
কানাডার টরন্টো শহরে পরিচালিত এক জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর সাইবার অপরাধ চক্রের পর্দাফাঁস করেছে পুলিশ। দীর্ঘ কয়েক মাসের গোপন তদন্ত শেষে “প্রজেক্ট লাইটহাউজ” নামের এই অভিযানে তিনজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে অত্যাধুনিক এসএমএস-ব্লাস্টিং ডিভাইস।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি ভ্রাম্যমাণ এসএমএস ব্লাস্টার ব্যবহার করে কার্যত একটি ভুয়া মোবাইল টাওয়ার তৈরি করত। এই ডিভাইসগুলো আশেপাশের মোবাইল ফোনকে বৈধ টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজেদের নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে সক্ষম ছিল। ফলে ব্যবহারকারীরা বুঝতেই পারতেন না যে তারা প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছেন।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, একবার কোনো মোবাইল ফোন এই ভুয়া টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত হলে, সেটিতে ধারাবাহিকভাবে ভুয়া টেক্সট মেসেজ পাঠানো হতো। এসব মেসেজ দেখতে ব্যাংক, টেলিকম সেবা প্রদানকারী কিংবা অন্যান্য বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের পাঠানো বলে মনে হতো। এই প্রতারণার কৌশলকে বলা হয় “স্মিশিং”। ডিটেক্টিভ সার্জেন্ট লিন্ডসে রিডেলের ভাষায়, “এটি শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি।” কারণ, এই ডিভাইসগুলো নেটওয়ার্কে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি করত।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে একটি সাইবার সিকিউরিটি অংশীদার প্রথম ডাউনটাউন টরন্টো এলাকায় একটি সন্দেহজনক ভুয়া মোবাইল টাওয়ার শনাক্ত করে। এরপর শুরু হয় পুলিশের তদন্ত। পরবর্তী কয়েক মাসে এই ডিভাইসটি পুরো গ্রেটার টরন্টো এরিয়া জুড়ে স্থানান্তরিত করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, এই ডিভাইসের মাধ্যমে হাজারো মোবাইল ফোন সংযুক্ত করা হয় এবং ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বার নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটানো হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে জরুরি সেবার নম্বর বিশেষ করে ৯১১ এ প্রবেশ সাময়িকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছিল। এটি জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
গত ৩১ মার্চ পুলিশ মারখাম এবং হ্যামিল্টন শহরের একাধিক বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বেশ কয়েকটি এসএমএস-ব্লাস্টিং ডিভাইস জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে, তৃতীয় সন্দেহভাজন ২১ এপ্রিল স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন: হ্যামিল্টনের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী ডাফেং লিন, মারখামের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী জুনমিন শি এবং ২১ বছর বয়সী ওয়েটং হু।
এই ঘটনার মাধ্যমে আধুনিক সাইবার অপরাধের একটি নতুন মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে। প্রচলিত অনলাইন প্রতারণার পাশাপাশি এখন অপরাধীরা সরাসরি মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের “ফেক সেল টাওয়ার” প্রযুক্তি আগে মূলত গোয়েন্দা সংস্থার হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা অপরাধচক্রের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। এছাড়া, এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে সাইবার নিরাপত্তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয় নয় এটি সরাসরি জননিরাপত্তা ও জরুরি পরিষেবার কার্যকারিতার সঙ্গে জড়িত।
পুলিশ নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে: অচেনা নম্বর থেকে আসা লিংকে ক্লিক না করা, ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে আসা সন্দেহজনক মেসেজ যাচাই করা এবং ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য কখনোই এসএমএসের মাধ্যমে প্রদান না করা। এই অভিযান প্রমাণ করে, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধের ধরনও তত জটিল হচ্ছে আর সেই সঙ্গে বাড়ছে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
