নতুন বাজারে কানাডার নজর, বাণিজ্যমন্ত্রীর লক্ষ্য দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত সম্প্রসারণ

কানাডার নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী মনিন্দর সিধু বিশ্ববাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন

কানাডার নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী মনিন্দর সিধু বিশ্ববাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং অন্যান্য উদীয়মান অঞ্চলে কানাডার রপ্তানি সম্প্রসারণ ও নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার দিকে এখন তাঁর প্রধান মনোযোগ। একইসঙ্গে তিনি চান, ইতোমধ্যেই বিদ্যমান মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোও যেন কানাডিয়ান ব্যবসায়ীরা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন।

দি কানাডিয়ান প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী সিধু বলেন, “কানাডার পক্ষে আমি এমন এক দরজা খুলে দিতে চাই যেখানে আমাদের ব্যবসায়ীরা নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। বিশ্বব্যাপী এখন নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদারদের চাহিদা বাড়ছে, আর সেই জায়গায় কানাডা নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারে।”

- Advertisement -

সিধু জানান, তার ফোন প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকছে—কারণ বিভিন্ন দেশের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও সরকারি প্রতিনিধি কানাডার সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তিনি বলেন, “এখন সময় কানাডিয়ান ব্যবসায়ীদের সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিশ্বের বিশাল বাজারে আমাদের সম্ভাবনা সীমাহীন।”

বর্তমানে কানাডার ১৫টি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, যার আওতায় রয়েছে ৫১টি দেশ। এসব চুক্তির ফলে প্রায় ১৫০ কোটি ভোক্তার কাছে কানাডিয়ান রপ্তানি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার রয়েছে। তবুও মন্ত্রী মনে করেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট আগ্রহ বা প্রস্তুতি তৈরি হয়নি এই সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমরা একে একমাত্র ভরসা হিসেবে ধরে রাখতে পারি না। যখন ওয়াশিংটন শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়, তখন বুঝতে হবে বিকল্প বাজার খোঁজার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।”

সিধু এর আগে চার বছর ধরে সংসদীয় সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে তিনি গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কাস্টমস ব্রোকার হিসেবে বেসরকারি খাতে কাজ করতেন—যেখানে তার দায়িত্ব ছিল আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় লাল ফিতা ও শুল্ক বাধা দূর করে সর্বোত্তম বাণিজ্য হার নিশ্চিত করা।

নতুন মন্ত্রীর মতে, কানাডার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে বহুমুখী বাণিজ্য কৌশলের ওপর। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক বিশ্বে প্রবেশ করছি যেখানে বাণিজ্য শুধু বড় বাজারের বিষয় নয়, এটি কৌশলগত সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থার বিষয়ও। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমাদের উপস্থিতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।”

সিধু জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই ব্রাজিল সফরে যাচ্ছেন, যেখানে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘মারকাসর ট্রেড ব্লক’ এবং কানাডার মধ্যে স্থগিত বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মারকাসর ব্লকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে অন্তর্ভুক্ত—যা লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম বাণিজ্যজোট হিসেবে পরিচিত।

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সফরে তিনি বৃহৎ প্রতিনিধিদলের পরিবর্তে ছোট ও লক্ষ্যনির্ভর ব্যবসায়ী দল নিয়ে যেতে চান। “আমরা চাই প্রতিটি সফর যেন ফলপ্রসূ হয়। প্রতিটি অঞ্চলে নির্দিষ্ট খাতের সুযোগ শনাক্ত করা—যেমন কৃষিপণ্য, খনিজসম্পদ, প্রযুক্তি, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা—এই বিষয়েই আমরা কাজ করব,” বলেন তিনি।

কানাডার অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাণিজ্য বাজার খুঁজে বের করা এখন একটি কৌশলগত প্রয়োজন। বর্তমানে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার মতো উদীয়মান অঞ্চলে কানাডার উপস্থিতি বাড়ানো হলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করবে।

অর্থাৎ, নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী মনিন্দর সিধুর পরিকল্পনা কেবল কূটনৈতিক সফর নয়, বরং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। যেখানে কানাডা নিজের পরিধি উত্তর আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়—বিশ্বের নতুন বাজারগুলোতে কানাডিয়ান পতাকা উড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই।

- Advertisement -

Read More

Recent