
কানাডার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর অন্যতম ‘অর্ডার অব কানাডা’-কে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জাতীয় সম্মাননা ব্যবস্থার অংশ হয়ে থাকা এই স্বীকৃতিকে কীভাবে ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও প্রতীকের প্রভাব থেকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। ফেডারেল সরকারের অভ্যন্তরীণ এক উপস্থাপনায় উঠে এসেছে, কানাডার সম্মাননা ব্যবস্থাকে বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতা এবং পুনর্মিলনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই সুপারিশকে কেন্দ্র করেই এখন অর্ডার অব কানাডার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অর্ডার অব কানাডা অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল একটি উপস্থাপনা প্রস্তুত করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন মতামত ও আলোচনায় দেখা গেছে যে, কিছু আদিবাসী মানুষের কাছে অর্ডার অব কানাডার মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গ্রহণ অস্বস্তি, সংকোচ এমনকি লজ্জার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এর মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, এই সম্মাননার সঙ্গে কানাডার ঔপনিবেশিক অতীতের ঐতিহাসিক সংযোগ ও প্রতীকী সম্পর্ক। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মতে, রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানই এমন এক সময়ের উত্তরাধিকার বহন করে, যখন তাদের সংস্কৃতি, ভাষা ও অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়েছিল। ফলে সেই ইতিহাস বিবেচনায় না এনে শুধুমাত্র সম্মাননা প্রদানকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখেন না।
তবে বিষয়টি নিয়ে আদিবাসী সমাজের ভেতরেও একমুখী অবস্থান নেই। উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে, অনেকেই মনে করেন অর্ডার অব কানাডাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে বরং এটিকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাদের মতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অসাধারণ অবদান, নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সমাজ গঠনে ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি দিলে এই সম্মাননা জাতীয় ঐক্য ও পুনর্মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, সম্মাননাটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার মধ্য দিয়েই অতীতের বিভাজন কাটিয়ে নতুন আস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
অর্ডার অব কানাডা নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার লক্ষ্যে কানাডার প্রিভি কাউন্সিল কার্যালয়ের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ইউনিট একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এ প্রকল্পে সহযোগিতা করছে গভর্নর জেনারেলের কার্যালয়ের অফিস অব দ্য সেক্রেটারি এবং রিডো হল ফাউন্ডেশন। গবেষণার অংশ হিসেবে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত একটি নগরভিত্তিক আদিবাসী সম্মেলনের পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি চলতি বছরের মার্চ মাসে আদিবাসী ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত তথ্য ও মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি অতীতের রাষ্ট্রীয় আচরণ, বিশেষ করে আবাসিক স্কুল ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক দমননীতি এবং ঐতিহাসিক বৈষম্য নিয়ে ব্যাপক আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, জাতীয় প্রতীক এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সম্মাননাকেও নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কানাডার বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করতে হলে সম্মাননা ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন প্রয়োজন, যাতে সব সম্প্রদায় নিজেদের সমানভাবে প্রতিনিধিত্বশীল ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করে।
অর্ডার অব কানাডা দেশটির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মাননা। ১৯৬৭ সালে কানাডার শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে এটি চালু করা হয়। এই সম্মাননা দেওয়া হয় এমন ব্যক্তিদের, যারা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, সমাজ ও কমিউনিটির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন অথবা কানাডার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও উল্লেখযোগ্য সেবা প্রদান করেছেন। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ব্যক্তি এই সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। গভর্নর জেনারেল আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং জীবিত যে কোনো কানাডীয় নাগরিককে এই সম্মাননার জন্য মনোনয়ন দিতে পারেন সাধারণ মানুষও।
অর্ডার অব কানাডাকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা কেবল একটি রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মাননার ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়; বরং এটি কানাডার জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস এবং আদিবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ। একদিকে ঔপনিবেশিক অতীতের প্রতীকগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি উঠছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে এমন একটি সম্মাননা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যা বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং পুনর্মিলনের মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করবে। শেষ পর্যন্ত সরকার কী ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে অর্ডার অব কানাডা শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবেই থাকবে, নাকি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কানাডার নতুন পরিচয়েরও প্রতিনিধিত্ব করবে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
