
কানাডায় ক্রিপ্টোকারেন্সি এটিএম নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে ফেডারেল সরকার। তবে এডমন্টনভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি বিটকয়েন ওয়েলের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম ও’ব্রায়েন মনে করছেন, সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপ জালিয়াতি দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। বরং এতে বৈধ ব্যবহারকারীদের জন্য ডিজিটাল মুদ্রায় প্রবেশের পথ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিটকয়েন ওয়েল প্রথমে আলবার্টায় কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তীতে তা কানাডার বিভিন্ন অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশে বিস্তৃত হয়। প্রতিষ্ঠানটি মূলত এটিএমের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা ও স্থানান্তরের সুযোগ দিয়ে থাকে।
বিটকয়েন একটি বিকেন্দ্রীভূত ডিজিটাল মুদ্রা, যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে সরাসরি লেনদেনের সুযোগ দেয়। ব্যবহারকারীরা ব্যাংক, ক্রেডিট কার্ড প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ ছাড়াই অর্থ আদান-প্রদান করতে পারেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থাকে অনেকেই আর্থিক স্বাধীনতার নতুন ধাপ হিসেবে দেখলেও, একই সঙ্গে প্রতারণা, অর্থপাচার এবং অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডার ফেডারেল সরকার সম্প্রতি একটি নতুন আইন প্রস্তাব করেছে, যেখানে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এজেন্সি (এফসিএ) গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি হবে গুরুতর ও জটিল আর্থিক অপরাধ তদন্তে কানাডার প্রথম বিশেষায়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। একই সঙ্গে নিয়ম না মানা অর্থ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হবে সংস্থাটিকে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রিপ্টোকারেন্সি এটিএমকে ব্যবহার করে প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বা ভুয়া বিনিয়োগের প্রলোভন দিয়ে ক্রিপ্টো এটিএমে টাকা জমা করাতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই খাতকে আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে সরকার।
তবে অ্যাডাম ও’ব্রায়েন মনে করেন, পুরো শিল্পখাতকে দায়ী করে কড়াকড়ি আরোপ করলে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। তিনি বলেন, “আমি যখন প্রথম বিটকয়েন কিনেছিলাম, তখন মাত্র দুটি বিকল্প ছিল। আপনি হয় রাশিয়ায় অর্থ পাঠাতে পারতেন, নয়তো ব্যাংকের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করতে হতো। গত প্রায় ১৩ বছর ধরে আমরা এই খাতে কাজ করছি এবং আমি বিশ্বাস করি, জালিয়াতি প্রতিরোধে আমরা এই শিল্পের অন্যতম অগ্রণী প্রতিষ্ঠান।”
তার মতে, বৈধ অপারেটররা ইতোমধ্যেই গ্রাহক যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তে নানা নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে। তাই সরকারের উচিত পুরো খাতকে সীমাবদ্ধ না করে অসাধু অপারেটরদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া।
ও’ব্রায়েন আরও অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত আইনি পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি প্রথম জানতে পারেন টেলিভিশনের সংবাদ থেকে। বিষয়টিকে তিনি “হতাশাজনক” বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “এখন পর্যন্ত এটি কেবল একটি প্রস্তাব। আমরা আশা করছি সরকার শিল্পখাতের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব বিবেচনায় নেবে।”
কানাডা বর্তমানে এমন এক সময় পার করছে যখন একদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে, অন্যদিকে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপও বাড়ছে। ফলে সরকারকে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং জননিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বদলে কার্যকর তদারকি, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত অপারেটরদের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করলে জালিয়াতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অন্যথায় অতিরিক্ত কড়াকড়ি বৈধ ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ব্যবহারকারীদের অনিয়ন্ত্রিত বিকল্প প্ল্যাটফর্মের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কানাডার প্রস্তাবিত আইন এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে যেখানে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে চলে এসেছে।
