
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল বিতর্কিত “মেক্সিকো সিটি পলিসি” বা “গ্লোবাল গ্যাগ রুল”। গর্ভপাত, বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং এলজিবিটিকিউ+ অধিকারের পক্ষে কাজ করা সংস্থাগুলোর জন্য মার্কিন তহবিল বন্ধ করার এই নীতিকে ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কানাডার দাতা সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক মার্কিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান প্রশাসনের সম্ভাব্য কড়াকড়ি ফের জোরদার হওয়ার আশঙ্কায় কানাডিয়ান উন্নয়ন সংস্থাগুলো এখন বিকল্প কৌশল খুঁজছে। তারা মনে করছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র আবারও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সহায়তায় কঠোর শর্ত আরোপ করে, তবে বিশ্বের দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
অক্সফাম কানাডার আন্তর্জাতিক কর্মসূচির পরিচালক এরিন কিলি সতর্ক করে বলেছেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে নারীদের জীবনে। তার ভাষায়, নিরাপদ গর্ভপাত, পরিবার পরিকল্পনা কিংবা বৈজ্ঞানিক যৌন স্বাস্থ্য তথ্যের অভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের হার বাড়বে। এর ফলে মাতৃমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিলি বলেন, “এই ধরনের সহায়তা বন্ধ হলে বাস্তবিক অর্থেই আরও বেশি মানুষ মারা যেতে পারে।” মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যৌন স্বাস্থ্যসেবা কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি নারীর অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
১৯৮৫ সালে রিপাবলিকান প্রশাসনের সময় প্রথম চালু হয় “মেক্সিকো সিটি পলিসি”। আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে ঘোষিত হওয়ায় এই নামকরণ করা হয়। সমালোচকেরা একে “গ্লোবাল গ্যাগ রুল” বলেও অভিহিত করেন। নীতিটির মূল বিষয় হলো যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা গর্ভপাত নিয়ে পরামর্শ দেয়, গর্ভপাত সেবা দেয়, কিংবা গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে প্রচারণা চালায়, তারা মার্কিন সরকারের উন্নয়ন সহায়তা পাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নীতিটিও বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রশাসন সাধারণত এটি বাতিল করেছে, আর রিপাবলিকান প্রশাসন পুনর্বহাল করেছে। ফলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রায়ই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই নীতি শুধু গর্ভপাত-সংক্রান্ত সেবাকেই প্রভাবিত করে না; বরং পরিবার পরিকল্পনা, এইচআইভি প্রতিরোধ, যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং নারীস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক অনেক কর্মসূচির অর্থায়নও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে এই নীতি কার্যকর হয়েছে, সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অনিরাপদ ও অবৈধ গর্ভপাতের ঘটনাও। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অনেক সংস্থা মার্কিন তহবিল হারানোর ভয়ে পরিবার পরিকল্পনা বা যৌন স্বাস্থ্যসেবা সীমিত করে দেয়। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং চিকিৎসা সেবার সুযোগ কমে যায়। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে নারীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার দাতা গোষ্ঠীগুলো দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তিনি সমমনা দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠন করেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা কমিয়ে দিলে কানাডা, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং অন্যান্য প্রগতিশীল রাষ্ট্র একসঙ্গে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য কর্মসূচির অর্থায়ন বজায় রাখতে পারে। সহায়তা সংস্থাগুলো মনে করছে, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যখাতে “ফেমিনিস্ট এইড” বা নারীকেন্দ্রিক উন্নয়ন সহায়তা থেকে সরে আসা হলে তা বহু বছরের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেবে। তারা চাইছে, কানাডা যেন তার “জেন্ডার-লেন্সড” স্বাস্থ্য সহায়তা নীতি আরও দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখে। বর্তমানে এই প্রতিশ্রুতির মেয়াদ ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা।
এটি প্রথমবার নয় যে কানাডায় এমন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০১০ সালে তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের সরকারও আন্তর্জাতিক সহায়তায় গর্ভপাত সংক্রান্ত অর্থায়ন সীমিত করেছিল। তখন সরকার মাতৃস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বাড়ালেও গর্ভপাত সেবার জন্য তহবিল ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। তবে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো বিকল্প উপায় বের করেছিল। তারা নেদারল্যান্ডসসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তহবিল ব্যবহার করে গর্ভপাত ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের বিকল্প অর্থায়ন মডেল নিয়ে আলোচনা চলছে।
এই বিতর্ক মূলত উন্নয়ন সহায়তার আদর্শগত দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তি গর্ভপাতবিরোধী অবস্থানকে আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রতিফলিত করতে চাইছে, অন্যদিকে মানবাধিকার ও স্বাস্থ্য সংগঠনগুলো এটিকে নারীর মৌলিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কঠোর অবস্থানে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কাঠামোতে নতুন বিভাজন তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে আরও বড় আর্থিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিতে হতে পারে। আগামী কয়েক বছর বৈশ্বিক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
