
এক সময় কানাডার খুচরা বাজারের অন্যতম পরিচিত নাম ছিল জেলার্স। দীর্ঘদিনের বিরতির পর আবারও গ্রেটার টরন্টো এরিয়ায় (জিটিএ) ফিরেছে জনপ্রিয় এই ডিসকাউন্ট রিটেইলার। বৃহস্পতিবার সকালে টরন্টোর ওরফুস রোডে নতুন স্টোরের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের পর এই অঞ্চলে তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ স্টোরের যাত্রা শুরু হলো। উদ্বোধন ঘিরে ক্রেতাদের উৎসাহ ও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে খুচরা বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের জনপ্রিয়তার স্মৃতি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সফল হতে হলে জেলার্সকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।
কানাডার খুচরা বাজারে একসময় জেলার্স ছিল একটি পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড। কিন্তু ব্যবসায়িক পরিবর্তন এবং বাজারের প্রতিযোগিতার কারণে ২০১৩ সালে দেশজুড়ে তাদের অধিকাংশ স্টোর বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার সর্বশেষ স্টোরটিও বন্ধ হয়ে গেলে কার্যত এই অঞ্চলে জেলার্সের উপস্থিতি শেষ হয়ে যায়। চার বছর পর নতুন স্টোর উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই অধ্যায়েরই নতুন সূচনা হলো। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু একটি স্টোর চালু করা নয়, বরং ধীরে ধীরে সারা দেশে নিজেদের পুরনো অবস্থান পুনরুদ্ধার করা।
স্টোর উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন খুচরা বাজার বিশ্লেষক ব্রুস উইন্ডার। তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা জেলার্সের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক পরিবারই মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কম দামে ভালো মানের পণ্য খুঁজছেন। ফলে ডিসকাউন্ট রিটেইলারদের জন্য বাজারে আবারও চাহিদা তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, ক্রয়ক্ষমতা ঘিরে এখন কার্যত একটি নতুন আন্দোলন শুরু হয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি হিসাব করে কেনাকাটা করছেন এবং এই বাজার এখনো পুরোপুরি পূর্ণ হয়নি। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে জেলার্স।
গত শরতে এডমন্টনে একটি নতুন স্টোর চালুর পর এবার টরন্টোতে ফিরল জেলার্স। তবে এখানেই থেমে থাকতে চায় না প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দিনে ব্র্যাম্পটন, স্কারবোরো, অটোয়া, ক্যালগেরি এবং ভ্যানকুভারেও নতুন স্টোর খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী জুলাই মাসে উইন্ডসরের টেকুমসেহ মলেও আরেকটি স্টোর চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা জোয়ে বেনিতাহ আগেই জানিয়েছেন, জেলার্সের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে আবারও কানাডাজুড়ে শক্তিশালী জাতীয় চেইন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। দেশের সব বড় বাজারেই ভবিষ্যতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন স্টোর উদ্বোধনে পুরনো ক্রেতাদের মধ্যে আবেগ ও স্মৃতিচারণ ছিল স্পষ্ট। অনেকেই ছোটবেলার জেলার্সে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা মনে করে আবারও এই ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র এই আবেগ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সাফল্য নিশ্চিত করতে পারবে না। খুচরা ব্যবসা বিশেষজ্ঞ ডাগ স্টিফেন্স এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নস্টালজিয়া প্রাথমিকভাবে মানুষকে দোকানে টেনে আনতে পারে, কিন্তু বারবার ফিরিয়ে আনতে পারে না। একজন ক্রেতা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম, মান, সেবার মান এবং কেনাকাটার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেন। একই মত প্রকাশ করেছেন ব্রুস উইন্ডারও। তার মতে, নস্টালজিয়া ব্যবসার মূল কৌশল হতে পারে না। এটি একটি অতিরিক্ত সুবিধা মাত্র। সফল হতে হলে আধুনিক খুচরা বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং উন্নত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতেই হবে।
বর্তমানে কানাডার ডিসকাউন্ট রিটেইল বাজার আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইতোমধ্যেই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে জেলার্সকে শুধু পরিচিত নামের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, বৈচিত্র্যময় পণ্যের সংগ্রহ, আধুনিক স্টোর ডিজাইন, কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উন্নত গ্রাহকসেবা এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কম দামের পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। সেই দিক থেকে জেলার্সের ফিরে আসা সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। তবে এই প্রত্যাবর্তনকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল অতীতের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর না করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের চাহিদাও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। টরন্টোতে জেলার্সের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে কানাডার খুচরা বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে বর্তমান বাজারের বাস্তবতা ও ক্রেতাদের পরিবর্তিত প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
