গ্রামীণ স্থায়ী রেসিডেন্সি কর্মসূচির উচ্চ চাহিদা

Smiling couple on a wooden lakeside deck at sunset, with string lights overhead.
লেনা মেটলেজ দিয়াব কানাডার ফেডারেল অভিবাসন শরণার্থী ও নাগরিকত্ব বিষয়ক মন্ত্রী

কানাডার বিভিন্ন গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত ছোট কমিউনিটিতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলায় চালু করা পরীক্ষামূলক অভিবাসন কর্মসূচি ‘রুরাল কমিউনিটি ইমিগ্রেশন পাইলট’ (আরসিআইপি) ইতোমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কর্মসূচিটি শুরু হওয়ার পর থেকেই বিদেশি দক্ষ কর্মীদের মধ্যে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের সুযোগ পাওয়ার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮০০ জন অভিবাসী স্থায়ী রেসিডেন্সি (পিআর) লাভ করেছেন। তবে সীমিত সংখ্যক সুযোগের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় অনেক যোগ্য প্রার্থী এখনও অপেক্ষমাণ রয়েছেন।

২০২৫ সালে চালু হওয়া আরসিআইপি কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কানাডার ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর সংকট দূর করা। কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে নির্বাচিত ১৪টি কমিউনিটিকে নির্দিষ্ট খাতে কর্মী নিয়োগ এবং পরবর্তীতে তাদের স্থায়ী রেসিডেন্সির জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কমিউনিটি তাদের নিজস্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৫টি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করতে পারে। এসব খাতের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, শিক্ষা এবং সামাজিক সেবা অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শহরের বাইরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং স্থানীয়দের অবসর গ্রহণের হার বাড়ার ফলে অনেক অঞ্চলেই শ্রমবাজারে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আরসিআইপি সেই শূন্যতা পূরণের একটি কৌশলগত উদ্যোগ।

- Advertisement -

একজন ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট ডেভিড পিকো জানিয়েছেন, গত বছর তাদের অঞ্চল থেকে ৩৪০ জন অভিবাসীকে স্থায়ী রেসিডেন্সির জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের মধ্যে ৯০ জন ইতোমধ্যে পিআর স্ট্যাটাস অর্জন করেছেন। বাস্তবতা হলো সুযোগের তুলনায় আগ্রহী অভিবাসীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে কোন কোন পেশাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কমিউনিটিগুলোকে অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী হতে হচ্ছে। বর্তমানে তাদের অঞ্চলে আর্লি চাইল্ডহুড এডুকেটর, অটো মেকানিক, নির্মাণ শ্রমিক, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। এসব খাতে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যাচ্ছে না বলেই বিদেশি কর্মীদের প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, নর্থ ওকানাগান-শাসওয়াপ অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার। কিন্তু এই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অবসরপ্রাপ্ত বা অবসরের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধির কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সেবা খাতগুলো কর্মী সংকটে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করা শুধু শ্রমবাজারের প্রয়োজনই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম উপায় হয়ে উঠেছে।

দেশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ নোভা স্কশিয়ার পিক্টো কাউন্টিতেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এই অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪৪ হাজার। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু স্থানীয় শ্রমবাজার থেকে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অভিবাসীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, আরসিআইপি শুধু একটি অভিবাসন কর্মসূচি নয়; এটি কানাডার গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার একটি পরীক্ষামূলক মডেল। যদি কর্মসূচিটি দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বেশি কমিউনিটিকে এর আওতায় আনা হতে পারে। একই সঙ্গে এটি কানাডার অভিবাসন নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ অতীতে অধিকাংশ নতুন অভিবাসী টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার বা মন্ট্রিয়ালের মতো বড় শহরে বসতি স্থাপন করলেও এখন সরকার তাদের ছোট শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসে উৎসাহিত করছে।

দক্ষ কর্মীর অভাব বর্তমানে কানাডার অনেক গ্রামীণ অঞ্চলের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সংকট কাটাতে আরসিআইপি কর্মসূচি আশার আলো দেখালেও চাহিদার তুলনায় সুযোগ এখনও সীমিত। ফলে আগামী দিনে কর্মসূচিটির পরিধি বৃদ্ধি এবং আরও বেশি অভিবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ কানাডার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এ ধরনের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ওপর।

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ

- Advertisement -

Read More

Recent