শুক্রবার - মে ২৪ - ২০২৪

সত্যজিৎ স্পিলবার্গ ইটি ও প্রোফেসর শঙ্কু

ছড়ার বিষয় বা প্রেক্ষাপট ছিলো সত্যজিতের গল্প এবং চিত্রনাট্য মেরে দিয়ে স্পিলবার্গের ইটি নির্মাণ প্রসঙ্গ

[ ১৯৮৪ সালে আমি আর শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম কোলকাতা গিয়েছিলাম প্রিয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে। সত্যজিৎ সন্দর্শনের স্মৃতি নিয়ে অনেক আগেই একটা স্মৃতিগদ্য লিখেছিলাম বিস্তারিত।
সেই লেখাটা প্রিয় সত্যজিতের জন্মদিনে ফের আপলোড করবো ভেবেছিলাম। কিন্তু সহসা মনে পড়লো–ফিকশন ধর্মী একটা ছড়া লিখেছিলাম বেশ আগে। ছড়ার বিষয় বা প্রেক্ষাপট ছিলো সত্যজিতের গল্প এবং চিত্রনাট্য মেরে দিয়ে স্পিলবার্গের ইটি নির্মাণ প্রসঙ্গ। এই ঘটনা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে এক সময়। সম্প্রতি ছড়াটা প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক দেশ রূপান্তরের অভিনব ঈদ সংখ্যায়।
আজ ০২ মে সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিনে আমার প্রণতি সেই ছড়াটির মাধ্যমে– ]

সত্যজিৎ স্পিলবার্গ ইটি ও প্রোফেসর শঙ্কু

- Advertisement -

লুৎফর রহমান রিটন

এতো ভোরে দরোজায় কে রে এতো ধাক্কায়?
প্রোফেসর শঙ্কুর মাথা ঘুরপাক খায়।
আজকাল যা-তা করে চোরে আর ডাকাতে
শান্তিতে কেউ নাক পারে না যে ডাকাতে!
মানুষের ঘুম নেই ঘুম গেছে পালিয়ে
বাড়ি ঘরে সকলেই বাতি রাখে জ্বালিয়ে।
এই বুঝি এলো চোর এই হলো ডাকাতি
অচেনা এ লোকটা কে? হতে পারে ডাকাতই…
সন্ধ্যা না নামতেই বাড়ে দ্বিধা দ্বন্দ্ব
জানালা কপাট সব হয়ে যায় বন্ধ।
এরকম ভয়াবহ বেঁচে থাকা পর্যায়
কে এসেছে প্রোফেসর শঙ্কুর দরজায়?
ভোর রাতে ইটি এলো অভিযোগ জানাতে
প্রোফেসর শঙ্কুর বৈঠকখানাতে।
সেই বিখ্যাত ইটি। ভিন গ্রহে থাকে সে
প্রোফেসর শঙ্কুকে দাদা বলে ডাকে সে।
ইটি জানে শঙ্কু যে বিজ্ঞানী মস্ত
সহযোগিতার হাত করবে প্রশস্ত।
ইটির এ সংকটে শঙ্কুই ভর্সা
জটিল অন্ধকার করে সে যে ফর্সা!
কানাডার বিজ্ঞানী ভজগট পাণ্ডে
ইটিকে সে ফোন করে রেগুলার সানডে।
পাণ্ডেও সেমিনারে বক্তৃতা-ভাষ্যে
শঙ্কুকে গুরু মানে লিখিত প্রকাশ্যে।
ইটিকে তো পাণ্ডেই দিলো পরামর্শ
শঙ্কুর কাছে যাও থেকো না বিমর্ষ।
শঙ্কুই দিতে পারে সমাধান, বুঝলে?
প্রবলেম সল্‌ভ হবে শঙ্কুকে খুঁজলে।
ফ্লাইং সসার নামের অদ্ভুত গাড়িতে
ইটি তাই চলে এলো শঙ্কুর বাড়িতে।

শঙ্কু :
হাই ইটি কী খবর? তুমি এতো সকালে!
ইটি :
মরে বুঝি যাবো দাদা এইবার, অকালে!
শঙ্কু :
কি হয়েছে? খুলে বলো, কফি নেবে? হট টি?
দুধ ছাড়া খেতে হবে, ভেঙে গেছে পটটি।
ইটি :
খিদে নেই, ডিনারটা হলো লেট নাইটে
হটডগ সাবড়েছি একেকটা বাইটে।
সবুজ কফিও মগ ভরে পান করলাম
তারপর সসারের স্টিয়ারিং ধরলাম।
সুতরাং দাদা তুমি হয়ো নাকো অস্থির
সমাধান বলে দাও, দম নিই স্বস্থির।
শঙ্কু :
সমাধান? আমি দেবো? আমি তো নগন্য!
ইটি :
ব্যাপারটা ভয়াবহ। ব্যাপার জঘন্য!
তোমার সত্যজিৎ এঁকেছিলো আমাকে
গল্পটা বলেছিলো স্পিলবার্গ মামাকে।
কিছু পরিকল্পনা করেছিলো দুয়েতে
আমাকে আসবে নিয়ে তোমাদের ভূঁয়েতে।
একদিন স্পিলবার্গ ভুলে সৌজন্য
আইডিয়া মেরে দিয়ে বানালো যে পণ্য!
শঙ্কু :
ইটি নাম দিয়ে সেটা মার্কেটে ছাড়লো
আমি ভাবি স্পিলবার্গ কী করে তা পারলো!
ইটি :
নাম যশ খ্যাতি হলো আর হলো বিত্ত
তারপরও স্পিলবার্গ অস্থিরচিত্ত।
খ্যাতি আছে টাকা আছে মনে নেই শান্তি
দিবস রজনী জুড়ে শুধু বিভ্রান্তি।
জুতোর ফিতেটা প্রায়ই ভুলে যায় বাঁধতে
পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে ভুলে যায় কাঁদতে।
ভুলে যায় স্নান শেষে চুলে জেলি মাখতে
ভুলে যায় কি ভুলেছে সেটা মনে রাখতে!
এডিট করতে গিয়ে জোড়ে ভুল সিনটা
পুনরায় এডিটিং! মাটি হয় দিনটা।
তারপর ভুলে যায় ডিনারের ভ্যেনুটা
ভ্যেনু খুঁজে পাওয়া গেলে ভুলে যায় ম্যেনুটা।
গেলো মাসে শ্যুটিং-এর লোকেশন ভুললো
প্রযোজক অপচয় খাতে খাতা খুললো!
একদিনে দিতে হলো দেড় লাখ গচ্চা
বাজেটের বাইরে এ অহেতুক খচ্চা!
এরকম কোনোদিন হয় নাই অতীতে
নিচে নেমে যাচ্ছে সে দুর্বার গতিতে।
প্রযোজক বলে দিলো তাই সোজাসাপ্টা–
মানবো না বাড়তি এ খরচের চাপটা।
আগামীতে যাও যদি বাজেটের বাইরে
ফিল্মের খ্যাতাপুড়ি আমি আর নাই রে!
চলে যেও সোজাসুজি আর কোনো ব্যানারে
মেকার চাই না আমি এরকম ম্যানারে!
শঙ্কু :
তাই নাকি? (শঙ্কুর ভ্রু যায় কুঁচকে!)
এই কথা বললো সে প্রযোজক পুঁচকে!
ব্যাটা দেখি ছোটলোক! একেবারে মিন সে
যাঁর ছবি দিয়ে নাকি ফিরিয়েছে দিন সে
তাঁকে এই অপমান! ভগবান সইবে?
কাগজে তো নিন্দার ঝড় তবে বইবে!
ইটি :
সেটা ঠিক। কাগজে তো এটা ছাপা হয়েছে
প্রযোজক নানাবিধ কটুক্তি সয়েছে।
এরপরে শোনো দাদা ঘটনা কী ঘটেছে
যে কারণে মিডিয়া তো ভয়ানক চটেছে।
চারিদিকে ফিঁসফাস ইকরি ও মিকরি
আমাকেই ব্যাটা নাকি করে দেবে বিক্রি!
শঙ্কু :
বলছো কি? বেঁচে দিতে চাইছে সে তোমাকে!?
ইটি :
অফারটা দিয়েছে সে কুখ্যাত ‘ঝোমা’কে।
‘ঝোমা’ হলো সিনেমায় নকলের মাস্টার।
কাহিনিতে জুড়ে দেয় সামান্য প্লাস্টার।
তারপর কপি পেস্ট সিন বাই সিন-কে!
এমন কি জুড়ে দেয় মিস্টার বিনকে।
আমাকে কিনলে ঝোমা বিন আর ইটিতে–
হইচই পড়ে যাবে পুরো ফিল্ম সিটিতে!
নকলের হাত থেকে কে বাঁচাবে আমারে
ইটির ইমেজ শেষ করে দেবে চামারে!
এখন সত্যজিৎ রায় একমাত্র
ঘটনা সামাল দিতে সুযোগ্য পাত্র।
রায় বাবু চাইলেই পারে মোরে বাঁচাতে
আর পারে স্পিলবার্গ লোভীটাকে নাচাতে।
তুমি দাদা বলে দিলে বিখ্যাত রায়-কে
ইটি তবে ইটি থাকে, তাকে আর পায় কে?
আমি চাই শুধু চাই তাঁর কাছে থাকতে
যে প্রথম পেরেছিলো ইটি-টাকে আঁকতে।
আমি আছি তোমাদের বংকুর গল্পে
হেল্প করো দাদা মোরে উদ্ধারকল্পে!
তোমার জন্যে দাদা কোনো কাজ নাকি এ?
প্রোফেসর শঙ্কুর দিকে ইটি তাকিয়ে
অসহায় ভঙ্গিতে হাত জোড় করলো।
(প্রোফেসর শঙ্কু যে কী বিপদে পড়লো!)
শঙ্কু :
আমার বন্ধু রায় বিখ্যাত রাইটার
ফিল্মের দুনিয়ায় বিনম্র ফাইটার।
স্পিলবার্গ চুরি করেছিলো তাঁর সৃষ্টি
রায়বাবু করে নাই কোনো অনাসৃষ্টি।
প্রতারিত হয়ে রায় চুপ করে থেকেছে
স্পিলবার্গের জয় মুখ বুঁজে দেখেছে।
প্রমাণ তো ছিলো হাতে বংকুর গল্পে
ইলাস্ট্রেশনও ছিলো যৌথ প্রকল্পে!
কৃতিত্ব নিয়ে নিলো বজ্জাত চোরটা
সত্যি কী বেদনার আজকের ভোরটা!
দেরি হয়ে গেছে ইটি হয়েছে বিলম্ব
কিছুদিন আগে এলে ও ব্যাটার দম্ভ–
ভেঙে দেয়া যেতো ঠিকই, কেনো এলে দেরিতে!
রায় বাবু চলে গেছে মরণের ফেরিতে…!

(শুনে ইটি চমকায়! বলছো কি? রায় নেই!!
আমার মতোন আর কোনো অসহায় নেই!)
ও প্রিয় সত্যজিৎ…….ইটি কাঁদে আহারে!
শঙ্কুও কাঁদে আহা কে থামাবে কাহারে?
দু’জনার কান্নায় ভোরটা বিষণ্ণ
ধন্য সত্যজিৎ! ধন্য হে ধন্য!
স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসাটুকু জানাতে
শঙ্কু ও ইটি কাঁদে বৈঠকখানাতে……

অটোয়া ০২ মে ২০২৪

- Advertisement -

Read More

Recent