
ভীড় ঠেলে টিকেট হাতে নিয়ে সিটের কাছে গেলো শাউলি।গিয়ে দেখে সিটে পা তুলে বসে আছেন এক লোক, পঞ্চাশের উপর হবে বয়স।
শাউলি বিনয়ের সাথে বললো,আঙ্কেল সিট টা আমার।
লোকটা যেন শুনতে পেলো না।
শাউলি আবার বললো, “এই যে আঙ্কেল,আমার এই সিটটা! ”
লোকটা এবার একটু বিরক্ত হলো,মনে হলো তার সিট শাউলিকে দিতে বলছে।
সামনের সিটে দুজন মহিলা বসা, সেদিকে ইঙ্গিত করে বললো, “আপনি ঐ সিটে বসেন না? ঐ সিটে তো চাইলে তো আরেকজন বসা যায়”
আমি ঐ সিটে বসব কেন? আপনি উঠেন, এটা আমার সিট, আপনি নিজের সিটে বসেন গিয়ে, তেজী কন্ঠে বললো শাউলি।মামুর বাড়ির আবদার।
এবার লোকটা একটু নড়ে বসলো।
আশেপাশের সবাই এতো ভীড়েও শাউলির দিকে তাকিয়ে আছে, কেউ লোকটাকে উঠে শাউলি কে সিট ছেড়ে দিতে বলছে না।
শাউলি স্থির চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিট ছেড়ে উঠে গেলো লোকটা।চোহারায় বিরক্তি। যেন তাকে কেউ তার সিট থেকে উঠিয়ে দিলো!
আজব এক সিস্টেম! নিজের টিকেটের খবর নেই, আরেকজনের সিটে উঠে এমন ভাব করতে থাকে যেন পুরো ট্রেনটা তার বাপের কেনা” রাগে গজগজ করতে লাগলো শাউলি!
এইসব কারণেই এই দেশে থাকতে মন চায় না।
থাকবেও না বেশিদিন!
IELTS এর রেজাল্ট হয়েছে, স্কোর ৭.৫।
মন্দ না একেবারে।
শাউলির জন্য ঠিকঠাক, ইউরোপের কিছু দেশে এপ্লাই করলে কোথাও না কোথাও হয়েই যাবে।
ইতোমধ্যে প্রসেসিং শুরু করে দিয়েছে।
আজ যাচ্ছে নিজের বাড়ি।বাবা মা মৌলির কাছে।
কেউ জানে না শাউলির বাড়ি যাওয়ার কথা।
শাউলি মনে মনে বেশ এক্সাইটেড।
বাবা মা মৌলি হুট করে ওকে দেখে কী রিয়েকশন দেয় সেটা ভেবেই আনন্দ লাগছে।
পরক্ষণেই মনে পড়লো এবার বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যই বাবা মাকে বিদেশে পড়াশোনা করার ব্যাপারটা জানানো।উনাদের রাজি না হওয়ার সম্ভবনাই বেশি,তবে রাজি হওয়ার সম্ভাবনাবও যে একেবারেই নেই তাতো নয়।এই যৎসামান্য সম্ভাবনাই শাউলিকে আজ বাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
যা হবার হোক,আপাতত জানালার বাইরে চোখ রেখে ছুটে চলা গাছ পালা, নদী, রাস্তা, মানুষ, আকাশ দেখতে দেখতে বাড়ি যাওয়া যাবে ভেবে শাউলির এই ভালোলাগা।
হেডফোনে গান চলছে..”আমি একটা পাতার ছবি আঁকি…পাতাটা গাছ হয়ে যায়..মাথা ভরা সবুজ কঁচি পাতা, গাছটাকে ছাতা মনে হয়…”
গানটায় একটা ফূর্তি ভাব আছে, শাউলির ফূর্তি লাগছে!
ট্রেন থামলো স্টেশনে।
স্টেশন থেকে পায়ে হেটে পাঁচ মিনিট।
শাউলি সিঁড়ি দিয়ে ওঠেই কলিং বেল চাপলো।
জোবেদা খালা এসে দরজা খুলে দিবে, শাউলি সেজন্য মনে মনে প্রস্তুত ছিলো।
জোবেদা খালা দরজা খুলতেই মুখের মধ্যে আঙ্গুল চেপে ইশারা করলো যেন কোন শব্দ না করে। ও যে এসেছে এই কথা যেন এখনই কাউকে না বলে।
জোবেদা খালা ইশারা বুঝে না কিংবা সারপ্রাইজ বুঝে না।সে মুখ থেকে হাত সরিয়ে প্রায় চেচিয়ে বললো, “ও মাগো! তুমি কোনবালা আইলা?”
মা মাত্র নামাজের সালাম ফিরাচ্ছেন।
এই দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় আবার কে এসে হাজির হলো!
কে আসছে জোবেদা? জায়নামাজে বসে থেকে মা জিজ্ঞেস করেন।
জোবেদা খালা মুখ খোলার আগে শাউলি এবার উনার মুখ জোরে চেপে ধরলো।
জোবেদা খালা শাউলির হাত ছাড়িয়ে নেয়ার তুমুল চেষ্টা চালাচ্ছেন , মুখে হাত অবস্থায় কথা বলার চেষ্টা করছে, “আরে করো করো কি, ও আল্লাহ গো, আমারে মাইরা লাইতাছে গো”
শাউলি বুঝলো এই মহিলাকে লাইনে আনা সহজ হবে না, অনর্থক থুথু তে ওর হাত ভরাচ্ছে। ইয়াক!
শাউলি ছেড়ে দিলো।
জোবেদা খালা যেন মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এলো।
ও আল্লাহ গো, আমারে জাইত্যা মাইরা ফালাইছিলো ”
এমন ধস্তাধস্তি শুনে জায়নামাজ ছেড়ে তড়িঘড়ি করে উঠে আসে মা।
শাউলিকে দেখে অবাক হবে নাকি জোবেদার বিলাপ শুনবে বুঝে ওঠতে পারে না।
আরে হলো টা কী! বাবা ছুটে আসে ঘর থেকে, আর মৌলি গোসল সেরে কেবল বের হলো বাথরুম থেকে!
কিরে আপা?তুইইই? মৌলি অবাক।
“তুমি আসবা বললা না কেন? আমি স্টেশনে যেতাম?” বাবা বললেন।
মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু, আমি আরো জায়নামাজে বসে তোর কথা ভাবছিলাম, আজ দুপুরের জন্য কাঁচকি মাছ ভেজেছি বেশি করে পেঁয়াজ দিয়ে।
চল,ফ্রেশ হয়ে আয়, ভাত খাব একসাথে।
জোবেদা খালা তখনো মুখে হাত দিয়ে আছেন, যেন মুখের বিরাট ক্ষতি হয়ে গিয়েছে।
কী খালা? আপনার মুখে কি হলো?মৌলি জিজ্ঞেস করে
“আর কইয়ো না, তোমার বইনে এমন জোরে চাপ দিসে, দম বন্ধ হয়ে মইরা যাইতাম,বালা তো তোমার মায় আইছিলো”
মৌলি আর শাউলি দুইবোন নিজেদের দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে।
—————————–
দুপুরবেলা পেয়ারা মাখা নিয়ে বসে দুইবোন।
পেয়ারা টুকরো করে কাটা; লবণ, মরিচ, সামান্য তেঁতুল গোলা, বিট লবণ আর অল্প করে কাসুন্দি.. ব্যাস…এতো মজা!
দুই বোন খাচ্ছে আর হাহাহিহি করছে।
মৌলি জোবেদা খালার নানান কিচ্ছা কাহিনী বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
শাউলিও হাসছে।
হেমন্তের বিকেল,টুপ করে বেলা শেষ হয়ে যায়।
সন্ধ্যা নামতেই মা চুলা জ্বালে, আজ হবে চিতই পিঠা আর গরুর মাংসের ঝোল।
বাসার এই আনন্দ উৎসব ভাবটা এতো ভালো লাগছে শাউলির! মনে হচ্ছে ইশ! সারাজীবন এমনে করে কাটিয়ে দিতে পারলেও মন্দ হতো না।
কিন্তু এসব আবেগ, অলীক কল্পনায় জীবন চলবে না।চলে না।
শাউলি ল্যাপটপ নিয়ে বসে, কয়েকটা ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করতে শুরু করে দেয়।
রাতের খাবার সবার সাথে খেয়ে দুইবোন ঘুমাতে যায়।
মৌলি দুই একটা গল্প করেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলো।
শাউলির ঘুম পায় না।
বাবা মাকে বিষয়টা কখন বলবে, কীভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারে না।বিছানায় অনেকক্ষণ শুয়ে ও যখন ঘুম আসে না তখন ডাইনিংয়ে যেয়ে পানির গ্লাস হাতে নেয়।
ডিম লাইটের নীল আলোয় এই বাড়িটাকে খুব মায়াময় লাগে শাউলির!
পানির গ্লাস রেখে রুমে আসতে যাবে এমন সময় বাবা ডেকে ওঠে, কীরে মা? ঘুমাস না যে?
-যাচ্ছি বাবা, তুমি এখনো জেগে?
-ঘুম ভেঙে গেলো, আজকাল মঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়।
-কেন বাবা? শরীর খারাপ?
-শরীর তো আছে একরকম, এই বয়সে আর কত ভালো থাকবে?
বাবা ডিম লাইটের চেয়েও উজ্জ্বল আলোটা ধরিয়ে দেয়।
সোফায় বসে।শাউলি ও বসে।
কিছুক্ষণ বাবা মেয়েতে কোন কথা হয় না।
বাবা টি টেবিলে রাখা পত্রিকা হাতে নেয়।
শাউলির মনে হচ্ছে, এটাই সঠিক সময়।
বাবাকেই বলবে সে।যদিও বিষয়টা কঠিন।জীবনে কোন প্রয়োজনে সরাসরি বাবাকে বলার অভ্যাস টা নেই, সবসময় মা ছিলেন বাবার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম।
কিন্তু এই বাসার যে কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টা বাবার পক্ষ থেকেই আসে।
বাবা একটা কথা ছিলো, শাউলি সাহস সঞ্চয় করে বলে।
-বলো? কি কথা?
শাউলি চুপ।
বাবা এবার জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি কাউকে পছন্দ? তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছ?”
-না বাবা!
-তাহলে?পছন্দ থাকলে সরাসরি বলতে পারো।
বাবা আমি অন্য বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
বাবাকে একটু চিন্তিত দেখালো এবার।
-কি বিষয় মা?
-বাবা আমি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
বাবা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
-তোমাকে শিক্ষিত করার দরকার ছিলো, করিয়ে দিয়েছি।এখন তুমি তোমার সুবিধামতো ক্যারিয়ার গড়বা।আমি কি ওতো শতো বুঝি গো মা?
পত্রিকায় পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে বললেন বাবা।
বাবা আমি দেশের বাইরে যাব ঠিক করেছি,মাস্টার্স টা দেশে করব না!”শাউলি এক নিশ্বাসে বলে কথাটা
