শুক্রবার - মে ২৪ - ২০২৪

পলিন

শাদাব তুশমিকে সাথে নিয়ে মিষ্টি কিনতে গিয়েছিল

শাদাব, তুশমিকে সাথে নিয়ে মিষ্টি কিনতে গিয়েছিল। ফিরে এলো খুব তাড়াতাড়িই। পলিনের ডায়েরিটা চট লুকিয়ে ফেলল নওমিকা।

তুশমি একটা আইসক্রিমের কোণ নওমিকার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

- Advertisement -

— তোমার ফেভারিট চকলেট আইসক্রিম। পাপা ভ্যানিলা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তুমি ভ্যানিলা খাও না। স্ট্রবেরিও খাও না। তাই না মামমা? পাপা কিছু জানে না। আমি ভ্যানিলা খাই, চকলেটও খাই। তুমি খুব চুজি। তুশমি সব খায়। তুশমি ইজ আ গুড গার্ল। তাই না পাপা?

শাদাব মেয়েকে পাশে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিলো। ওই সিটটা তুশমির। নওমিকার জায়গা পেছনে।

নওমিকা বলল,

— এটাও তুমি খাও তুশমি। মামমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

— অল্প একটু খাও? মাম্মা একটু খাবে, পাপা একটু খাবে, তুশমি অল্প খাবে। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং! খাও মাম্মা, প্লিজ! পাপা আগে তুমি।

তুশমি শাদাবের দিকে আইসক্রিম কোণটা বাড়িয়ে দিলো। ও অল্প করে কামড় বসালো। ও আইসক্রিম পছন্দ করে না। তুশমি দিলো বলে খেলো। তুশমির কোনো কিছুতে ‘না’ কথাটা শাদাবের মুখ থেকে বের হয় না। আত্মজার জন্য সব করতে পারে ও।
তখন চেইন স্মোকার ছিল ও। দিনে দুই প্যাকেট বেনসন লাগত। ফিল্টারের তাপে ঠোঁট পুড়ে কালচে হয়ে উঠেছিল। ওর পৃথিবী ছিল ধোঁয়াময়। তামাকপোড়া গন্ধের রাজ্যে ওর একান্ত আবাস ছিল।

নওমিকার বিয়ের পরের বছরেই চিকেন পক্স হলো শাদাবের। সাত দিন একদম বিছানা ধরা হয়ে পড়ে রইল। দিন নেই রাত নেই সেবা করল নওমিকা। পনেরো দিন পরে সুস্থ হল শাদাব। ডাবের পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে, নিম-হলুদ জ্বাল করা পানি দিয়ে গোসল করেছিল। ঝরঝরে হয়েই বিপ্লবকে ফোন করেছিল,

— গাল মিষ্টি হয়ে আছে৷ দুই প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আয়!

নওমিকা একটু রোষের সাথে বলেছিল,

— ওসব আজেবাজে জিনিস বাদ দেওয়া যায় না? পনেরো দিন যখন পেরেছ, সিগারেট দরকার হয়নি, এখন চাইলে ঠিক নেশাটা ছেড়ে যাবে।

শাদাব ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে ছিল স্ত্রীর দিকে। চোখে রাগ আর ভর্ৎসনা! মুখে কোনো শব্দ না করলেও সেই ভয়ংকর দৃষ্টির সামনে নওমিকার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। ও আর কোনোদিন সিগারেট খাওয়া না খাওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেনি।
ক্রনিক কাশিতে ভুগলেও শাদাবকে কখনো ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার কথা কেউ সাহস করে মুখে আনতে পারেনি।

শাদাবের বাবা-মায়ের সাথে সব ঝামেলা চুকেবুকে গেছে তখন৷ তুশমি এসেছে কোলভরে।

সপ্তাহের এ মাথায় আর ও মাথায় দাদা-দাদি তাদের নাতনিকে দেখতে আসেন। নিজেদের বাড়িতেই পুত্র-পুত্রবধূ, নাতনিকে নিয়ে যেতে অনেক অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শাদাবের জেদের কারণে হয়নি। ও আর বাড়িতে ফিরবে না।

তখন তুশমির বয়স তিন মাস৷ শাদাব অফিস থেকে ফিরে মেয়েকে আদর করেছে। বুকের ভেতর মিশিয়ে রেখেছে ছোট্ট তুশমিকে। গালে গাল লাগিয়ে গভীরে স্পর্শ নিয়েছে। তারপর ছোট্টো দুটো ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে আদর করে দিতেই, তুশমি খুক খুক করে দুটো কাশি দিলো। শাদাবের মা চিৎকার করে উঠলেন,

— তোর হইছে যক্ষা। মেয়েরেও দিবি এই অসুখ? তাই তো। যক্ষ্মারোগীর মেয়ে তো যক্ষ্মা হয়েই মরবে।

শাদাব আবারও সেই ভস্ম দৃষ্টিতে নিজের মায়ের দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ! মেয়েকে কোলে নেয়নি সারা রাতে। তারপর থেকে কখনো সিগারেটের শলা ওর হাতে দেখা যায়নি!

শাদাব হঠাৎ জানতে চাইল,

— শরীর খারাপ করছে তোমার? বমি আসছে? গাড়ি থামাব?

নওমিক চমকে উঠল। মাথা নেড়ে বলল,

— শরীর খারাপ করবে কেন?

— লুকোচুপির কিছু নেই। কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদতে পারো। মন খারাপ থাকলে মন খারাপ করো। জোর করে হাসিখুশি হবার দরকার নেই। এতদিন পরে বাড়ি যাচ্ছ। এক্সাইটমেন্ট আমি বুঝি। নয় বছরের জমানো আবেগ ফেনিয়ে উঠছে সেটাও বুঝতে পারছি। তাই বলছি, অভিমান বুকে চেপে রেখো না!

নওমিকার চোখ ছলছল করে উঠল এবারে সত্যিই। শাদাব কেন এতটা উদ্বেগ দেখাবে? কেন ভাববে নওমিকার কথা? এই একটুখানি মায়াতে যদি আবার বাঁধা পড়ে যায় ও? হুহু করে বেশ খানিকটা কেঁদে ফেলল ও।

নদীর নামটা সুন্দর। ঝপঝপিয়া নদী। নদীর পানি কাচের মতো স্বচ্ছ। ছোটো ছোটো ঢেউ তাতে। সেই ঢেউয়ের মাথায় নতুন রোদের আলো নাচছে। মিঠেকড়া রোদ। এই রোদে গুলতা গ্রামের ঘ্রাণ মিশে আছে। এই হাওয়া নওমিকার খুব চেনা।

নদীটাকে ডানে রেখে হাইওয়ে ধরে দুরন্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে গাড়িটা। যত এগোচ্ছে নওমিকার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে৷ আজন্ম চেনা সড়কপথ আজকে অচেনা ঠেকছে৷ আকাশভাঙা রোদ্দুরও যেন উৎসুক হয়ে নেমে এসেছে।

অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে আসতে আসতে তারা ম্লান হয়ে আছে খানিকটা।

— ওই যে মজুমদারের ভাটা! লাল লাল ইট পোড়ে এখানে! ওই যে, ওই যে তুশমি দেখো, আমার স্কুল!

নওমিকা হর্ষধ্বনি করল।

দমপাড়া স্কুল পার হলো গাড়িটা।

নওমিকা যেন তুশমির চাইতেও ছোটো শিশু। কৌতুহলে গাড়ির কাচ নামিয়ে জানালা দিয়ে মুখটা গলিয়ে দিয়েছে ও।

— দমপাড়া বাজার। প্রতি বুধবারে হাট বসে। বিরাট হাট। এখানে জামা, জুতো কিনতে আসতাম আমরা। ওই যে নবাব কাকার মালাইয়ের দোকান। কাকা বুড়ো হয়ে গেছে। পেছনেই ঝগড়ু দাদার বেগুনি, পেঁয়াজুর ভ্যান বসত। এখানে একটা দোকানে আখের শরবত করে, জানো শাদাব?

বলতে বলতে চুপ করে গেল নওমিকা। শাদাবের সাথেই একবার এখানে আখের রস খেতে এসেছিল ও। ও শুধু না, ওরা। স্নেহ, পলিন, চিত্রা, অমিয় আর তমালিকাও।

একটা দীর্ঘশ্বাসকে বুকের ভেতরেই চেপে নিলো নওমিকা। বিষন্ন হয়ে গেল।

খুব লজ্জা পেতে লাগল। বড়ো ভাবিও সাথে ছিল সেদিন। দমপাড়া মাঠে সেদিন মেলা বসেছিল। বৈশাখের মেলা। সব ভাই বোন মিলে শাদাবকে ধরেছিল মেলায় নিতে হবে। শাদাব বড়ো ভাইয়ার বন্ধু৷ সুন্দর দেখতে। হেসে হেসে কথা বলত। চকচকে বাইক নিয়ে আসত। খুব টাকা খরচ করত। ওরা বায়না করতেই শাদাব রাজি হয়ে গেল। অমিয় ভ্যানগাড়ি ডেকে আনলো। তিন চাকার গাড়ি। চারজনে বসা যায়। বড়োভাবি, পলিন, চিত্রা আর অমিয় উঠল। সবার পছন্দের জায়গা আছে ভ্যানে। কেউ সামনের সিটে বসবে, কেউ পেছনে পা দোলাতে দোলাতে যাবে। নওমিকা সুযোগ পায়নি জায়গা নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে, দাঁড়িয়ে ছিল। তমালিকাও। ভ্যান বাহনটা বিশেষ পছন্দ নয় ওর।

স্নেহ বলেছিল,

— অমিয় ভাইয়ার কোনো হিসেব কিতেব নেই। একটা ভ্যান কেন এনেছ? আরও একটা লাগবে।

— তুই গিয়ে আনলি না কেন? সব ভ্যান রিজার্ভে যাচ্ছে। স্টান্ডে ভ্যান কি তোর বাবা নিয়ে বসে আছে?

সপাৎ করে চড় পড়েছিল অমিয়র গালে৷ বড়ো ভাবি মেরেছল চড়টা,

— বাপ তুলে কথা বলে! ওর বাবা তোর কী হয়?

অমিয়র চাচা হয় স্নেহর বাবা। চাচতো ভাইবোন সবাই। শুধু তমালিকা ওদের ফুপাতো বোন।

এই কাজিনদের মধ্যে হাতাহাতি, গালাগাল, ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। এখন গালাগাল খেয়ে পরের বেলাতেই গলাগলি। সকালের অপমান, অভিমান বেলা গড়ালেই পড়ে যেত!

শাদাব বলেছিল,
— এখন আর মারামারি করে কী লাভ? স্নেহ, ভেতরে টুপ করে গলে যাও? তমা আর নওমিকা আমার সাথে যেতে পারবে না?

চেপেচুপে স্নেহও ভ্যানের মাঝখানে পা তুলে বসে পড়েছিল। নওমিকার মনে হয়েছিল ওকে বাইকে বসাবে বলেই শাদাব ওই প্রস্তাব দিয়েছিল। শাদাবের গা ঘেঁষে বসে বসেই উড়ছিল ও। ভাসছিল!

সেদিনই কি শাদাবের জন্য মন কেমন হওয়াটা শুরু হয়েছিল?

যাকে মন-প্রাণ দেওয়া যায়, তার চোখে তাকিয়ে মনের ভাষা কেন পড়া যায় না?

নওমিকা পারেনি শাদাবের চোখের ভাষায় অন্যের নামটা পড়তে। স্নেহ কি পেরেছিল? পলিনের ডায়েরির শেষটুকুতে হঠাৎ খেয়াল হলো নওমিকার। পলিন কি মনে মনে স্নেহকে চাইত?

তখন ষোল হলে এখন ওদের পঁচিশ।

- Advertisement -

Read More

Recent