
সায়ীদ স্যারের জন্মদিনে ফেসবুকে অনেকেই দেখলাম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। লিখে শুভেচ্ছা না জানিয়ে আমি চেয়েছিলাম তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে। চেয়েছিলাম সরাসরি তাঁকে হ্যাপি বার্থ ডে বলতে। কিন্তু বিধি বাম ডান শুরু করলো। গত দু’দিন ধরে টেলিফোনে তাঁকে ধরার চেষ্টা করছি কিন্তু প্রতিবারই সাফল্যের সঙ্গে ব্যর্থ হয়েছি।
এই ফেসবুকেই বিশাল রচনা লিখেছিলাম আমি স্যারকে নিয়ে, ২০১৪ সালে। যা আমার ‘স্মৃতির জোনাকিরা’ নামের বইতে মুদ্রিত হয়েছে।
এরপর গত ২৭ জুন ২০১৮-তে স্যারকে নিয়ে ক্ষুদ্র আরেকটা রচনা লিখেছিলাম ফেসবুকে। আলোকচিত্রী নিহার সিদ্দিকীর দুর্দান্ত ১৫টি ছবি দেখেই লিখেছিলাম রচনাটা। যেখানে আমার লেখার চাইতে নিহারের তোলা আমাদের ছবিগুলোই ছিলো দ্রষ্টব্য। আজ আমার গুরুর জন্মদিনে সেই লেখা আর ছবিগুলোই এখানে নিবেদন করলাম নৈবেদ্য হিশেবে—
[ বহির্বিশ্বে গুরু-শিষ্যে অপরূপ দৃশ্যে
লুৎফর রহমান রিটন
এ বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় যাইনি বলে যে কতো কতো প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যবঞ্চিত হয়েছি! লেখকদের সঙ্গে দেখা হয়নি। প্রকাশকদের সঙ্গে দেখা হয়নি। দেখা হয়নি বইমেলায় আসা আমার নানান বয়েসী পাঠক বন্ধুদের সঙ্গেও। জুনের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য নিউইয়র্কের বইমেলায় কানাডা থেকে আমার যাবার কথা থাকলেও প্রবাস জীবনের নানা রকমের হ্যাপা ব্যাপারটাকে প্রায় অনিশ্চিত করে ফেলেছিলো। তেমন একটা সময়ে টেলিফোনে কথা হচ্ছিলো প্রিয় সায়ীদ স্যারের সঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে তাঁরও আসবার কথা মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের ২৭ তম বইমেলায়। শরীর-মন-বয়েস ইত্যাদি নানান বিষয়ে বিস্তর কথাবার্তা চলছিলো আমাদের মধ্যে। সারা জীবন বয়েসকে বুড়ো আঙুল দেখানো চিরসবুজ মানুষটা এক পর্যায়ে বললেন, ”আজকাল কাউকে ‘আবার দেখা হবে’ বলতে গিয়ে কেমন অনিশ্চিত বোধ করি। আদৌ কি দেখা হবে আবার?…হাসান ফেরদৌস বললো, তুমিও নাকি আসছো ওদের বইমেলায়? আসবা নাকি? আসো আসো। ঢাকায় তো আসো নাই এইবার”……
স্যারের কথায় বুকের ভেতরটায় কেমন একটা মোচড় অনুভব করেছিলাম। সত্যি সত্যি আর যদি দেখা না হয়! আবার যদি সুযোগ না ঘটে! আর তক্ষুণি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যাবোই যাবো নিউইয়র্কে। যতো রকমের ঝামেলাই থাকুক না কেনো, যেতে আমাকে হবেই। গুরুর গুরুত্ব আমার কাছে অসীম। আক্ষরিক অর্থেই তিনি আমার গুরু। ঢাকা কলেজের ক্লাশ রুমে আমি তাঁর ‘সেরা ফাঁকিবাজ’ ছাত্র ছিলাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ছিলাম অন্যতম প্রিয় শিষ্য। আমার তুমুল যৌবনের সোনালি সময়টা কাটিয়েছি আমি বর্ণাঢ্য এই মানুষটার সান্নিধ্যেই। তারপর ছাত্র থেকে অনায়াসে হয়ে উঠেছি অসমবয়েসী বন্ধু। কতো অজস্র উজ্জ্বল মুহূর্ত তিনি আমাকে উপহার দিয়েছেন! সায়ীদ স্যার তাঁর ‘স্বপ্নের সমান বড়’ নামের বইটা উৎসর্গ করেছেন আমাকে। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন,’অনুজপ্রতিম খ্যাতিমান ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন প্রীতিভাজনেষু’। অর্থাৎ কী না, ছাত্র থেকে বন্ধু এবং বন্ধু থেকে অনুজপ্রতিম।
২৪ জুন বইমেলার শেষ দিনের ঝকঝকে বিকেলে মুক্তধারার স্টলে আমরা দু’জন মেতে উঠেছিলাম চিরাচরিত হাস্য আর খুনসুটিতে। নিউইয়র্কের বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী নিহার সিদ্দিকী আমাদের সেই সজীব মুহূর্গুলোকে ক্যামেরাবন্দি করেছে অপরূপ দক্ষতায়। ফেসবুকে ‘আমার চোখে দেখা’ শিরোনামে ১৭টি ছবির একটি এলবাম প্রকাশ করেছে নিহার। এবং এলবামের সাবটাইটেলে সে লিখেছে–‘ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের এইরকম অন্তরঙ্গ মুহূর্ত আগে কখনো চোখে পড়েনি।’
নিহারের তোলা সেই প্রাণবন্ত ছবির ১৫টি এখানে তুলে ধরছি আমার ফেসবুক বন্ধুদের উদ্দেশ্যে। অনেক অনেক ধন্যবাদ প্রীতিভাজন নিহার সিদ্দিকীকে।
এবং প্রিয় সায়ীদ স্যারের জন্যে এক সমুদ্র ভালোবাসা। আমাদের মাথার ওপরে, ছায়া হয়ে আরো দীর্ঘকাল আপনি দীপ্যমান থাকুন স্যার। আপনাকে খুব ভালোবাসি হে আলোর ফেরিঅলা।
অটোয়া ২৭ জুন ২০১৮]
হে দারিদ্য তুমি মোরে করো নাই মহান
তুমি মোরে দাও নাই খ্রীস্টের সম্মান……
লুৎফর রহমান রিটন
‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীস্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা।-দিয়াছ,তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’…
স্কুল লাইফ থেকেই নজরুলের ‘দারিদ্র্য’ শিরোনামের এই কবিতাটির ঘোর বিরোধী ছিলাম আমি। কবিতার আপাত দৃশ্যমান বক্তব্যের সঙ্গে কিছুতেই একমত হইনি। হতে পারিনি। বাংলা স্যারের সঙ্গে তর্ক করেছি। স্যার আমাকে দারিদ্র্যের মাহাত্ম্যের ব্যাপারটি কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। উলটো আমার যুক্তির কাছে হার মেনেছেন। দারিদ্র্য কখনোই সম্মানজনক নয়। (এই কবিতার অন্তর্গত মাহাত্ম্য বুঝতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে সুদীর্ঘকাল।)
লেখার সঙ্গে যুক্ত ছবিতে আমার গায়ে যে লাল নকশার শাদা শার্টটি, একদা ওটা খুবই প্রিয় ছিলো আমার। কুমিল্লার বিখ্যাত সূতি প্রিন্ট শার্ট। শার্লি আমাকে কিনে দিয়েছিলো সম্ভবত মৌচাকের ‘নিপুণ’ থেকে। অনটনের দৈত্যটা তখন আমার ঘাড়ে চেপে বসা, সিন্দাবাদের ভূতের মতো। বাইরে ভদ্র সমাজে যাবার মতো আমারএকমাত্র শার্ট তখন ওটা। দু’টো মাত্র শার্ট দিয়ে বছর পার করি তখন। কোনো কারণে দ্বিতীয় শার্টটা তখন ভদ্র সমাজে অনুপযুক্ত বিবেচনায় অই একটা শার্টই বারবার পরি। তখনই ঘটেছিলো ঘটনাটা।
আশির দশক। বাংলাদেশ টেলিভিশন তখন আমার অঘোষিত কর্মস্থল। বিটিভিতে চাকরি না করলেও নিয়মিত স্টাফের মতোই প্রতিদিন সকালে গিয়ে বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফিরতাম টিভি ভবন থেকে। নাটকের রেকর্ডিং থাকলে ফিরতাম রাত এগারোটার পর। ছোটদের দুটো ধারাবাহিক নাটক রচনা ও নির্দেশনা, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের স্কিড লেখা, গান লেখা, নতুন কুঁড়ির গ্রন্থনা ও নির্দেশনা ইত্যাদি কারণে প্রতি মাসে বেশ কয়েকটা চেক পেতাম। সেই চেকগুলো একসঙ্গে ব্যাংক একাউন্টে জমা দিয়ে মোটামুটি ধরণের একটা এমাউন্ট আমার পকেটে চলে আসতো। তা-ই দিয়ে অনায়াসে চলতো আমার টানাটানির সংসার।
সেই সময়ে, আমার তখন চরম দুঃসময়। আশির দশকের একবিকেলে বিটিভি ভবনে একটা অনুষ্ঠান বিষয়ে আমাদের বৈঠক ছিলো নওয়াজীশ আলী খানের সঙ্গে। আবেদ খান সানজিদা আখতার আর কামরুননেসা হাসানের সঙ্গে দোতলার লবিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছি এমন সময় সানজিদা আপা নোটিশ করলেন আমার শার্টটা–কি রে, রোজ রোজ একই শার্ট পরে আসিস কেনো? তোর কি আর কোনো শার্ট নেই?
খুবই রুচিস্নিগ্ধ সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন সংবেদনশীল অধ্যাপক সানজিদা আখতার অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখেঅজান্তেই আমার দারিদ্র্যের গোপন প্রাসাদটিকে গুঁড়িয়ে দিলেন। দারিদ্র্য আমাকে নজরুল বর্ণিত খ্রীস্টের সম্মান দেয়া থেকে বিরত থাকলো। নিজেকে বাঁচাতে সেকেন্ডেরও কম সময়ে আমি জবাব দিয়েছিলাম–আছে আপা। কিন্তু এই জামাটা আমার খুবই প্রিয় বলে দুইটা কিনেছিলাম একসঙ্গে। সেই কারণেই রোজ দেখছো একই শার্ট।
ঠিক তক্ষুণি না বুঝলেও আপা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন পরে যে ব্যাপারটা দারিদ্র্যসম্পৃক্ত।
হয়তো বাড়িতে ফিরে যাবার পর।
কিংবা অন্য কোনো একান্ত সময়ে যখন আয়নায় নিজের সঙ্গে দেখা হয় নিজের। যখন নিজের সঙ্গে জবাবদিহি করতে হয় নিজের।
ঐ ঘটনার বহুদিন পর, বছরের পর বছর সেই সানজিদা আপাই কোলকাতা থেকে আমার জন্যে কিনে এনেছেন অপূর্ব সব পাঞ্জাবি আর ফতুয়া। শার্লির পর আমার জীবনে পাওয়া সবচে সুন্দর পাঞ্জাবী আর ফতুয়াগুলো ছিলো সানজিদা আপার দেয়া উপহার। (সেই উপহার এখনো অব্যাহত গতিতে চলামান। যার অধিকাংশই টিভি দর্শকেরা দেখেছেন,পর্দায়।)
এখন আমার কয়েক ডজন ঝলমলে শার্ট প্রাইস স্টিকার লাগানো অবস্থায় পড়ে থাকে ক্লজেটে। পরাই হয় না।বারণ সত্ত্বেও, আমার প্রয়োজন না হলেও শার্লি নিয়ম করে কিনে আনে সুন্দর সুন্দর শার্ট, একের পর এক। আজকে পুরনো ছবির য়্যালবাম দেখতে দেখতে সেই ঐতিহাসিক কুমিল্লা প্রিন্ট সূতি শার্ট পরা ছবিটা দেখেই এক ঝটকায় মনে পড়ে গেলো আমার কষ্টের স্মৃতিটা। দারিদ্র্য যখন আমাকে খ্রীষ্টের সম্মান না দিয়ে অসম্মানের চূড়োয় পৌঁছে দিয়েছিলো!
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই না থাকলে জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে উল্টেপাল্টে দেখার সুযোগ আসে না। দেখাই হয় না সত্যিকারের জীবনকে। নজরুলের এই কবিতাটি আমার অন্যতম প্রিয় একটা কবিতা এখন। যদিও আমি বিশ্বাস করি–দারিদ্র্য কখনোই কাউকে মহান করে না। সেই মহত্ব অর্জন করতে গেলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় একটা জীবন। দারিদ্র্যের অগ্নি-প্রজ্জ্বলিত ধ্বংসস্তুপ থেকে ফিনিক্স পাখি হয়ে নতুন করে ডানা মেলতে পারে না অধিকাংশ জীবন।
অটোয়া, কানাডা
