কাশ্মীরের ঘটনাটা দুঃখজনক

কিভাবে সীমান্তের এত গভীরে এমন সন্ত্রাসী হামলা করে নির্বিঘ্নে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে পেরেছে

ইন্ডিয়ার সরকারি মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে একদল সশস্ত্র মুসলিম জঙ্গি ভিকটিমদের গুলি করার আগে ওদের ধর্ম সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। যখন শুনেছে ওরা হিন্দু, তখন গুলি করে মেরেছে।

এ নিয়ে ফেসবুকে কয়েক রকম প্রতিক্রিয়া দেখছি।

- Advertisement -

প্রথমটা, বিজেপি সমর্থকদের। ওদের দাবি মুসলিম জঙ্গিরাই এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হোক।

এর একাংশ বলছে এতে পাকিস্তানের হাত আছে। পাকিস্তান ভারতকে অস্থিতিশীল করতে চায়, সেটার একটি পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়টা, “ষড়যন্ত্র” থিওরি। কোন একটা গোষ্ঠী (বিজেপি বা বিজেপির সমর্থন আছে এমন কেউ) কাজটা ইচ্ছা করেই করেছে। এতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগবে, এবং সরকারিভাবে মুসলিম নিধনে জাস্টিফিকেশন পাওয়া যাবে।

এদের যুক্তি অনেক দীর্ঘ। যেমন কেন সিকিউরিটির ব্যবস্থা একদমই ছিল না?

কিভাবে সীমান্তের এত গভীরে এমন সন্ত্রাসী হামলা করে নির্বিঘ্নে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে পেরেছে? ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স কি করছিল? ওদের হাতে একদমই ইনফরমেশন ছিল না? ওয়াকফ আইন নিয়ে দেশব্যাপী যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে চাপা দিতেই এই হামলা নয়তো? ইদানিং ট্রাম্প আসার পরে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিকভাবে ইন্ডিয়া পরপর কয়েকটা মার খাবার পরে এখন এই ঘটনা বিশ্বনেতাদের কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সাহায্য করবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই থিওরি। কোন প্রমান নেই। ড্রয়িংরুমে বসে এমন হাজারো যুক্তি যোগ করা যায়।

তৃতীয়টা, সত্য ঘটনা – যা হয়তো এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের অঞ্চলের সরকারগুলি অতিরিক্ত ক্ষমতাধর, সিস্টেমটা অতিরিক্ত করাপ্টেড এবং মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে এত বেশি মেনিপুলেট করতে পারে যে, কোন খবর প্রচার পাবে সেটা সরকারের ইচ্ছা ও স্বার্থের উপর নির্ভর করে।

যেমন, যদি ঘটনা আসলেই মুসলিম জঙ্গিরা ঘটিয়ে থাকে, তাহলে বিজেপি সরকার এটাকে খুবই ঢালাওভাবে প্রচার করবে। কিন্তু যদি জঙ্গিরা মুসলিম না হয়ে থাকে, এবং ঘটনাটায় সরকারের হাত থাকে, তাহলে এই খবর জীবনেও বাইরে প্রকাশ হবেনা। অন্তত এই সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায়তো অবশ্যই না।

এদিকে আমাদের অঞ্চলের মানুষদেরও সমস্যা কম নেই। ওরা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য মানতেই চায় না। যেমন, চোরের মা বরাবরই অস্বীকার করে থাকে যে তার ছেলে চোর। সবসময়েই অন্যের উপর দায় চাপানোর একটা অসুস্থ মেন্টালিটি থাকে। অথচ দায় স্বীকার করে চোরকে শোধরানোর কাজ করলে কিন্তু সমস্যা বহু আগেই সমাধান হয়ে যেত।

মনে রাখতে হবে, ঘটনা ঘটেছে উপমহাদেশে, যেখানে দাঙ্গা লাগানোর জন্য মন্দিরের দুয়েকটা দেবী মূর্তি ভাংচুর এবং মসজিদের বাইরে শূকর মেরে ফেলে রাখাটাই যথেষ্ট। কে রাখলো সেটা ম্যাটার করেনা। পার্টিশনের একশো বছর আগে থেকেই এই ঘটনা ঘটে আসছে। ইংরেজরা যে “ডিভাইড এন্ড রুল” করে গিয়েছিল, সেটা রাজনীতিবিদরা আজও নিজেদের মধ্যে ধরে রেখেছে।

আর সাধারণ মানুষ?

সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিদদের বলির পাঠা হতেই জন্মে।

এই যে সন্ত্রাসীরা ধর্ম বিচার করে আক্রমন চালালো, এবং আদিল নামের এক মুসলিম যুবক নিজের জীবনের পরোয়া না করেই খালি হাতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো – এই বিষয়টাকে কয়জন কিভাবে দেখছেন?

যেই কান্ডটা ঘটাক, ওদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হিন্দু মুসলিমে দাঙ্গা লাগানো। হিন্দু মুসলিম কাটাকাটি মারামারি করবে, ওদের উদ্দেশ্য হাসিল হবে।

অথচ ঠিক যদি উল্টাটা ঘটতে থাকে, হিন্দু মুসলিমরা এক হয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করে, তাহলে?

ফেসবুকে বসে বিজেপি করেছে, মুসলিমরা করেছে, পাকিস্তান করেছে ইত্যাদি ব্লেম গেম না খেলে সত্য ঘটনা প্রকাশের জন্য ধৈর্য্য ধরেন। নিশ্চিত করেন নিজের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাবেন না। আপনার বেহুদা অপপ্রচারে সমস্যার সমাধান হবেনা, উল্টা বাড়বে। আর সত্য যেটাই ঘটুক, সেটা প্রকাশ হলে, প্রমান হলে সেটাকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন। যেকোন সমস্যা সমাধানের পূর্বশর্ত হচ্ছে সেটাকে স্বীকার করা।

দুনিয়ার যেকোন প্রান্তেই নিরীহ মানুষ মারা গেলে সমব্যথী হতে শিখুন। মানুষ হতে শিখুন। এক ছেলে মারা যাওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে বৃদ্ধ বাবার সাথে ফোনে কথা বলেছে। সে তাঁর ডাক্তার স্ত্রী এবং ছোট মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে এসেছিল। বাবাকে ভিডিও কলে কিছুক্ষন ভূস্বর্গ দেখালো। তারপরে ফোন কেটে বিদায় নিল। বাবা হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সেখানেই খবর পান সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। বাড়ি ফিরে খবরে দেখেন। বুঝতে পারেননি, নিহতদের মধ্যে তাঁর ছেলেও ঐ মাঠে শুয়ে আছে। খবর শুনলেন পরেরদিন। পরিবার থেকে তাঁকে জানানো হয়নি, তিনি মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছেন। কী ভীষণ কষ্ট! কী দুঃসহ অনুভূতি! এমনই ঘটনা অন্যান্য নিহতদের বেলাতেও ঘটেছে।

এই ঘটনায় নিহতদের প্রতি আমার সমবেদনা ততটুকুই যেটুকু গাজায় নিহত আমার ভাইবোনদের জন্য হয়ে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই জালিমদের বিরুদ্ধে আমার মালিকের কাছে আমি একই মাত্রায় অভিযোগ করি।

আল্লাহ পৃথিবীতেই বেহেস্তের ছোট্ট একটি নমুনা হিসেবে কাশ্মীরকে দেখিয়েছেন। অথচ আমরা মানুষেরা সেই বেহেস্তকেও শয়তানের লীলাভূমি বানিয়ে ছেড়েছি!

- Advertisement -

Read More

Recent