
ফরিদুর রেজা সাগর মানে সাগর ভাইয়ের মধ্যে অনেক ইন্টারেস্টিং বিষয় আছে যেগুলো আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। আমি মজা পাই। সাগর ভাই মজা করতে আর মজা পেতে ভালোবাসেন। অন্যকে মজা দেয়ার জন্যে এমন সব কান্ড করেন মাঝে মধ্যে যাতে করে তাঁকে একজন শিশু ভাবাটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। চ্যানেল আই অফিসে তিনি এমডি অর্থাৎ বিগবস। বাংলাদেশে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সম্ভবত তিনিই একমাত্র এমডি যাঁর কক্ষের দরোজা সারাক্ষণ হাট করে খোলা থাকে। যখন তখন যে কেউ হুটহাট ঢুকে পড়তে পারেন তাঁর কক্ষে। কোনো এপয়েনমেন্ট লাগে না।
সাগর ভাইয়ের টেবিলটা খুব বড় নয়। মাঝারি মাপের টেবিলের ওপর বাঁ দিকে কিছু বই রাখা থাকে। নিজের বই অন্যের বই। আর থাকে অনেকগুলো খেলনা। হ্যাঁ খেলনা। ছোট বাচ্চারা যেরকম তাদের পড়ার টেবিলে খেলনা সাজিয়ে রাখে ঠিক তেমন করে সাগর ভাইও সাজিয়ে রাখেন খেলনা। হরেক কিসিমের। এই খেলনাগুলো দিয়ে তিনি খেলেন। খেলতে খেলতে কথা বলেন অতিথিদের সঙ্গে। বিশাল অংকের ব্যবসায়িক আলাপের সময়ও আমি লক্ষ্য করেছি তিনি খেলছেন খেলনা নিয়ে আর কথা বলছেন ক্লায়েন্টের সঙ্গে।
তাঁর খেলনাগুলোও ভারী মজার। বাংলাদেশের টিভি-সিনেমা এবং সঙ্গীতের বিখ্যাত মানুষজনকে তিনি অবলীলায় তাঁর খেলার সঙ্গী করে ফেলেন কথা বলতে বলতে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে! তাঁর খেলার শিকার হয়ে নাস্তানাবুদ হন মহাতারকারাও! আর সেটা দেখে আমি এবং আমরা হেসে গড়াগড়ি খাই। ‘খেলার শিকার’ কথাটা কেনো বললাম সেটা ব্যাখ্যা করি।
টিভি পর্দার প্রথম সারির জনপ্রিয় নায়ক মাহফুজ। আমাদের খুবই প্রীতিভাজন। এক দুপুরে মাহফুজ এসেছে সাগর ভাইয়ের কাছে। সাগর ভাই কথা বার্তার এক পর্যায়ে পিওন শাজাহানকে বললেন মাহফুজকে এক পিস কেক দিতে। শাজাহান একটা পিরিচে বাহারি রঙের একপিস কেক নিয়ে এলো। সাগর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাস্যোজ্জ্বল মাহফুজ পিরিচ থেকে কেকটা তুলে কামড় বসাতে চাইলো। কিন্তু কামড় বসিয়েই পড়লো বিপদে। কেকটা নরম ঠিকই কিন্তু কামড় দিয়ে তাকে টুকরো করা যাচ্ছে না! মাহফুজ তার দাঁতের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করলো। কিন্তু নাহ্। কাজ হলো না। কেকটা কিছুতেই টুকরো হচ্ছে না। ঘটনা কী? ঘটনা হচ্ছে ওটা একটা ফেক কেক। খেলনা কেক আর কি! কিন্তু দেখতে একেবারেই অরিজিনাল! কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহফুজ বুঝতে পারলো যে সে সাগর ভাইয়ের ফাঁদে পা দিয়েছে। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে ওর সেকী হাসি! হাসির গমকে বেচারা চেয়ার থেকে পড়ে যায় যায় অবস্থা!
আরেকজনের কথা বলি। নামটা বরং উহ্যই থাকুক। কে কখন মানহানীর মামলা ঠুকে দেয়! তিনি খুব বিখ্যাত একজন সঙ্গীত শিল্পী। তারকাতো বটেই। নিচ তলার স্টুডিও থেকে লাইভ ‘তারকা কথন’ শেষ করে ওপর তলায় এসেছেন সাগর ভাইয়ের সঙ্গে মোলাকাত করতে। সাগর ভাইয়ের হাতে একটা খেলনা। ছোট্ট একটা খেলনা। টিয়ে রঙের। দুদিকে ছড়ানো মাঝখানে স্প্রিং লাগানো ছোট্ট খেলনাটা অনায়াসে মুঠোয় পোড়া যায়। মুঠোয় পুড়ে দুদিকের ছড়ানো অংশটাকে টেনে কাছাকাছি আনতে হয়। এটা এক ধরণের কবজি ব্যায়াম। সাগর ভাই নিজে সেই ব্যায়ামটা ক্ষ্যান্ত দিয়ে তারকা কণ্ঠশিল্পীর দিকে সেই বস্তুটা এগিয়ে দিলেন। শিল্পী সেটা মুঠোয় পুড়ে দিলেন একটা চাপ। এবং মুহূর্তেই ‘ওরেব্বাবারে’ বলে একটা আর্ত চিৎকার করে ছুঁড়ে ফেললেন বস্তুটা ফ্লোরের দিকে। ভয়াবহ পরিস্থিতি। কিন্তু আমরা হাসছি। ঘটনা কী? ঘটনা সামান্যই। খেলনাটায় চাপ দিলে তার ভেতরে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং সেই বিদ্যুৎ সেকেন্ডেরও কম সময়ে শরীরে প্রবাহিত হয়ে ঝিঁঝিঁ ধরানো একটা ঝাঁকুনি দেয়। সেই ঝাঁকুনি হজম করা কঠিন। সুতরাং শিল্পীর আর্তনাদ স্বাভাবিক কিন্তু সাময়িক। শিল্পীর আর্তনাদে কক্ষে উপস্থিত আমরা অন্যরা সমব্যথী না হয়ে বরং বিপুল হাস্যে ঢলে পড়ছি। কয়েক সেকেন্ড পর ধাতস্ত হয়ে সেই শিল্পীও যোগ দিলেন আমাদের সম্মিলিত হাস্যরোলে। সে এক অনাবিল আনন্দময় মুহূর্ত! স্মার্ট শিল্পী ধকল সামলে কৌতুহলী হয়ে ওঠেন—সাগর ভাই এটা কোত্থেকে যোগাড় করলেন! (এধরণের শকিং রেজর, শকিং নেইল কাটার, শকিং স্টেপলার সাগর ভাই সংগ্রহ করেন পৃথিবীর নানা দেশ থেকে।)
দেশের বিখ্যাত এক সুটেড-বুটেড সেলিব্রিটি এসেছেন সাগর ভাইয়ের দরবারে। চ্যানেল আই তখন সিদ্ধেশ্বরীতে। সাগর ভাইয়ের মুখোমুখি বসে সেই সুটেড-বুটেড হাইভোল্টেজ কথাবার্তা দিয়ে সাগর ভাইকে চমকে দিতে বা হতবাক করে দিতে চাইছেন। কিন্তু সাগর ভাইকে চমকানো অতো সহজ না। সাগর ভাই তাঁর টেবিলে থাকা একটা খেলনা সেই সেলিব্রিটির দিকে এগিয়ে দিলেন। খেলনাটা একটা দুষ্টু বালকের পূর্ণশরীরের প্রতিবিম্ব বা প্রতিকৃতি। উচ্চতায় ছয়সাত ইঞ্চি। লাল হাফপ্যান্ট পরা সেই দুষ্টু বালক শরীরটা খানিক বাঁকিয়ে চোখ টিপে হাসছে। ওর মাথায় একটা খাকি রঙের ক্যাপ। সাগর ভাই বালকটিকে সেই সেলিব্রিটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন—ওর মাথায় একটা চাপ দিয়ে দেখেন কী রকম ডান্স শুরু হয়। বালকটির সমুখভাগ সেলিব্রিটির দিকে ফেরানো। সেলিব্রিটি সাগর ভাইয়ের মিষ্টি কথায় বালকটির মাথায় একটা চাপ দিতেই ঘটলো মারাত্মক ঘটনা। বালকের লাল হাফপ্যান্টটা ধাঁই করে হাঁটুর নিচে নেমে গেলো। এবং ন্যাংটাপুটু বালকটার ইয়ে থেকে পিচকিরির মতো জলধারা এসে ভিজিয়ে ফেললো সেলিব্রিটির কোট-টাই আর শাদা শার্টের কিছু অংশ! ভূত দেখার মতো চমকে গিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন সেলিব্রিটি। ঘরের ভেতর তখন হাসির তুফান। কয়েক সেকেন্ড পর সেই হাসিতে যোগ দিলেন জামাভেজা সেলিব্রিটিও! দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকার সঙ্গে একই কান্ড করেছিলেন সাগর ভাই। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব চিত্রনায়িকাটি ঘাবড়ে গিয়ে এমন চিৎকার দিয়েছিলো যে মনে হচ্ছিলো সত্যিকারের কোনো বালক বুঝিবা বাস্তবেই তার পিচকিরি প্রয়োগ করেছে! সাগর ভাইয়ের খেলনার শিকার সেলিব্রিটিরা তাই খুব সাবধানে থাকেন দ্বিতীয়বার তাঁর কক্ষে এসে। খুব সাবধানে তাঁরা জিনিসপত্র হ্যান্ডল করেন। সত্যিকারের কেকপিস দিলেও ফর্ক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওটার সৌন্দর্য বিনষ্ট করে নিশ্চিত হয়ে তারপর সেটা মুখে দেন।
সাগর ভাইয়ের অতিথিদের জন্যে খানাখাদ্যের তালিকায় মিষ্টিটা মাস্ট আইটেম। আমি বাংলাদেশে থাকার পুরো সময়টায় প্রতিদিন সমানে মিষ্টি সাঁটাই। পিওন শাজাহানকে বলে রাখেন সাগর ভাই। আমি অফিসে যাওয়া মাত্র শাজাহান আমাকে রিপোর্ট করে—‘আইজ নাটোরের কাঁচাগোল্লা আছে। আইজ কুমিল্লার রসমালাই রাখছি। আইজ আছে গুড়ের সন্দেশ। পোড়াবাড়ির চমচম খাইবেন্নি? সাগর স্যার আইজ আপ্নের লাইগা রসগোল্লা রাখছে কয়েকটা। কেউরে দিতে মানা কর্ছে। খালি আপ্নেরে খাওয়াইতে কইছে।’ আমি আর কী করি! সাগর ভাইয়ের সম্মান রক্ষার্থে পাবলিকের অগোচরে সমানে লোপাট করি বাহারি সব মিষ্টান্ন! কী অসামান্য টেস্ট একেকটার! পৃথিবীর সেরা মিষ্টিগুলো সব বাংলাদেশেই তৈরি হয়!
সিনেসাংবাদিক আবদুর রহমান খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাগর ভাইয়ের। আবদুর রহমানকে একবার কোনো কাজে খুশি হয়ে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন সাগর ভাই। অদূরেই সোফায় বসে আমি সেদিনের দৈনিকপত্রিকাগুলোয় চোখ বুলাচ্ছি। সাগর ভাইয়ের নির্দেশে শাজাহান প্রথমে এক পিস সন্দেশ দিলো রহমান ভাইকে। রহমান ভাই সেটা খেয়ে আহা উহু করছেন! দারূণ টেস্টি। অসাধারণ সন্দেশ। এরপর সাগর ভাই শাজাহানকে বললেন—শাজাহান! স্যারকে একটা মালাই মিষ্টি দাও। জলদি। শাজাহান একটা পিরিচে আড়াআড়ি ভাবে দ্বিখন্ডিত করা এবং মাঝখানে মালাইয়ের পুর দেয়া একটা মিষ্টি এনে রাখলো রহমান ভাইয়ের সামনে। রহমান ভাই ফর্ক দিয়ে সেটা গেঁথে তুলতে চাইলেন কিন্তু গাঁথতে পারলেন না। মিষ্টিটা সফট্ কিন্তু ফর্কে গাঁথা যাচ্ছে না। অতঃপর রহমান ভাই ভুলটা করলেন। হাত দিয়ে মিষ্টিটা তুলে ধরে মুখের ভেতর অর্ধেকটা অংশ চালান করে দিলেন একটা রাম কামড়। কিন্তু সেই রাম কামড়ে মিষ্টি ভাঙবে কী উলটো রহমান ভাইয়ের দাঁতই ভেঙে যাওয়ার যোগাড়। আমার চোখে চোখ পড়তেই কী বোকামি তিনি করেছেন সেটা বুঝে গেলেন রহমান ভাই। এবং তারপর তাঁর শিশুতোষ প্রতিবাদ—ধুর এইটার কোনো মানে হয়! বাইরের লোকের সঙ্গে তুমি এইসব করো ঠিকাছে কিন্তু ঘরের মানুষও…।
আর এদিকে আমি হাসছি। সাগর ভাই হাসছেন। শাজাহান হাসছে লুকিয়ে লুকিয়ে। রহমান ভাইও কিছুক্ষণ পর বোকা বোকা হাসিতে শামিল হলেন আমাদের সঙ্গে—সাগর তুমি পারোও!
আসলেই। সাগর ভাই পারেনও বটে! ষাট পেরুনো অতিব্যস্ত একজন মানুষ তিনি, অথচ কী অবাক কান্ড! খেলনা নিয়ে মেতে থাকেন! শিশুদের অনিন্দ্যসুন্দর জগতের সার্বক্ষণিক বাসিন্দা না হলে এটা সম্ভব নয়। ছোটদের বর্নিল ভুবনের নির্মাতাকে খানিকটা শিশু তো হতেই হয়। আমরা আমাদের ভেতরের শিশুটাকে যতোদিন লালন করতে পারি পরম মমতায় ততোদিনই আমরা সজীব আর প্রাণবন্ত থাকি। অন্তরের মনিকোঠায় বেঁচে থাকা শিশুটা বার্ধক্যে আক্রান্ত হলেই আমরা বুড়িয়ে যাই। সাগর ভাইয়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকার রহস্যটা এখানেই। সবুজ শৈশবটাকে তিনি তাঁর বুক পকেটে ধরে রেখেছেন একজন দুর্দান্ত ম্যাজিশিয়ানের মতো। চ্যানেল আইয়ের এমডির টেবিলে তাই এতোগুলো খেলনার আনন্দ শোভাযাত্রা।
অটোয়া, কানাডা
