
প্রায় ছয় মাসব্যাপী বসন্তকালীন অধিবেশন শেষ করেছে কানাডার হাউস অব কমন্স। এই অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল সরকার সংসদে আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। সংখ্যালঘু সরকার হিসেবেই যাত্রা শুরু করলেও রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তনের ফলে এখন বিরোধী দলের সমর্থন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করার মতো কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে লিবারেলরা।
চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ দিকে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার সময় কার্নি সরকারের অবস্থান ছিল নাজুক। সংখ্যালঘু সরকার হওয়ায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
সরকার পাঁচজন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যকে নিজেদের দলে আনতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনেও জয় পায় লিবারেল পার্টি। ফলে শুধু আইন পাস করাই নয়, সংসদীয় কমিটিগুলোর ওপরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। এতে সরকারের আইন প্রণয়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
বৃহস্পতিবার হাউসে সরকারি দলের নেতা স্টিভ ম্যাকিনন বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে কানাডিয়ানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তার মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনকে আধুনিক করা এখন সময়ের দাবি। সেই কারণেই সরকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অধিবেশনের শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সরকারের প্রস্তাবিত লফুল অ্যাকসেস বিল। বিলটির ওপর দীর্ঘ আলোচনার পরিবর্তে বিতর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, যা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিলটির মূল উদ্দেশ্য হলো আধুনিক ডিজিটাল অপরাধ তদন্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়া। এর আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিজিটাল তথ্য ও অনলাইন ডেটায় প্রবেশের নতুন আইনি ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই ধরনের ক্ষমতা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তারা আশঙ্কা করছেন, পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে এই আইন অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা এবং সংগঠিত অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আধুনিক প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তুলে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিতর্কিত বিলটি বর্তমানে কানাডার সেনেটের বিবেচনায় রয়েছে। তবে স্টিভ ম্যাকিনন স্বীকার করেছেন, গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় উচ্চকক্ষের হাতে নেই। ফলে আইনটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। ম্যাকিননের অভিযোগ, কনজারভেটিভদের বিরোধিতা বাস্তব উদ্বেগের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নানা ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
এদিকে অধিবেশন চলাকালীন সরকার ট্রাইয়ো অব জাস্টিস বিল-ও পাস করাতে সক্ষম হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে কানাডার ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন আইনে জামিন ব্যবস্থার সংস্কার, ঘৃণাজনিত অপরাধ (হেইট ক্রাইম) সম্পর্কিত নতুন অপরাধ সংযোজন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি যৌন প্রকৃতির ডিপফেক তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বসন্তকালীন অধিবেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মার্ক কার্নির সরকার এখন সংসদে আগের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছে। বিরোধী দলের ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় আগামী অধিবেশনেও সরকার অর্থনীতি, জননিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আরও আগ্রাসী আইন প্রণয়নের পথে এগোতে পারে। তবে একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির ভারসাম্য নিয়ে বিতর্কও আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আগামী অধিবেশনে লিবারেল সরকারের আইন প্রণয়নের গতি যেমন নজরে থাকবে, তেমনি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নেও রাজনৈতিক লড়াই আরও জোরদার হতে পারে।
