
ছড়ার একনিষ্ঠ পাঠক আমি। প্রতিদিন ছড়া পড়ি। পরিচিতজনের ছড়া তো পড়িই। অপরিচিতজনের ছড়াও পড়ি সমান আগ্রহে। যে কারো একটা ভালো ছড়া পাঠ করে প্রসন্ন আর উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠি। আমাকে ট্যাগ করা লাগে না। এমনিতেই খুঁজে পেতে পড়ে নিই আমি আমার অভ্যেস এবং পাঠরুচির কারণে। বাংলাদেশে বিশাল একটা পরিবার আছে। সেটা ছড়া পরিবার। এই পরিবারের প্রতিটা সদস্য আমার আত্মার আত্মীয়। এই পরিবারের যে কারো যে কোনো ছোট্ট সাফল্যেও আমি গর্বিত হই।
প্রতিবছর বইমেলায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে আমি ছড়ার বইগুলো দেখি। অধিকাংশই পড়ে ফেলি স্টলে দাঁড়িয়েই। ছড়া পড়তে আমার সময় কম লাগে। তাছাড়া র্যাপিড রিডিং এবং স্ক্যান রিডিং পদ্ধতিও কাজে লাগাই। সাধারণত কারো কোনো ভালো ছড়াই আমার চোখ এড়ায় না। পছন্দ হলে কিনে ফেলি বইটা। এছাড়া উপহার পাই প্রচুর, অটোগ্রাফসহ। এবছর বইমেলায় দুর্দান্ত একটা ছড়ার বই উপহার পেয়েছিলাম রনির কাছ থেকে। বইটির নাম গুল্টু। খুব সুন্দর ছড়া লিখতো রনি। এক সময় ওর নাম ছিলো মাহফুজুর রহমান রনি। এখন মাহফুজ রহমান। বইটির চোখ কাড়া প্রচ্ছদ এবং ঝলমলে ছবিগুলোও ওরই আঁকা ছিলো!
একইসঙ্গে আঁকাআঁকি আর লেখালেখির এরকম দ্বৈত প্রতিভা নিয়ে জন্মানো মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব কম। সেই হিশেবে রনি(মাহফুজ রহমান) একটি বিরল প্রতিভা আমাদের ছড়ার ভুবনে। ওর প্রথম ছড়ার বইটি পড়েই চমকে উঠেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। প্রতিভার তুলনায় রনি খুব কম লেখে।
থাকি দূর দেশে। তাই সবার সব বই পাওয়ার সুযোগ নেই। পড়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু ফেসবুক তো আছে! ফেসবুকে আমি সবার ছড়া পড়ি সমান আগ্রহ নিয়ে। অনেকেই দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নিজের ছড়াটির স্ক্যানকপি ফেসবুকে আপলোড করেন। তাতে আমার পত্রিকা না পড়ার ঘাটতিটা পূরণ হয়ে যায় অতি সহজেই।
টু বি ভেরি অনেস্ট, প্রীতিভাজন কয়েকজন অনুজপ্রতিম ছড়াবন্ধুর ছড়ার আমি অনুরাগী পাঠক, ফেসবুকে। খুবই অনুরাগী পাঠক। তালিকাটা খুব ছোট নয়। কিন্তু যদি আমাকে বলা হয় যে এই সময়ের ভালোলাগার ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে পাঁচটা নাম বলুন তো চট করে! এই সময়ের এবং ফেসবুকে যারা সক্রিয় তাদের নাম যদি বলতে বলা হয় তাহলে কোনো কিছু না ভেবেই যাদের নাম আমি মুহূর্তেই উচ্চারণ করবো তারা হচ্ছে–রোমেন রায়হান, আখতারুজ্জামান আজাদ, ব্রত রায়, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং আহমেদ সাব্বির।
এই পঞ্চপাণ্ডবকে নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়।
রোমেনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একদিন দু’দিনের নয়। দীর্ঘ কালের।ওর বাবার চাকরির সুবাদে যখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় থাকে, তখন, হরতালের দিন হাতে রসগোল্লা আর কালোজামের দুইটা প্যাকেট নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতো সে এলিফ্যান্ট রোডে আমার বাসায়। ড্রয়িং রুমে আমি শুয়ে আছি কার্পেটের ওপর আর আমার মাথার কাছে বসে কথা বলে যাচ্ছে রোমেন এই দৃশ্যটা নিয়মিত ছিলো। খুব ভালো লিখতো সে শৈশব থেকেই। দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতার বাইরে উন্মাদ পত্রিকায় নিয়মিত লিখে ব্যাপক সংখ্যক পাঠকের হৃদয় অধিকার করে নিয়েছে রোমেন। ওর ছড়ার বইয়ের প্রকাশকের কাছেও গোপনে খবর নিয়েছি। প্রকাশকও চুপিচুপি আমাকে বলেছেন–আপনার পরে লেখকের নাম ধরে ছড়ার বইয়ের খোঁজ করতে আসে পাঠক একমাত্র রোমেন রায়হানেরই! এখন রোমেন নিয়মিত ফেসবুকে চলমান ঘটমান রাজনীতি ও সামাজিক নানান অসংগতি নিয়ে ধামাধাম লিখে ফেলে ছড়া। ভৌগলিক কারণে কিছুতেই পেরে উঠি না রোমানের সঙ্গে। গ্লোভের অপর পিঠে থাকি বলে বাংলাদেশ যখন জেগে থাকে কানাডা তখন ঘুমোয়। আমি ঘুম থেকে উঠে টিভি-ইন্টারনেট অন করে বাংলাদেশের সমসাময়িক ঘটনাগুলো জানার চেষ্টা করি। তারপর একটা বিষয় সিলেক্ট করে লিখতে বসি। এবং ফেসবুক ওপেন করেই দেখি–সেই বিষয়ে আমার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগে আমার অনেক আগেইরোমেন লিখে বসে আছে দুর্দান্ত একটা ছড়া। পেরে উঠি না ওর সঙ্গে! (কী বিপদ!!)
আখতারুজ্জামান আজাদ মূলত কবি। কিন্তু ওর ছড়ার হাতটা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ভাগ্যিস সে নিজের ছড়াকার পরিচয়টা নিয়ে সোচ্চার নয়। নিজেকে সে ছড়াকার ভাবলে খবর ছিলো অনেকের। চলমান রাজনৈতিক সামাজিক ইস্যু নিয়ে আজাদের একেকটা ছড়া পড়ি আর মুগ্ধ হই। বয়স্কজনপাঠ্য ওর ছড়াগুলোয় দারুণ একটা ম্যাজিক থাকে। পাঠককে যা আকর্ষণ করে তীব্র ভাবে। ছড়াকারদের মধ্যে ওর সঙ্গেই আমার খুব কম দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।
খুব কম দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে ব্রত রায়ের সঙ্গেও। সাকুল্যে দু’দিন। একবার ঢাকায় বইমেলায়। আরেকবার কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অডিটোরিয়ামে। নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সংসদের একটি অনুষ্ঠানে। সাম্প্রতিক কালে ওর ছড়াই পড়েছি সবচে বেশি। ব্রতর ছড়া পড়তে হয়। না পড়লে নাকি পিছিয়ে পড়তে হয়! পপকর্ন বা খই ফোটার মতো ওর ছড়া ফুটতেই থাকে অবিরাম। বিষয়ের কোনো অভাব নেই ওর। মিল এবং চমকের কোনো সীমা পরিসীমাও নেই। ব্রত এসেছে ছড়াকারদের বিপদে ফেলতে। সারাক্ষণ একটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব ওর–আয় ব্যাটা খেলবি আমার সঙ্গে! যে কোনো বিষয়ই ছড়া হয়ে ওঠে ব্রতর হাতে।
কলকাতায় বাংলাভাষার পণ্ডিত গবেষক পবিত্র সরকার আমাকে বলেছিলেন–তোর ছড়ার পর তোদের ব্রত রায়ের ছড়া আমার খুব ভালো লাগে। কী দারুণ একেকটা মিল দেয় সে! বাংলাদেশে ব্রত রায় ছাড়াও আরেকজন ছড়াকারের ছড়ার মুগ্ধ পাঠক তিনি। নাম তাঁর রেবেকা ইসলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন–তুই পড়েছিস ওর লেখা? বলেছি–নিশ্চয়ই। বাংলাদেশের সব ছড়াকারের ছড়াই আমার পড়া। এমন কি গতকাল লিখতে আসা ছড়াকারের ছড়াও আমি সমান আগ্রহে পড়ে ফেলি দাদা।
ব্রতর ছড়া পড়ে প্রায়শঃ মুগ্ধতায় ভেসে যাই আমি। অভাবনীয় মিল ব্যবহার করে পাঠককে হিপনোটাইজড করতে পটু ব্রত রায়। ওর ছন্দজ্ঞান এবং ছন্দকান দু’টোই দারুণ শক্তিশালী।
দীর্ঘ ছড়া লিখতে যে বিশেষ দক্ষতা লাগে সেটা খুব ভালো ভাবেই রপ্ত করেছে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। স্বভাবে ইন্ট্রোভার্ট। কম কথা বলে। চুপচাপ শুনে যায়। খুব একটা দ্বিমত করে না। কিন্তু নিজের চিন্তা আর লক্ষ্য বিষয়ে স্থির প্রীতিভাজন এই ছড়াবন্ধুটি।
দীর্ঘ ছড়া লিখতে কব্জিতে জোর লাগে। সবাই এটা পারে না। কথাটা আমাকে বলেছিলেন গুরু অন্নদাশঙ্কর রায়। ২১ এপ্রিল ১৯৯৫ সালে। কলকাতায় তাঁর বাড়িতে বসে। গিয়েছিলাম দেখা করতে গুরুর সঙ্গে। আমার কয়েকটা বইও সঙ্গে নিয়েছিলাম। আমার লেখা পান্তাবুড়ি,শেয়ালের পাঠশালা, ভূতের জাদু পড়ার পর ভীষণ আনন্দিত হয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন–তুমি উপেন্দ্রকিশোরের আরো কিছু গল্পের ছড়ারূপ দাও। এটা সবাই পারবে না। কিন্তু তুমি পেরেছো। তুমি পারবে।
আসলেই। দীর্ঘ ছড়া লিখতে প্রথমত স্টোরি টেলিং বিষয়ে জানতে হয়। ধৈর্য্য লাগে। আর লাগে গভীর অভিনিবেশ। বিশেষ একটা স্কিল দরকার হয়। খেয়াল রাখতে হয় গল্পটা যেনো ঝুলে না যায়।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের দীর্ঘ একটা ছড়া কখনোই ঝুলে যায় না। একটা নির্দিষ্ট গতিতে ওর বলা গল্পটা এগিয়ে যায় তরতর করে। এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পটার একটা ধারাবাহিক যোগসূত্র থাকে।
আহমেদ সাব্বির ছড়া চর্চা করে সাতক্ষীরায় বসে। ঢাকায় আসে কেবল মাত্র ছড়াকেন্দ্রিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে। ছড়ার মানুষদের সান্নিধ্যের টানে। ফেসবুকে ছড়াঅন্তপ্রাণ সাব্বিরের কোনো কোনো ছড়া পড়ে চমকে উঠি। মুগ্ধ হই। নির্মেদ নিটোল ঝকঝকে ওর ছড়া। ভালো ছড়াকে চিনতে পারা বা বুঝতে পারাটাও ভালো একটা ছড়া রচনার পূর্ব শর্ত। সাব্বির ছড়া চেনে। এই পাঁচজনের মধ্যে সংখ্যায় সবচে কম লেখে সাব্বির। কিন্তু লেখে চমৎকার।
রোমেন, ব্রত, আজাদ, কামরুজ্জামান এবং সাব্বির–এরা প্রত্যেকেই নিজস্ব দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করছে। প্রতিভার দীপ্তিতে টগবগ করছে।
এদের একেকটা ভালো ছড়া পড়ি আর ভাবি–আহা এরকম একটা ছড়া আমি লিখতে পারলে কী ভালোই না হতো! আমি লিখতে পারিনি কিন্তু আমার একজন ছড়াবন্ধু তো লিখেছে–সেটা ভেবেই আনন্দিত হয়ে উঠি। ওদের ভালো একটা ছড়া পাঠ করে প্রাণিত হয়ে আমিও লিখতে চেষ্টা করি নতুন আরেকটি ছড়া।
এভাবেই ছড়াকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাই হাত ধরাধরি করে।
ঈর্ষায় বাঁচে না ছড়া।
ছড়া বাঁচে ভালোবাসায়।
অটোয়া, কানাডা
