
কানাডায় চিকিৎসকের সহায়তায় স্বেচ্ছামৃত্যু বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের যৌথ কমিটি এবার সরকারের কাছে এই সম্প্রসারণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতাকে স্বেচ্ছামৃত্যুর যোগ্যতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি। হাউস অব কমন্স এবং সিনেটের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি, যা এই নীতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আইনটি কার্যকর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কমিটির এই সুপারিশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। তাদের মতে, বর্তমান কাঠামোতে বেশ কিছু গুরুতর ত্রুটি রয়েছে, যা সংশোধন না করে আইনের পরিধি বাড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একজন অধিকারকর্মী টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, কমিটির এই অবস্থান তাদের জন্য স্বস্তির। তিনি বলেন, “আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার সুপারিশকে স্বাগত জানাই। তবে আমাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট আমরা চাই এই সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থায়ীভাবেই প্রত্যাহার করা হোক।” তার মতে, শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতাকে ভিত্তি করে কাউকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়ার আগে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
যৌথ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতার ভিত্তিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমোদন দেওয়া হলে চিকিৎসা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, ভবিষ্যতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এসব বিষয় নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। এ কারণেই কমিটি ফেডারেল সরকারের প্রতি ফৌজদারি বিধি সংশোধনের সুপারিশ করেছে, যাতে মানসিক অসুস্থতাকে আপাতত স্বেচ্ছামৃত্যুর যোগ্যতার তালিকা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাদ রাখা হয়।
কানাডা সরকার এর আগে আইন সংশোধন করে স্বেচ্ছামৃত্যুর আওতা সম্প্রসারণের পথ তৈরি করেছিল। সেই অনুযায়ী, শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তিদেরও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল। আইনটি আগামী বছরের মার্চ মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আইন কার্যকরের সময় ঘনিয়ে আসতেই চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর একাংশ নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে রোগীর ভবিষ্যৎ চিকিৎসা সম্ভাবনা ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল। ফলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
যৌথ কমিটির এই প্রতিবেদন এখন ফেডারেল সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সরকার যদি সুপারিশ গ্রহণ করে, তাহলে শুধুমাত্র মানসিক অসুস্থতার ভিত্তিতে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডাইং কার্যকর হওয়ার পরিকল্পনা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, সমর্থকদের দাবি মানসিক অসুস্থতায় দীর্ঘদিন ভোগা এবং চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক, নৈতিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কানাডার স্বেচ্ছামৃত্যু নীতি বিশ্বজুড়েই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাই এই বিষয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
