শুক্রবার - মে ২৪ - ২০২৪

বোলপুরের স্মৃতি

বোলপুরের স্মৃতি

নিমন্ত্রণ
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে
সে ডাকে তুমি সাড়া দিয়েছিলে কিনা জানি না।
কেউ আমাকে এমন করে ডাকতো যদি
আমি তো ভাগ্যহত
আমার সাধ কেমনে জাগে;তোমার মতন জীবন পাওয়ার?
তুমি,তুমি! ভাগ্য হাতে
যে দিকে চাও সোনা ফলে
কষ্টে বাঁধা জীবন আমার
তিমির ঘেরা সারা বেলা, এলোমেলো ক্ষেতের আলে।
তবু মনের কোনে বাজতে থাকে
একটি কথা একটি গান
আমায় কেউ ডাকতো যদি ছুটির নিমন্ত্রণে।

অনির্বাণ আকর্ষণ রবি ঠাকুরের অনন্য সৃষ্টি শান্তি নিকেতন চোখে দেখার। সে ইচ্ছা পূরণ হয়ে যায় একবার সুযোগ আসে শান্তি নিকেতনে যাওয়ার।শিলিগুড়ি থেকে আমরা ফিরছি বাসে । রাতের অন্ধকারে একটার পর একটা শহর পেরিয়ে যাচ্ছি বর্ধমান, বীরভূম, হুগলী, মালদহ, চব্বিস পরগনা, নামগুলি, আমার ভিতর অনেক ইতিহাস খেলা করে।

- Advertisement -

আসানসোল এই রাস্তা থেকে কতদূর? কতটা গেলে দেখা যেত, দুঃখমিয়া কোথায় রুটি বানাতেন। আহা! যদি থামতে পারতাম। একবার চোখের দেখা দেখে যেতাম সেই বিখ্যাত লোকের কষ্টের স্পর্শ ভরা জায়গা। সব কিছুই আমার দেখতে ইচ্ছে করে। তার কাছে যেতে ইচ্ছে করে। এমনি ইতিহাসের স্মৃতি বিজরিত লোকালয় পেরিয়ে পরদিন দুপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজরিত তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বিখ্যাত শান্তিনিকেতনে পৌঁছালাম। একটি হোটেলে উঠলাম পাশেই। সারারাতের ক্লান্তি দূর করতে লম্বা একটা শাওয়ার আর ছোট্ট ঘুম দিয়ে ঝরঝরে ভাব নিয়ে বোলপুরের হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে নিতে দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম সাজানো ছোট ছোট দোকান, হাতের তৈরী সব জিনিস, কাপড় ইত্যাদি। সেদিন বিকাল হয়ে যাওয়ায় পরদিন সারাদিন সকাল থেকে শান্তিনিকেতনের ভিতরে কাটাব ঠিক করলাম। তাই একটা রিকসা করে আমরা ঘুরতে গেলাম মোটামুটি বোলপুরের পুরো এলাকা দূরের নদীসহ চারপাশ।

ছোকরা রিকসাওয়ালা নিজের আনন্দে আমাদের বিতরণ করছিল তার জ্ঞান। কখন কোন অনুষ্ঠানে মেতে উঠে বোলপুর। কখন মানুষের ভীড় লেগে যায়। বৈশাখী, বসন্ত উৎসবের নাম শুনে যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল উতসবের আনন্দমুখর পরিবেশ । রিকশাওয়ালা, জানা সব বিষয় আর আগ্রহও আছে যথেষ্ট। ছোট ছোট বাড়ি সাজানো আবাসিক এলাকা, বাউন্ডারির কাছেই কলকাতার সব বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক সবাই বোলপুরে একটা বাড়ি করে রেখেছেন। অনুষ্ঠানের সময়গুলোতে নিজের বাড়িতে এসে থাকেন। অথবা কখনো শুধুই অবসর কাটানোর জন্য এই বড়িতে এসে থাকেন লেখা পড়ায় আর নিরিবিলিতে সময় কাটান।

সুনীল দা, চিত্রাদিসহ আরো অনেকে বলেছিলেন, এ সময়টা যেওনা আমরা যখন যাচ্ছি তখন চলো। তা ঠিক ওদের সাথে আসতে পারলে সময়টা আরো অনন্দময় হতো। কিন্তু আমাদের আবার কবে সময় হবে আসার তা ভেবে র্দাজিলিং থেকে কলকাতা ফিরার পথেই থেমেছি বোলপুরে।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা আমরা কোপাই নদীর তীরসহ শহরের অনেকটা রিকসায় ঘুরে দেখলাম। ছোট ছোট কুটির শিল্প । রাতে খেয়ে একবারে হোটেলে ফিরে এলাম। পরদিন সকালে তৈরী হয়ে শান্তিনিকেতনের ভিতরে যাওয়ার জন্য চলে গেলাম। আমার ক্যামেরাটি সিজ করে লকারে রেখে দেয়া হলো ভিতরে যাওয়ার মুহুর্তে। মন খুব খারাপ হলো কোন স্মৃতি ধরতে পারব না বলে। যাদুঘর বিচিত্রা, আর্ট গ্যালারী নন্দন, এছাড়া উত্তরায়ন, উদয়ন, কর্নাক, শ্যামলী, উদচি এসব নানান নামে এক একটি কমপ্লেক্স। খোলাবেদিতে, আর্ট, ভার্স্কয্য, ক্লাস, গান, নাচ ইত্যাদি হয়। ঘুরে ঘুরে বেরাই ছাত্র ছাত্রীদের গাছের নীচে বসে ক্লাস করা দেখি। সবচেয়ে ভালোলাগে আমার আর্ট ক্লাসের ভার্স্কয তৈরী দেখতে। ঘুরে ঘুরে হতের চাপে তৈরী হয়ে যাচ্ছে এক একটা অবয়ব যে যেমন চাচ্ছে তেমন। কাদা মাখা হাত আর মাথা ভরা দুষ্টুমি খেলছে সবার মনে , চলছে কথার ফুলঝুরি সহপাটিদের সাথে। এরই মাঝে চলছে চা সিঙ্গারা খাওয়ার পাট। এই জায়গায় বসে থেকেছেন রবি ঠাকুর, সৃষ্টি করেছেন কত লেখা। কত হাসি আনন্দ, সুখ,দুঃখ বয়ে বেরিয়েছেন এই ঘর বারান্দা, আমতলা, বকুল তলা, এই আসবাবপত্র, বাঁধানো বেদি তার স্পর্শ এখনও ধরে আছে। পুলকে শিহরিত হলাম আর অনুভবে ফিরে যেতে লাগলাম প্রায় একশো বছর আগে। তার কথা কি কানে বাজে, তার ঘ্রাণ কি ভেসে আসে? পুরানো সেদিনের সাথে উপলব্ধির মাঝে হারাতে হারাতে বাস্তবতায় কাটালাম দুটো দিন বোলপরে।

রবীন্দ্রনাথ এত বড় একজন মানুষ যার বিশাল ব্যাপ্তী ধারন করার মতন ক্ষমতাও আমার নাই। তাকে নিয়ে কিছু লিখতে চাওয়া বোকামী আমার কাছে। আমি শুধুই তাকে অনুভব করি। আমার ভালোলাগায়। আমার দুঃখ বেদনায়, প্রেমে সুখে কবিতায় গানে ঘিরে থাকেন তিনি আমাকে সারাক্ষণ। আমার অনেক ভাবনা আমাকে বুঝিয়ে দেন তিনি। তার গান গেয়ে আমি ভাবি এই তো আমার মনের কথা। তার কবিতার লাইন আবৃত্তি করি আর মনে হয় এই তো আমারই অনুভব। আমার মনে একটার পর একটা দরজা খুলে যায় অচেনা অজানা ভুবনের। ক্ষুদিত পাষাণের সেই দেয়াল, খাম্বা অজানা নূপুর নিক্কন আহবানে ডেকে নিয়ে যায় আমাকে বিস্তৃত এক পৃথিবীর কাছে। হেমন্তী, বা ফটিক, বলাই বা পোষ্ট মাস্টার হয়ে যাই মগজ নিউরোন ভাবনায়। ঊষার আলো ছড়ায় মগজ কোষে কেষে। তার প্রতি এক অজানা আকর্ষণ, প্রেম অনুভব করি হৃদয়ের তন্ত্রীতে । বড় আফসোস হয় তার সময়ে জন্মাইনি বলে তাকে পরশ করতে পারিনে বলে আবার নতুন ভাবনায় তার সৃষ্টির বিশাল ভান্ডার আমাকে সমৃদ্ধ করেছে বলে, নিঃস্বার্থ এই উপলব্ধির সম্পদ আমার আছে বলে গর্বিত হই। তাকে শুধুই আমার চেতনায় আমি লালন করি সযত্নে করি নিজেকে সমৃদ্ধ। অনেক ভালোলাগায় এই বিশাল সম্পদ তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের শুধুই জানতে চাই তার সবটুকু। আমার ক্ষুদ্রতা দিয়ে তাকে নিয়ে কিছু বলার আমার নেই। আমি শুধুই তাকে গ্রহণ করি তিনি আমাকে দিয়ে যান সমৃদ্ধি। হে বিশাল তোমাকে প্রণাম।

- Advertisement -

Read More

Recent