
একদিকে ৯৬ বছর বয়সী বাবার গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা, অন্যদিকে বাড়ির দেয়ালে অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতিকারীদের আঁকা গ্রাফিতি নিজ খরচে মুছে ফেলার নির্দেশ। ব্যক্তিগত ও আর্থিক দুই ধরনের চাপের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে টরন্টোর চায়নাটাউনের একটি পরিবার।
পরিবারটির সদস্য অ্যানি উ জানান, গত কয়েক মাসে তার বাবাকে একাধিকবার স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। সর্বশেষ তিনি পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে ফাটল ধরেন। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা আরও একটি গুরুতর সমস্যা শনাক্ত করেন ডিসফেজিয়া বা খাবার ও পানি গিলতে অসুবিধা। অ্যানি উ বলেন, “আমরা যখন কথা বলছি, তখনও তিনি হাসপাতালের বিছানায় রয়েছেন।” তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ৯৬ বছর বয়সী বাবার দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা কীভাবে করা হবে, তা নিয়েই পরিবারটি দুশ্চিন্তায় ছিল। ঠিক সেই সময় নতুন করে আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
সম্প্রতি টরন্টোর মিউনিসিপাল লাইসেন্সিং অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস (MLS) বিভাগ থেকে একটি নোটিশ আসে। সেখানে বাড়ির বাইরের দেয়ালে থাকা গ্রাফিতি ২০ দিনের মধ্যে নিজস্ব খরচে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় নগর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। অ্যানি উর অভিযোগ, গ্রাফিতি তারা আঁকেননি, বরং অজ্ঞাত ব্যক্তিরাই রাতের অন্ধকারে এসে দেয়ালে এসব আঁকিবুঁকি করে যায়। এরপর কোনো প্রতিবেশী হয়তো বাড়িটির ছবি তুলে এমএলএসে পাঠিয়েছেন, যার ভিত্তিতেই এই নোটিশ এসেছে। তিনি বলেন, “দেওয়াল পরিষ্কার করার জন্য একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে হবে। এর খরচ প্রায় ৫ হাজার ডলার। এই মুহূর্তে বাবার চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পরিচর্যার ব্যয় সামলাতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তার মধ্যে এই অতিরিক্ত খরচ আমাদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
পরিবারটির বাড়িটি টরন্টোর চায়নাটাউন এলাকার সুলিভান স্ট্রিটে অবস্থিত। ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের লাল ইটের তৈরি পুরোনো এই বাড়ির দক্ষিণ পাশের দেয়ালটি যেন দীর্ঘদিন ধরেই গ্রাফিতি শিল্পীদের লক্ষ্যবস্তু। অ্যানি উ জানান, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় তিন বছর আগেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল তাদের পরিবার। তখনও নিজেদের অর্থ ব্যয় করে পুরো দেয়াল পরিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার একই ঘটনা ঘটে। তার ভাষায়, “বছরের পর বছর আমরা একই চক্রের মধ্যে আটকে আছি। নিজের টাকায় পরিষ্কার করছি, তারপর আবার কেউ এসে গ্রাফিতি এঁকে যাচ্ছে।” তিনি মনে করেন, সমস্যাটি কেবল তাদের পরিবারের নয়; বরং পুরো চায়নাটাউন এলাকার অনেক বাসিন্দাই একই ভোগান্তির শিকার।
স্পাদিনা অ্যাভিনিউ ও আশপাশের বিভিন্ন গলি, পাবলিক লেনওয়ে, গ্যারেজ এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনের দেয়ালে অসংখ্য গ্রাফিতি দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, এসবের বেশিরভাগই অনুমতি ছাড়াই আঁকা হয়েছে এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করলে পুরো এলাকাই নোংরা ও অবহেলিত বলে মনে হয়। অ্যানি উ বলেন, “এই এলাকা বহু বছর ধরেই গ্রাফিতির লক্ষ্যবস্তু। বাড়ির মালিকদের বারবার নিজের অর্থ ব্যয় করে দেয়াল পরিষ্কার করতে হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ না থাকায় কিছুদিন পরই আবার একই অবস্থা তৈরি হয়।” স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রাফিতি প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বরং বাড়ির মালিকদেরই আর্থিক দায় বহন করতে হচ্ছে, যদিও তারা নিজেরা কোনোভাবেই এই ভাঙচুর বা ক্ষতির জন্য দায়ী নন।
নগর কর্তৃপক্ষের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যেখানে সম্পত্তির মালিকরা বারবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন, সেখানে কেবল নোটিশ পাঠিয়ে দায় চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, নজরদারি বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ৯৬ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার অনিশ্চয়তার মধ্যে এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পরিবারটির সংকট আরও গভীর করেছে। ফলে বিষয়টি শুধু একটি গ্রাফিতি পরিষ্কারের নোটিশ নয়, বরং নগর জীবনে ব্যক্তিগত দুর্ভোগ, জননিরাপত্তা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
