
স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইবার সচেতনতা যাচাই করতে গিয়ে এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর হেলথ সার্ভিসেস (এনএলএইচএস), যা উল্টো তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাড়তি অর্থ বা বিশেষ পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজার হাজার নার্স, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে একটি ইমেইল পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, সেটি কোনো প্রকৃত অর্থপ্রদানের ঘোষণা নয়; বরং কর্মীদের ফিশিং হামলা সম্পর্কে সচেতনতা যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত একটি সাইবারসিকিউরিটি পরীক্ষা।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিয়ন নেতাদের অভিযোগ, কর্মীদের মানসিক অবস্থা, দীর্ঘদিনের কর্মচাপ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একটি ব্যর্থ সাইবার মহড়া নয়, বরং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের উদাহরণ।
নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের রেজিস্টার্ড নার্সেস ইউনিয়নের সভাপতি ইয়েটে কফি কঠোর ভাষায় এই ঘটনার সমালোচনা করে বলেন, এটি কর্মীদের প্রতি অসম্মান এবং অপমানের শামিল। তার ভাষায়, “আমাদের সদস্যরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। আমিও একইভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ। যারা প্রতিদিন রোগীদের সেবায় নিজেদের সর্বোচ্চটা দিচ্ছেন, তাদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
ইউনিয়নের দাবি, স্বাস্থ্যকর্মীরা গত কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপ, জনবল সংকট এবং প্রযুক্তিগত নানা সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের প্রতিশ্রুতিসংবলিত একটি ইমেইল অনেকের কাছেই স্বস্তির বার্তা হিসেবে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু সেটি যে আসলে একটি পরীক্ষামূলক ফাঁদ ছিল, তা জানার পর কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
বিতর্কের মুখে এনএলএইচএসের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। সংস্থাটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রন জনসন সাংবাদিকদের জানান, কীভাবে এমন একটি ইমেইল অনুমোদন পেল এবং কারা এর বিষয়বস্তু তৈরি করেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, ইমেইলটি এনএলএইচএসের নিজস্ব কর্মীরা তৈরি করেছেন, নাকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াংয়ের ঠিকাদারদের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে সেটিও তদন্ত করে নিশ্চিত করা হবে।
রন জনসনের কথায়, “এই ইমেইল আমাদের কর্মীদের প্রতি যে সম্মান ও মূল্যায়ন আমরা করি, তার প্রতিফলন নয়। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং কোথায় ভুল হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হবে।”
তবে ইউনিয়নের মতে, এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। ইয়েটে কফির দাবি, নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ জমে রয়েছে। বিশেষ করে নতুন স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কোরকেয়ার চালুর পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
ইউনিয়নের অভিযোগ, নতুন সফটওয়্যার চালুর সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি কর্মীদের বাধ্যতামূলক ওভারটাইম করতে হয়েছে এবং সফটওয়্যার বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনেকেই নির্ধারিত ছুটিও পাননি। এতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ এবং ক্লান্তি বহুগুণ বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বোনাস বা অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের আশ্বাস দিয়ে পাঠানো ইমেইলকে অনেক কর্মী বাস্তব সহায়তার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু পরে সেটি যে শুধুই একটি ফিশিং পরীক্ষা ছিল, তা জানার পর অনেকেই নিজেদের প্রতারিত ও অপমানিত বলে মনে করছেন।
ইউনিয়ন নেতাদের আশঙ্কা, এই ধরনের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান জনবল সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যেই অনেক অভিজ্ঞ নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী আগাম অবসরের কথা ভাবছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের মতে, কর্মীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না; বরং কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, প্রযুক্তি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাস্থ্যখাতে সংরক্ষিত রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য সাইবার হামলার অন্যতম বড় লক্ষ্য। তবে এমন প্রশিক্ষণ বা পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রেও কর্মীদের মনস্তত্ত্ব, কর্মপরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থার বিষয়টি সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির পরিবর্তে কর্মীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
