে, আগামীকাল সকাল সারে সাতটায় আমাদের ডেনমার্কের কোপেনহেগেনগামী ফ্লাইট, আতিক ভাই বাবু ভাইকে বলে দিলেন আমাদেরকে যেন এখন আলনাস্থ হোটেল রেডিসন ব্লু-তে পৌঁছে দেন। আতিক ভাই ও মকবুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা বাবু ভাইয়ের সাথে হোটেলের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। গাড়ীতে বসে বাবু ভাইয়ের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল ভোর চারটায় বাবু ভাই আবার হোটেলে এসে আমাদেরকে নিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবেন। আতিক ভাইয়ের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ধন্যবাদ মকবুল ভাই ও বাবু ভাইকে।

- Advertisement -

Read More

Recent