
খুব ছেলেবেলায় বর্ণমালার বই পড়তে গিয়ে শিখেছিলাম–ঐ-তে ঐরাবত। ঐরাবত মানে হাতি।
আমি জীবনে হাতি লিখতে গিয়ে কখনোই ঐরাবত শব্দটা লিখিনি। আমার জীবনে ঐরাবত নেই। কিন্তু হাতি আছে। হাতি আমার খুব প্রিয় একটা প্রাণি। বিশেষ করে বাচ্চাহাতি। ২০০৯ সালের বইমেলায় ছোটদের জন্যে একটা উপন্যাস লিখেছিলাম যার নায়ক ছিলো ভোলানাথ ওরফে ভোলা ওরফে ভুল্লু নামের একটি বাচ্চা হাতি। উপন্যাসের নাম দিয়েছিলাম ‘বাচ্চা হাতির কান্ডকারখানা’। প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান এঁকেছিলেন ছবি। বেরিয়েছিলো অনন্যা থেকে।
সুযোগ পেলেই আমি বাচ্চা হাতিদের মজার মজার কান্ডকারখানা দেখি ইউটিউবে খোঁজ দ্যা সার্চ দিয়ে। দু’দিন আগেও দেখছিলাম একটা ভিডিও ক্লিপ–কিউট একটা বাচ্চা হাতি ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কুস্তি লড়ার মতো জড়িয়ে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একবার দু’বার বারবার। মেয়েটা হাসতে হাসতে অস্থির। আর বাচ্চা হাতিটা তারচে বেশি অস্থির মেয়েটার সঙ্গে খেলতে পেরে।
যখন ইউটিউব আবিস্কার হয়নি তখন আমি অটোয়া পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’ চ্যানেলের প্রাণি বিষয়ক এন্তার সিডি বাড়িতে এনে দেখতাম সপ্তাহব্যাপি। হাতির ওপর অনেক ডকুমেন্টারি আছে ওদের। আমার বাড়ির পাশের সিনেপ্লেক্স-এ গিয়ে বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়া ওদের একটা ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম–পেঙ্গুইন আর হাতির ওপর।
হাতি নিয়ে আমার ছড়াও আছে কিছু।
গেলো এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আমি ডুবে ছিলাম আমেরিকায় শাদা পুলিশের হাঁটুর নিচে জীবন দেয়া কৃষ্ণাঙ্গ মানবসন্তান জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে।
অন্তঃসত্ত্বা একটি হাতির প্রতি কেরালার মানুষের নৃশংসতার সাম্প্রতিক হৃদয়বিদারক সংবাদটি তাই দৃষ্টিগোচর হয়নি। আজ সকালে খবরটির বিস্তারিত পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেছি আমি।
খাদ্যের সন্ধানেই লোকালয়ে এসেছিলো সন্তানসম্ভবা হাতিটা। উত্তর কেরালার মালাপ্পুরম জেলার একটা গ্রামে ঢুকে পড়েছিলো সে। একসঙ্গে দুটি অপরাধ করেছিলো হাতিটা। এক–লোকালয়ে ঢুকে পড়া, যেখানে মানুষেরা বাস করে। দুই–সেই মানুষদের সে বিশ্বাস করেছিলো। এবং বিশ্বাস করেই মানুষের দেয়া একটা আনারস মুখে পুড়েছিলো। সে জানতো না, সেই মানুষেরা আনারসের ভেতরে পুরে রেখেছিলো কিছু বাজি আর পটকা। আনারসটা মুখে পুড়ে মহানন্দেচিবুতে গিয়েই হাতিটা টের পেয়েছিলো–মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা পাপ। মুখের ভেতরেই বিস্ফারিত হলো পটকা আর বাজিগুলো। মুহূর্তের মধ্যেই ঝলসে গেলো মুখের ভেতরটা। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো তার জিভ। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ছুটোছুটি করেছে সে পুরো গ্রামটায়। কিন্তু কোনো মানুষ কিংবা কোনো বাড়িঘরের সামান্যতম ক্ষতিও সে করেনি। মুখের ভেতরটায় আঘাতের পরিমাণ এতোটাই ভয়াবহ ছিলো যে কিছু খাওয়ার সাধ্যও ছিলো না তার। পেটের সন্তানকে বাঁচাবার জন্যে অসহায় হাতিটা কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলো না। আর কয়েক মাস পরেই পৃথিবীর আলোতে আসবার কথা ছিলো বাচ্চাটার!
ঝলসে যাওয়া মুখের আগুনজ্বলা যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এদিক ওদিক ছুটতে ছুটতে এক পর্যায়ে সে স্থানীয় ভেলিয়ার নদীতে এসে নেমে গেলো। তারপর নদীর জলে মুখ আর শুঁড় ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কষ্টটা যদি কমে একটু। যদি বাঁচানো যায় বাচ্চাটাকে!
দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো সে নদীর জলে মুখ ডুবিয়ে। এবং ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই এক পর্যায়ে (২৭ মে বিকেলে) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলো মানুষের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা হতভাগ্য হাতিটা।
আহারে কী বীভৎস সে মৃত্যু দৃশ্য! পেটের বাচ্চাটার সঙ্গে এই সময়ে নিশ্চয়ই অনেক কথা বলেছিলো হাতিটা। ইনোসেন্ট বাচ্চাটা তখন কী বলেছিলো তার মাকে?
আমি ভাবতে পারি না। ভাবতে গেলেই চোখ দুটো ভেসে যায় জলে।
আমি চিন্তা করতে পারি না কিছু। শরীর আমার অবশ হয়ে আসে। পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য না দেখেই মায়ের গর্ভেই কী করুণ মৃত্যু ঘটলো একটা ছোট্ট এইটুকুন বাচ্চা হাতির! একজন মানুষ হিশেবে মানব সম্প্রদায়ের এমন নিষ্ঠুরতাকে কী বলে নিন্দা জানাবো আমি? আমি তো জানতাম ভারতের কেরালাতেই শিক্ষার হার সবচে বেশি! এতো এতো শিক্ষা নিয়ে এতোটা অমানুষ তোমরা হলে কী করে হে কেরালার মানুষ! শেইম অন ইউ!
২
অবশেষে ভারতের দু’জন মানবিক শিল্পী আমাকে আলো দেখালেন। তাঁদের আঁকা দু’টো ছবি আমাকে ফের অশ্রু সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছে যদিও।
একটি ছবিতে দেখতে পাচ্ছি (ব্রততীর আঁকা) কেরালার গ্রামের সবুজ ঘাসের ওপর গ্রামবাসীর দেয়া একটা আনারস পড়ে থাকতে দেখে শুঁড় উঁচিয়ে খুবই আনন্দিত চোখে মা হাতিটা বলছে–They gave us food baby!
পেটের ভেতরে বসে থাকা উৎফুল্ল বাচ্চাটা বলছে–Humans are so good!
বিখ্যাত কার্টুনিস্ট সতীশ আচার্যের আঁকা ‘দ্যা লাস্ট কনভার্সেশন’ নামের দ্বিতীয় ছবিতে দেখতে পাচ্ছি পানিতে মুখ আর শুঁড় ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মা হাতিটাকে বাচ্চাটা জিজ্ঞেস করেছে–AMMA, I’LL NEVER BE ABLE TO SEE HUMANS?
তার আম্মার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে–YOU WON’T REGRET, BABY! আহারে!
৩
পৃথিবী নামের এই গ্রহে মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত অবসন্ন বিপন্ন বিষণ্ণ আমি।
মানুষ তুমি মানুষ হবে কবে?
তোমাকে উচিৎ শিক্ষা দিতে পৃথিবীতে কোভিড১৯ আসবে না তো কি রহমতের রসগোল্লা আসবে?
মাঝে মধ্যেই এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি আমি যেখানে শুধু পশু-পাখিরাই থাকবে। যে পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না কোনো।
একজনও না।
অটোয়, কানাডা
