ক্রেডিট-ডেবিট কার্ড ?

ছবিশেল কানাডা

কিছুদিন আগে একটি অনলাইন সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষাটি করা হয়েছে মার্কেট ম্যাক্ট্রিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। সমীক্ষার বিষয় ছিল ‘ক্রেডিট কার্ড না ডেবিট কার্ড কোনোটি প্রিয়?’
সমীক্ষার ফলাফল থেকে বেশ কিছু বিষয় বের হয়ে এসেছে যা পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে চাই। প্রথমত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রতি উদীয়মান এবং বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক ধরনের সন্দেহ, ভীতি কিংবা অনাগ্রহ রয়েছে। সম্ভাবনাময় গ্রাহকদের অনেকেই মনে করেন ক্রেডিট কার্ড তাদের উচ্চ হারের ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলবে। অপরপক্ষে, টিআইএন নাম্বারের মাধ্যমে তারা এনবিআরের ট্যাক্স ব্রাকেট বা করের আয়তাধীন হয়ে পড়বে এই রকম একটি আশংকা থেকেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রতি অনেকের অনাগ্রহ রয়েছে।
অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল শিক্ষিত তরুণ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ এবং বয়স্কদের মধ্য ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাঁরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের বেশ কিছু সুবিধা এবং অসুবিধার কথা তুলে ধরেছেন।
অনেকেই বলেছেন যে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ফলে তারা শূন্য সুদ হারে ইএমআই-র (সমান অংকের মাসিক কিস্তি) সুবিধা নিয়ে বিবিধ পণ্য বিশেষত রিফ্রিজেরেটর, টিভি, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি ছয় থেকে বারোটি কিস্তিতে কিনতে পারছেন। নগদমূল্য এই ধরনের দামী পণ্য কেনা হয়তো সম্ভব হতো না।
যেসব গ্রাহক বিদেশ ভ্রমণ করেন তারা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে হোটেল বুকিং, বিমানের টিকেট ক্রয় ইত্যাদি সুবিধার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও বিদেশ ভ্রমণের সময় দেশে এবং বিদেশের এয়ারপোর্টে ওয়াইফাই ইন্টারনেট সুবিধায় লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করে বিদেশে শপিং করার সুযোগ করে দিচ্ছে ক্রেডিট কার্ড। এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানিয়েছেন যে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অনলাইনে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করতে হয়।
অনেকেই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে এবং শপিং মলে পণ্য ক্রয়ে ডিসকাউন্ট সুবিধা গ্রহণ করছেন। এতোসব সুযোগ-সুবিধা সত্তে¡ও গত দুই দশকে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালট্যান্ট গ্রæপের সমীক্ষা অনুযায়ী গত দুই তিন দশকে বাংলাদেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিকাশ লাভ করেছে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ এবং যাদের আয় বছরে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার অর্থাৎ চার লাখ টাকা বা তার উর্দ্ধে। কিন্তু সেই তুলনায় আয়কর দাতার সংখ্যা বাড়েনি। বাংলাদেশে এখনও আয়কর দাতার সংখ্যা জনসংখ্যার এক শতাংশের নিচে (তথ্যসূত্র ঃ প্রথম আলো, ৫ মে, ২০১৯)। আয়কর প্রদানে যথেষ্ঠ প্রণোদনার অনুপস্থিতির কারণেই কি এমনটা ঘটছে? নাকি আয়কর প্রদানে জটিলতা সামর্থ্যবান নাগরিকদের আয়কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করছে? বিষয়টি আরেকটু গভীরে ভেবে দেখা প্রয়োজন। উপরোক্ত সমীক্ষার সাথে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের স্বল্প সংখ্যার একটা পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। কারণ করদাতাদের মতো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারীর সংখ্যাও এখনো জনসংখ্যার এক শতাংশের নিচে (তথ্যসূত্র ঃ বণিক বার্তা, ২৮ অক্টোবর, ২০১৯)।
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার একটি শর্ত হলো গ্রাহককে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দিতে হবে। আর সেই কারণেই হয়তো কর আওতার অন্তর্ভুক্ত হতে গ্রাহকের অনুৎসাহ। অন্যদিকে ব্যাংক একাউন্টের সাথে ডেবিট কার্ড পাওয়ার জন্য যেহেতু টিআইএন নম্বর অত্যাবশ্যক নয় সেই কারণে ডেবিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০১৮ সালেই এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
ডেবিট কাডের মাধ্যমে এটিএম মেশিনে ব্যাংকিং সুবিধাসহ (যেমন একাউন্ট থেকে টাকা ওঠানো, জমা দেয়া, মিনি স্টেটমেন্ট নেয়া) ফান্ড ট্যান্সফার এমন কি বিল প্রদানের সুবিধাও গ্রাহক ভোগ করছে। অন্যদিকে ব্যাংকের গ্রাহক প্রতি সেবা ব্যয়ও সাশ্রয় হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো এক কোটির অধিক গ্রাহক যদি ডেবিট কার্ড ব্যবহারে সামর্থ্যবান এবং এটিএম বা পয়েন্ট অব সেল মেশিনে লেনদেন সহ অন্যান্য সুবিধা নিতে আগ্রহী হয় তবে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা নিতে তারা কেন বিমুখ হবে? ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ডের গ্রাহকের সংখ্যার ব্যাপক পার্থক্য থেকে আপাতঃ দৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয় যে, নাগরিকদের কর প্রদানে বিমুখতা একটি অন্যতম কারণ। যারা ডেবিট কার্ডের সুযোগ নিতে আগ্রহী তারা ক্রেডিট কার্ডের বিবিধ সুবিধা নিতে অনাগ্রহী হবেন এটা ঠিক গ্রহণযোগ্য নয়। এখন প্রায় সব ব্যাংকই এবং অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করছে। গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের ক্যাম্পেইন, বিজ্ঞাপন এবং প্রচারণা চলছে। বর্তমানে কারো মাসিক আয় বিশ হাজার টাকা হলেই ব্যাংক তাকে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা দিচ্ছে। ঋণ খেলাপী না হলে এবং টিআইএন নম্বর থাকলে ক্রেডিট কার্ড পেতে তেমন কোনো সমস্যা নেই। প্রায় দুই দশক আগে এদেশে ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ডের প্রচলন শুরু হয়। তারপরও ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা এক শতাংশের (প্রায় দশ লক্ষ) নিচে আটকে গেছে। অথচ সেই তুলনায় ডেবিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা সাত শতাংশের (এক কোটি বিশ লক্ষ) উর্দ্ধে।
এদেশে যারা নিয়মিত করদাতা তাদের বিশেষ সম্মানিত নাগরিকের মর্যাদা দেয়া না হলে করদাতার সংখ্যা ভবিষ্যতে শম্বুক গতিতে বাড়বে। অপরদিকে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকের সংখ্যা না বাড়লে অর্থনীতির চাকা শ্লথ হয়ে পড়বে। কারণ ক্রেডিট কার্ড বাজারে লেনদেনের চাকাকে সচল করে। উত্তর আমেরিকায় বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন এবং নিয়মিত বিল পরিশোধের রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের ক্রেডিট স্কোর গণনা করা হয়। যেসব গ্রাহকের ক্রেডিট স্কোর ভাল তাঁরা বাড়ি কিংবা গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বড় আকারের মর্টগেজ লোন পেয়ে থাকে। একজন গ্রাহকের ক্রেডিট রেকর্ড বা বিল পরিশোধের স্বভাব থেকে বোঝা যায় যে, তিনি ঋণ খেলাপী হবেন কি না? বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অধিকাংশ গ্রাহকের ক্রেডিট ইতিহাস না থাকার কারণে ব্যক্তি পর্যায়ে দেয়া ব্যাংক ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রিয়েল স্টেট ব্যবসায় যে মন্দা চলছে এটাও তার একটি বড় কারণ। কারণ ক্রেডিট স্কোরের ওপর ভিত্তি করে ঋণ সুযোগ্য গ্রাহককে বাড়ি বা গাড়ি কেনার জন্য ঋণ প্রদান করা হলে রিয়েল স্টেট ব্যবসা আরো বেশি গতিবান হতো এবং বিদেশে অর্থ পাচারের হার কমে যেত।
সম্প্রতি প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়েছে যে, সুপারশপের ব্যবসা প্রবৃদ্ধি গত দুই বছরে অনেক কমে এসেছে। এর একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বিক্রয় কর গত কয়েক বছরে বাড়ানো হয়েছে এবং এই বছর তা পাঁচ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মুদি দোকান থেকে পণ্য কিনলে যেখানে কোনো বিক্রয় কর দিতে হয় না সেখানে গ্রাহক কেন সুপারশপে পাঁচ শতাংশ কর প্রদান করবে? বাজারে এই ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বাজারকে ক্রমশ অস্থির করে তুলবে। একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে আবার অন্যদিকে যারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন করবে তাদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানো হলে গ্রাহক যে বিমুখ হবে এটাই তো স্বাভাবিক। এছাড়াও যেসব ক্রেতা শপিং মলে বা সুপারশপে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ক্রয়কৃত পণ্যের দাম পরিশোধ করছে তাদের সর্বমোট ক্রয়কৃত মূল্যের ওপর রিটেলারকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে দুই শতাংশ চার্জ প্রদান করতে হয়। এইসব নানা জটিলতার কারণে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে না।
কর প্রদানে সামর্থ্যবান নাগরিককে করের আওতায় আনার জন্য প্রথম ধাপ হলো কর ভীতি দূর করা। সবাই কর দিতে চায় কিন্তু এই প্রত্রিæয়ায় যে হয়রানির সম্ভাবনা থাকে তা এড়াতেই সবার এই পশ্চাদমুখীতা। জনগণকে জানাতে হবে যে, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেকোনো সময় থেকে তাঁকে বা তাঁর প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে পারে। পূর্বের কোনো শর্ত আরোপ ছাড়া তাদের এই প্রত্রিæয়ায় আস্তে আস্তে আগের কোনো দেনাপাওনা থাকলে তা সহজ কিস্তিতে দিতে পারে যাতে রেয়াত প্রনোদনাও থাকতে পারে এবং পুরো বিষয়টি অনলাইনের মাধ্যমেও হতে পারে।
এই জন্য যারা সরকারকে আয়কর এবং বিক্রয় কর প্রদান করছে তাদের জন্য বিশেষ কোনো প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা করা না হলে কর প্রদানে সামর্থ্যবান একটি বড় অংশের গ্রাহক কর আওতার বাইরে থেকে যাবে। আর ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি না পেলে অনলাইন এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থায় লেনদেনের গতি ব্যহত হবে।

- Advertisement -

Read More

Recent